মসীহ কি ষষ্ঠ হাজার বছরে জন্ম নেবেন? কুরআনের এক হাজার বছরের “দিন”

আপত্তি হলো, এমন কোনো হাদীস নেই যে মসীহ ষষ্ঠ সহস্রাব্দে আসবেন। কিন্তু হিসাবটা আসলে শুরু হয় কুরআনের একটি আয়াত থেকে। চলুন পুরো হিসাবটা ধাপে ধাপে দেখি।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

কুরআন বলে, আল্লাহ আকাশ ও পৃথিবী ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন। আর হযরত আদম (আ.) সম্পর্কে মুসলমানদের মধ্যে একটি প্রসিদ্ধ বর্ণনা আছে, তিনি সৃষ্টি হয়েছিলেন ষষ্ঠ দিনের শেষে, শুক্রবারে। সৃষ্টির শেষ ধাপে এসেছিলেন খলীফা।

এবার একটি প্রশ্ন ভাবুন। আল্লাহর কাছে “একদিন” কত লম্বা? কুরআন নিজেই এর উত্তর দিয়েছে। আর সেই উত্তর থেকেই শুরু হয় আজকের হিসাব।

আপত্তিটি কী?

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, প্রতিশ্রুত মসীহের জন্ম হবে ষষ্ঠ সহস্রাব্দে। বিরোধীরা বলেন, কোনো হাদীসে লেখা নেই যে “মসীহ ছয় হাজার সালে জন্ম নেবেন।” তাই তাঁদের মতে কথাটি হাদীসের নামে বানানো।

হিসাবটি শুরু হয় কুরআন থেকে

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَاِنَّ یَوۡمًا عِنۡدَ رَبِّکَ کَاَلۡفِ سَنَۃٍ مِّمَّا تَعُدُّوۡنَ
“…এবং নিশ্চয় কোন কোন দিন তোমার প্রতিপালকের নিকট এক হাজার বৎসরের সমান যাহা তোমরা গণনা কর।”
সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪৮
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২২:৪৭।

এই আয়াতের আলোকে উম্মতের অনেক বুযুর্গ মানবজাতির এই চক্রকে সাত “দিন”, অর্থাৎ সাত হাজার বছরে ভাগ করে দেখেছেন। আর আদম (আ.)-এর সাথে মিল রেখে তাঁরা বলেছেন: আদম যেমন ষষ্ঠ দিনের শেষে এসেছিলেন, শেষ যুগের খলীফাও আসবেন ষষ্ঠ হাজার বছরের শেষে।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁর হাকীকাতুল ওহী গ্রন্থে (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২০৯) ঠিক এ কথাই লিখেছেন। তাঁর বক্তব্যের সারাংশ: মুসলমানদের মধ্যে কাশফপ্রাপ্ত বুযুর্গরা প্রতিশ্রুত মসীহকে, যিনি শেষ খলীফা, আদমের সাথে তুলনা করেছেন; আদম যেমন ষষ্ঠ দিনের শেষে জন্মেছিলেন, প্রতিশ্রুত মসীহও জন্মাবেন ষষ্ঠ সহস্রাব্দের শেষে।

লক্ষ করুন, তিনি এটিকে কোনো একটি নির্দিষ্ট হাদীসের হুবহু বাক্য বলে দাবি করেননি। তিনি বলেছেন, কুরআনের আয়াত, বিভিন্ন বর্ণনা আর বুযুর্গদের কাশফ মিলিয়ে উম্মত এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছে।

✦

হিসাবটি মিলিয়ে দেখা যাক

হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-কে কাশফে জানানো হয়েছিল যে, মহানবী (সা.)-এর নবুয়তপ্রাপ্তির ৪,৫৯৮ সৌর বছর আগে হযরত আদম (আ.)-এর আবির্ভাব হয়েছিল।

মহানবী (সা.)-এর ওপর প্রথম ওহী আসে ৬১০ খ্রিষ্টাব্দে। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর জন্ম ১৮৩৫ খ্রিষ্টাব্দে। অর্থাৎ নবুয়তের ১,২২৫ বছর পর। এবার যোগ করি: ৪,৫৯৮ + ১,২২৫ = ৫,৮২৩।

অর্থাৎ আদম (আ.)-এর যুগ থেকে গণনা করলে তাঁর জন্ম হয়েছে ষষ্ঠ সহস্রাব্দে, আর তা-ও তার শেষ ভাগে। আদম যেমন ষষ্ঠ দিনের শেষে, মসীহও তেমনি ষষ্ঠ হাজার বছরের শেষে। আর তাঁর কাজ শুরু হয়েছে সপ্তম সহস্রাব্দের মুখে।

এই কারণেই তিনি লাহোরের বক্তৃতায় বলেছিলেন, “আমরা এখন সপ্তম সহস্রাব্দের শিরোভাগে আছি” (লেকচার লাহোর, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ১৮৬)। আর সিয়ালকোটের বক্তৃতায় বলেছিলেন, এটি শেষ সহস্রাব্দ, তাই শেষ যুগের ইমামের জন্ম এই সহস্রাব্দের সন্ধিক্ষণে হওয়া অবশ্যম্ভাবী ছিল (লেকচার সিয়ালকোট, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ২০৮)।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“কিন্তু হাদীসে তো সরাসরি ‘ছয় হাজার সাল’ লেখা নেই”

এখানে কেউ কেউ বলেন, হুবহু বাক্য না থাকলে দাবিটি বাতিল। কিন্তু ইসলামি জ্ঞানের ধারা এমন নয়। নামাযের রাকাত সংখ্যা, যাকাতের নিসাব, এমন অনেক বিষয় একাধিক দলিল মিলিয়ে বের করা হয়। এখানেও কুরআনের “এক দিন সমান এক হাজার বছর”, আদম (আ.)-এর ষষ্ঠ দিনে সৃষ্টি, আর মানবচক্রের সাত হাজার বছরের বর্ণনা মিলিয়ে সিদ্ধান্তটি এসেছে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেও একে বুযুর্গদের কাশফ ও সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

“আল্লাহর একদিন তো পঞ্চাশ হাজার বছরও বলা হয়েছে”

ঠিক, কুরআনে বিভিন্ন প্রসঙ্গে বিভিন্ন পরিমাপ এসেছে। সেই কারণেই আহমদীয়া অনুবাদে ২২:৪৮-এর অর্থ করা হয়েছে “কোন কোন দিন… এক হাজার বৎসরের সমান।” কিন্তু যে আয়াত মানবজাতির ধর্মীয় উত্থান-পতনের প্রসঙ্গে আসে, সেখানে পরিমাপটি এক হাজার বছর। সূরা আস-সাজদায় বলা হয়েছে, আল্লাহ আকাশ থেকে পৃথিবীর দিকে নিজের বিধান প্রবর্তন করেন, তারপর তা তাঁর দিকে উঠে যায় এমন এক দিনে, যার পরিমাণ তোমাদের গণনায় এক হাজার বছর (৩২:৬)। ধর্মের উত্থান-পতনের হিসাব তাই হাজার বছরের দিনেই।

“তাহলে কি পৃথিবীর বয়স মাত্র সাত হাজার বছর?”

না, আর এই ভুল বোঝাবুঝিটি হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই দূর করে গেছেন। ১৯০৮ সালে লাহোরে এক ইংরেজ বিজ্ঞানীর প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছিলেন, আমরা বাইবেলের মতো মনে করি না যে ছয়-সাত হাজার বছর আগে আদমের জন্মের সাথে পৃথিবী শুরু হয়েছে আর তার আগে কিছুই ছিল না। এই আদম প্রথম মানুষ নন; তাঁর আগেও মানুষ ছিল। সাত হাজার বছর হলো এই আদমের যুগের, অর্থাৎ বর্তমান ধর্মীয় চক্রের হিসাব, পৃথিবীর বয়সের নয়।

তাই আপত্তিটি টেকে না। হিসাবটি কুরআনের আয়াত থেকে শুরু, উম্মতের বুযুর্গদের কাশফে লালিত, আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর জন্মের সময়ে এসে মিলে গেছে।

সংক্ষেপে

  1. কুরআন বলে, আল্লাহর কাছে কোন কোন দিন আমাদের এক হাজার বছরের সমান (২২:৪৮)।
  2. বুযুর্গরা বলেছেন, আদম যেমন ষষ্ঠ দিনের শেষে, প্রতিশ্রুত মসীহও আসবেন ষষ্ঠ সহস্রাব্দের শেষে; হযরত মসীহ মওউদ (আ.) হাকীকাতুল ওহীতে এটি উল্লেখ করেছেন।
  3. আদম (আ.) থেকে হিসাব করলে তাঁর জন্ম (১৮৩৫) পড়ে ষষ্ঠ সহস্রাব্দের শেষ ভাগে।
  4. সাত হাজার বছর এই আদমের যুগের হিসাব, পৃথিবীর বয়সের নয়; এ কথা তিনি নিজেই স্পষ্ট করেছেন।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.