একই বইয়ে দাবিও, অস্বীকারও? ইযালায়ে আওহামের দুটি বাক্য

এক পৃষ্ঠায় তিনি নিজেকে প্রতিশ্রুত মসীহ বলছেন, আরেক পৃষ্ঠায় বলছেন তিনি ‘মসীলে মসীহ’, যাকে লোকে ভুল করে মসীহ মওউদ ভেবেছে। দুটি কথার মাঝে একটি ছোট্ট শব্দ লুকিয়ে আছে: কোন ‘মসীহ’?

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

উনিশ শতকের ভারতবর্ষে মুসলমানদের ঘরে ঘরে একটি ছবি আঁকা ছিল। শেষ যুগে আকাশ ফুঁড়ে, দুই ফেরেশতার কাঁধে হাত রেখে, হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.) নিজে দেহসহ নেমে আসবেন। সেই দুই হাজার বছর আগের ইসরাঈলী নবী।

১৮৯১ সালে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঘোষণা দিলেন, ঈসা (আ.) মারা গেছেন; তিনি আর আসবেন না। “ইবনে মারইয়াম”-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হবে উম্মতে মুহাম্মদীর মধ্য থেকে তাঁর মতো গুণের একজনের মাধ্যমে, আর সেই ব্যক্তি তিনি নিজে। এই ঘোষণার পটভূমি মনে রাখলেই আপত্তিটির জট খোলে।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা ইযালায়ে আওহাম-এর দুটি বাক্য পাশাপাশি রাখেন। এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, তিনি মসীহের সদৃশ (মসীলে মসীহ) হওয়ার দাবি করেছেন, যাকে কিছু মানুষ (ভুল করে) মসীহ মওউদ মনে করেছে; এবং এটি নতুন কোনো দাবি নয়। (পৃষ্ঠা ১৯০) আরেক জায়গায় লিখেছেন, যে ব্যক্তি তাঁর মসীহ মওউদ হওয়া মেনে নিয়েছে, সে বহু কল্যাণ লাভ করেছে। (পৃষ্ঠা ১৭৯) বিরোধীরা বলেন, তিনি একই বইয়ে মসীহ মওউদ হওয়ার দাবিও করেছেন, অস্বীকারও করেছেন।

দুটি আলাদা “মসীহ মওউদ”

এখানে “মসীহ মওউদ” শব্দটি দুটি আলাদা ছবির নাম।

প্রথম ছবি: সাধারণ মুসলমানদের কল্পনার মসীহ, অর্থাৎ ইসরাঈলী নবী হযরত ঈসা (আ.) নিজে, আকাশ থেকে দেহসহ নামবেন। এই অর্থে তিনি নিজেকে মসীহ মওউদ বলতে সব সময় অস্বীকার করেছেন। ওই পৃষ্ঠার কয়েক লাইন পরেই তিনি লিখেছেন, তিনি কখনো দাবি করেননি যে তিনি স্বয়ং ঈসা ইবনে মারইয়াম; যে এই অপবাদ দেয়, সে মিথ্যা বলে।

দ্বিতীয় ছবি: হাদীসে বর্ণিত সেই প্রতিশ্রুত ব্যক্তি, যিনি ঈসা (আ.)-এর গুণ ও স্বভাব নিয়ে উম্মতের মধ্য থেকে আসবেন। এই অর্থে তিনি দাবি করেছেন, আর বলেছেন, এটাও নতুন কথা নয়; বারাহীনে আহমদীয়া-তেই তিনি লিখেছিলেন যে তিনিই সেই রূপক প্রতিশ্রুত ব্যক্তি, যার আগমনের সংবাদ কুরআনে ইঙ্গিতে এবং হাদীসে স্পষ্টভাবে আছে।

অর্থাৎ পৃষ্ঠা ১৯০-এ তিনি “কল্পিত মসীহ” হওয়া অস্বীকার করছেন, আর পৃষ্ঠা ১৭৯-এ “হাদীসের প্রতিশ্রুত মসীহ” হওয়ার দাবি করছেন। একজন “মসীহ মওউদ” অস্বীকৃত, অন্যজন দাবিকৃত। বিরোধ নেই।

✦

হাদীস নিজেই কী বলে?

كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ
“তোমাদের কেমন অবস্থা হবে, যখন ইবনে মারইয়াম তোমাদের মধ্যে নাযিল হবেন, আর তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদেরই মধ্য থেকে।”
সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪৯

“তোমাদেরই মধ্য থেকে”: আগত মসীহ উম্মতে মুহাম্মদীর একজন হবেন। কুরআনও ইবনে মারইয়ামকে একটি “দৃষ্টান্ত” হিসেবে উল্লেখ করে:

وَلَمَّا ضُرِبَ ابۡنُ مَرۡیَمَ مَثَلًا اِذَا قَوۡمُکَ مِنۡہُ یَصِدُّوۡنَ
“এবং যখনই দৃষ্টান্ত স্বরূপ মরিয়মের পুত্রের উল্লেখ করা হয়, তো দেখ! তখনই তোমার জাতি ইহাতে হৈ চৈ আরম্ভ করে।”
সূরা আয-যুখরুফ ৪৩:৫৮
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৪৩:৫৭।

আহমদীয়া মুসলিম জামাত এখানে একটি ইঙ্গিত দেখে: মহানবী (সা.)-এর উম্মতে ইবনে মারইয়ামের একজন “মসাল” বা দৃষ্টান্ত আসবেন, আর তাঁর কথা শুনে জাতি হৈচৈ শুরু করবে। ইতিহাসে ঠিক তা-ই হয়েছে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“মসীলে মসীহ” আর “মসীহ মওউদ” কি এক জিনিস হতে পারে?

এখানে কেউ কেউ বলেন, “সদৃশ” মানেই আসল নয়, তাহলে তিনি প্রতিশ্রুত মসীহ হন কী করে? কিন্তু হাদীস যদি বলে ইমাম “তোমাদের মধ্য থেকে” হবেন, তাহলে প্রতিশ্রুত মসীহ তো প্রথম থেকেই ঈসা (আ.)-এর সদৃশ একজন উম্মতি। আলইসলাম ডট অর্গে উদ্ধৃত তাঁর ১৮৯১ সালের ঘোষণার মূল কথাও তা-ই: ঈসা (আ.) মৃত, তিনি আর ফিরবেন না; “ইবনে মারইয়াম”-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী রূপক, যা উম্মতের মধ্য থেকে একজন মুজাদ্দিদের মাধ্যমে পূর্ণ হবে। তাই মসীলে মসীহ হওয়াই প্রতিশ্রুত মসীহ হওয়া।

বারাহীনে আহমদীয়ায় তো তিনি ঈসা (আ.)-এর আকাশ থেকে আসার কথা লিখেছিলেন?

হ্যাঁ, এবং তিনি নিজেই এর ব্যাখ্যা দিয়েছেন। হাকীকাতুল ওহী-তে তিনি লিখেছেন, বারাহীনে আল্লাহ তাঁকে “ঈসা” নামে ডেকেছিলেন, কিন্তু মুসলমানদের প্রচলিত বিশ্বাস তাঁরও ছিল, তাই তিনি ওহীকে বাহ্যিক অর্থে না নিয়ে আগের বিশ্বাসেই থেকেছিলেন। পরে বৃষ্টির মতো ওহী এসে স্পষ্ট করে দিল যে প্রতিশ্রুত মসীহ তিনি নিজেই। তাঁর ভাষায়: “জ্ঞান না আসা পর্যন্ত আমি আগের কথাই বলেছি; জ্ঞান আসার পর ভিন্ন কথা বলেছি। আমি মানুষ মাত্র, অদৃশ্যের জ্ঞানী নই।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৪৮–১৫০)

তিনি কি নিজেকে ঈসা (আ.)-এর চেয়ে বড় মনে করতেন?

শুরুতে তিনি নিজেকে ঈসা (আ.)-এর চেয়ে কোনোভাবে বড় মনে করতেন না। পরে ওহীর ভিত্তিতে তিনি লিখেছেন: “আমি যখন প্রমাণ করেছি যে মসীহ ইবনে মারইয়াম মারা গেছেন এবং আগমনকারী মসীহ আমি নিজেই”, তখন যে কেউ বলে প্রথম মসীহই শ্রেষ্ঠ, তাকে কুরআন-হাদীস দিয়ে তা প্রমাণ করতে হবে। (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৫৫) এখানেও তিনি পরিষ্কার: “আগমনকারী মসীহ আমি”। দাবিটি কখনো প্রত্যাহার হয়নি।

হাদীসে তো “নাযিল” হওয়ার কথা আছে, তাহলে আকাশ থেকে আসাই কি অর্থ নয়?

এখানে কেউ কেউ বলেন, “নুযূল” মানেই ওপর থেকে নিচে নামা। কিন্তু কুরআন এই শব্দটি এমন জিনিসের জন্যও ব্যবহার করেছে, যা কেউ আকাশ থেকে পড়তে দেখেনি:

وَاَنۡزَلۡنَا الۡحَدِیۡدَ فِیۡہِ بَاۡسٌ شَدِیۡدٌ وَّمَنَافِعُ لِلنَّاسِ
“…এবং আমরা লৌহ নাযেল করিয়াছি, যাহাতে ভীষণ যুদ্ধের উপকরণ আছে এবং মানব জাতির জন্য বহুবিধ উপকার রহিয়াছে,…”
সূরা আল-হাদীদ ৫৭:২৬

লোহা খনি থেকে আসে, তবু কুরআন বলছে আল্লাহ তা “নাযিল” করেছেন। অর্থাৎ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কল্যাণকর জিনিসকে সম্মান দিয়ে “নাযিল” বলা হয়। প্রতিশ্রুত মসীহের “নুযূল”-ও তেমনি: আল্লাহর পক্ষ থেকে তাঁর আবির্ভাব, আকাশ ফুঁড়ে নামা নয়।

সংক্ষেপে

  1. তিনি যা অস্বীকার করেছেন, তা হলো সাধারণ মুসলমানদের কল্পিত সেই মসীহ, যিনি ইসরাঈলী ঈসা (আ.) নিজে আকাশ থেকে নামবেন।
  2. তিনি যা দাবি করেছেন, তা হলো হাদীসের প্রতিশ্রুত মসীহ, যিনি ঈসা (আ.)-এর সদৃশ হয়ে উম্মতের মধ্য থেকে আসবেন।
  3. বুখারীর হাদীস “তোমাদের ইমাম তোমাদেরই মধ্য থেকে” এই দ্বিতীয় অর্থের পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।
  4. তাই ইযালায়ে আওহামের দুটি বাক্য দুটি ভিন্ন জিনিস নিয়ে; একটিকে অন্যটির বিরুদ্ধে দাঁড় করানো যায় না।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.