একটি সহজ উদাহরণ দিয়ে শুরু করি। কেউ বললেন, “এই বিষয়টি আমাদের সংবিধানে আছে।” আপনি সংবিধান খুলে হুবহু সেই বাক্যটি না-ও পেতে পারেন। কিন্তু সংবিধানের দুটি ধারা মিলিয়ে পড়লে বিষয়টি পরিষ্কার বেরিয়ে আসে। এতে বক্তাকে মিথ্যাবাদী বলা যায় না।
হাদীসের ক্ষেত্রেও অনেক সময় এমনই হয়। একটি হাদীস একটি নিয়ম বলে দেয়, আরেকটি হাদীস সময়ের ইঙ্গিত দেয়। দুটো মিলিয়ে উম্মতের আলেমরা একটি সিদ্ধান্তে পৌঁছান।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, সহীহ হাদীস অনুযায়ী প্রতিশ্রুত মসীহের আগমন শতাব্দীর শিরোভাগে হওয়ার কথা। বিরোধীরা বলেন, কোনো সহীহ হাদীসে হুবহু এমন কথা নেই যে “মসীহ শতাব্দীর শুরুতে আসবেন।” তাই তাদের মতে কথাটি ভিত্তিহীন।
নিয়মটি দিয়েছে একটি সহীহ হাদীস
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:
এই হাদীস একটি স্থায়ী নিয়ম ঘোষণা করে: আল্লাহর পক্ষ থেকে সংস্কারক আসেন শতাব্দীর শিরোভাগে। এমন সংস্কারককে বলা হয় মুজাদ্দিদ। উম্মতের আলেমরা তেরো শতাব্দী ধরে প্রতিটি শতাব্দীর মুজাদ্দিদদের তালিকা করেছেন; যেমন প্রথম শতাব্দীতে হযরত উমর ইবনে আবদুল আযীয (রহ.), পঞ্চম শতাব্দীতে ইমাম গাযযালী (রহ.), এগারো শতাব্দীতে মুজাদ্দিদে আলফে সানী হযরত শেখ আহমদ সিরহিন্দী (রহ.)।
এখন প্রশ্ন: প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী কি এই নিয়মের বাইরে? তিনি তো শেষ যুগের সবচেয়ে বড় সংস্কারক। তাহলে তাঁর আগমনও এই নিয়মেই হবে, শতাব্দীর শিরোভাগে। দুটি কথা মিলিয়ে পড়লে এটিই স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত।
আলেমরাও ঠিক এই হিসাবই করেছিলেন
এই সিদ্ধান্ত শুধু হযরত মির্যা সাহেবের নয়। তাঁর দাবির আগেই উপমহাদেশের বড় আলেমরা একই কথা লিখে গেছেন।
আহলে হাদীস জামাতের প্রসিদ্ধ আলেম নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (রহ.) তেরো শতাব্দীর শেষ দিকে তাঁর হুজাজুল কিরামাহ গ্রন্থে লিখেছেন:
“চতুর্দশ শতাব্দীর শিরোভাগ আসতে আর দশ বছর বাকি। যদি সেই সময় মাহদীর আবির্ভাব ও ঈসার অবতরণ ঘটে, তাহলে তিনিই হবেন সেই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ ও মুজতাহিদ।” (হুজাজুল কিরামাহ, পৃষ্ঠা ১৩৫–১৩৯)
লক্ষ করুন, তিনি মুজাদ্দিদের হাদীস আর মসীহ-মাহদীর আগমনকে একসাথে জুড়ে দিয়েছেন। অর্থাৎ প্রতিশ্রুত মসীহই হবেন চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ, আর তিনি আসবেন শতাব্দীর শুরুতে।
তাঁর ছেলে নওয়াব নূরুল হাসান খান চতুর্দশ শতাব্দীর একেবারে শুরুতে লিখেছিলেন, হিসাব অনুযায়ী মাহদী তেরো শতাব্দীতেই আসার কথা ছিল; শতাব্দী পেরিয়ে গেছে, এখন হয়তো চার-ছয় বছরের মধ্যেই তিনি আসবেন (ইকতিরাবুস সাআহ, পৃষ্ঠা ২২১)।
আল্লামা আবদুল গফুর তাঁর আন-নাজমুস সাকিব গ্রন্থে একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন: “যখন এক হাজার দুইশ চল্লিশ বছর পার হবে, আল্লাহ মাহদীকে পাঠাবেন।” (আন-নাজমুস সাকিব, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ২০৯)
অর্থাৎ উম্মতের আলেমরা সবাই তেরো শতাব্দীর শেষ আর চৌদ্দ শতাব্দীর শুরুর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। তাঁদের চোখ ছিল ঠিক সেই সময়ের দিকে, যখন হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) দাবি করেছিলেন।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, তেরো শতাব্দী যখন শেষ হয়ে আসছিল আর চৌদ্দ শতাব্দীর শুরু ঘনিয়ে আসছিল, তখন আল্লাহ তাআলা তাঁকে ইলহামের মাধ্যমে জানালেন যে তিনিই চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ (কিতাবুল বারিয়্যাহ)। কয়েক বছর পর তাঁকে জানানো হলো, যে মসীহ ও মাহদীর আগমনের সুসংবাদ মহানবী (সা.) দিয়েছিলেন, তিনিই সেই ব্যক্তি।
চতুর্দশ শতাব্দী শেষ হয়ে গেছে। এখন প্রত্যেকের কাছে একটি সরল প্রশ্ন: যদি মহানবী (সা.)-এর প্রতিশ্রুতি সত্য হয়, তাহলে চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ কে? সেই শতাব্দীর শুরুতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের দাবি নিয়ে, মসীহ ও মাহদী হিসেবে দাঁড়িয়েছেন আর কে?
তাই “মসীহ শতাব্দীর শুরুতে আসবেন” কথাটি মনগড়া নয়। এটি একটি সহীহ হাদীসের নিয়ম আর উম্মতের আলেমদের সর্বসম্মত হিসাবের সরল ফল।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“মুজাদ্দিদের হাদীসে তো মসীহের নাম নেই”
ঠিক, এই হাদীসে নাম নেই, আছে একটি নিয়ম। কিন্তু হাদীস পড়ার সঠিক পদ্ধতিই হলো একাধিক বর্ণনা মিলিয়ে পড়া। একদিকে নিয়ম: প্রতিটি শতাব্দীর শুরুতে সংস্কারক। অন্যদিকে সুসংবাদ: শেষ যুগে উম্মতের সবচেয়ে বড় সংস্কারক হবেন মসীহ ও মাহদী।
এ দুটিকে জুড়েছেন উম্মতের আলেমরাই, যেমন নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (রহ.)। হযরত মির্যা সাহেব নতুন কিছু আবিষ্কার করেননি; তিনি সেই হিসাবটিই উল্লেখ করেছেন যা তাঁর আগেই আলেমদের বইয়ে লেখা ছিল।
“আবু দাউদের এই হাদীস কি আসলেই নির্ভরযোগ্য?”
হ্যাঁ। এই হাদীসকে আধুনিক যুগের পরিচিত মুহাদ্দিস শায়খ নাসিরুদ্দীন আলবানীও সহীহ বলেছেন। আর তেরো শতাব্দী ধরে উম্মতের আলেমরা এর ভিত্তিতেই মুজাদ্দিদদের তালিকা তৈরি করেছেন। যে হাদীসের ওপর গোটা উম্মত শতাব্দীর পর শতাব্দী আমল করেছে, শুধু চতুর্দশ শতাব্দীতে এসে তাকে অস্বীকার করা যায় না।
“মুজাদ্দিদ তো অনেকেই হতে পারেন, এতে কী প্রমাণ হয়?”
প্রশ্নটি আমাদেরই প্রশ্নে ফিরে আসে। চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে আল্লাহর পক্ষ থেকে ইলহামের দাবি নিয়ে, সমস্ত বিরোধিতার মুখে দাঁড়িয়ে, কে বলেছেন, “আমিই এই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ”? আলেমরা অপেক্ষা করেছিলেন, সময় এসেছিল, শতাব্দী শেষও হয়ে গেছে। এই সময়ে এমন দাবিদার একজনই, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। যদি তিনি না হন, তাহলে মহানবী (সা.)-এর প্রতিশ্রুতি এই শতাব্দীতে কার মাধ্যমে পূর্ণ হলো, সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া দরকার।
সংক্ষেপে
- আবু দাউদের সহীহ হাদীস (৪২৯১) বলে, আল্লাহ প্রত্যেক শতাব্দীর শিরোভাগে একজন সংস্কারক পাঠান।
- প্রতিশ্রুত মসীহ শেষ যুগের সবচেয়ে বড় সংস্কারক, তাই তাঁর আগমনও এই নিয়মে শতাব্দীর শুরুতে হওয়াই স্বাভাবিক।
- নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (রহ.) লিখেছেন, চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে মাহদী ও ঈসা এলে তিনিই হবেন সেই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ।
- ঠিক সেই সময়েই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) মুজাদ্দিদ, মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.