মক্কার সাফা পাহাড়। মহানবী (সা.) পাহাড়ে উঠে কুরাইশদের ডাকলেন। সবাই জড়ো হলো। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, যদি বলি পাহাড়ের ওপাশে একদল ঘোড়সওয়ার আসছে, বিশ্বাস করবে? সবাই বলল, “আমরা কখনো তোমাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি।”
কিন্তু যেই তিনি আল্লাহর বাণী শোনালেন, সেই একই মানুষেরা তাঁকে মিথ্যাবাদী বলল। এরপর এল ঠাট্টা, গালি, পাথর, বয়কট আর হিজরত। সবচেয়ে সত্যবাদী মানুষটিকেও তাঁর জাতি প্রথমে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, কুরআন ও হাদীস থেকে জানা যায় যে প্রতিশ্রুত মসীহ যখন আসবেন, তাঁকে মিথ্যাবাদী বলা হবে, লাঞ্ছিত করা হবে। বিরোধীরা বলেন, কুরআন-হাদীসে এমন কোনো কথা নেই; এটি নিজের বিরোধিতাকে সত্যতার প্রমাণ বানানোর চেষ্টা।
কুরআন একটি স্থায়ী নিয়ম বলে দিয়েছে
কুরআন কোনো একজন নবীর কথা আলাদা করে বলেনি। বলেছে সব রসূলের কথা, একটি চিরন্তন নিয়ম হিসেবে:
“যখনই” শব্দটি লক্ষ করুন। কোনো ব্যতিক্রম রাখা হয়নি। সূরা ইয়াসীনে আরও স্পষ্ট করে বলা হয়েছে:
আর কী বলে ঠাট্টা করা হয়, সেটাও কুরআন জানিয়ে দিয়েছে:
এখন প্রশ্ন সহজ। হাদীসে আগমনকারী মসীহকে “নবীউল্লাহ” বলা হয়েছে। তিনি আল্লাহর প্রেরিত। তাহলে তিনি কি এই নিয়মের বাইরে থাকবেন? কুরআন কোথাও তাঁর জন্য ব্যতিক্রম ঘোষণা করেনি। তাই আল্লাহর নিয়ম অনুযায়ী তাঁকেও মিথ্যাবাদী বলা হবে, ঠাট্টা করা হবে।
হাদীসের ইঙ্গিত: ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
মহানবী (সা.) বলেছেন, বনী ইসরাঈলের ওপর যা এসেছিল, তাঁর উম্মতের ওপরও হুবহু তা আসবে:
বনী ইসরাঈলের মসীহ, হযরত ঈসা (আ.)-এর সাথে কী হয়েছিল? তাঁর জাতির আলেমরাই তাঁকে সবচেয়ে বেশি অস্বীকার করেছিল, কাফির বলেছিল, আদালতে টেনে নিয়েছিল, ক্রুশে চড়িয়ে লাঞ্ছিত করতে চেয়েছিল। এই উম্মতের মসীহের সাথেও যদি “জুতার মাপে” মিল থাকে, তাহলে তাঁর সাথেও একই আচরণ হওয়ার কথা।
এ কথা শুধু আহমদী মুসলমানদের নয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁর শেষ জীবনের গ্রন্থ চশমায়ে মারেফাত-এ লিখেছেন, যাঁরা আজ তাঁকে কাফির বলে গালি দেন, তাঁদের নিজেদের মান্য কিতাবেই লেখা আছে যে প্রতীক্ষিত মাহদী এলে তাঁকে কাফির বলা হবে, প্রত্যাখ্যান করা হবে, আর আলেমরা তাঁকে প্রায় হত্যা করতে উদ্যত হবেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) এবং শায়খ মুহিউদ্দীন ইবনে আরাবী (রহ.) দুজনেই এ কথা লিখেছেন।
ইবনে আরাবী (রহ.)-এর ফুতূহাতে মক্কিয়ার ৭৩ অধ্যায়ের বক্তব্যের সারকথা: ইমাম মাহদী যখন আবির্ভূত হবেন, তাঁর সবচেয়ে প্রকাশ্য ও কঠোর শত্রু হবেন সেই যুগের প্রথাগত আলেমরাই। কারণ তাঁকে মানলে তাঁদের প্রভাব কমে যাবে।
তাহলে দেখা যাচ্ছে, কুরআনের নিয়ম, হাদীসের ইঙ্গিত আর বুযুর্গদের লেখা একই কথা বলছে। আর বাস্তবেও ঠিক তা-ই ঘটেছে: দাবির পর থেকে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে কাফির, দাজ্জাল ও মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, তাঁর জামাতকে নির্যাতন করা হয়েছে।
তবে একটি কথা মনে রাখা জরুরি। শুধু বিরোধিতা কাউকে সত্য প্রমাণ করে না। কিন্তু যিনি অন্য প্রমাণ নিয়ে এসেছেন, তাঁর বিরোধিতা কুরআনের নিয়মেরই পূর্ণতা। আর কুরআনের পরের ঘোষণাও মনে রাখার মতো: শেষ পর্যন্ত আল্লাহ ও তাঁর রসূলরাই বিজয়ী হন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“মিথ্যা দাবিদারদেরও তো বিরোধিতা হয়, তাহলে পার্থক্য কোথায়?”
খুবই ন্যায্য প্রশ্ন। বিরোধিতা সত্য-মিথ্যা দুই রকম দাবিদারেরই হয়। পার্থক্য দেখা যায় শেষ ফলাফলে। কুরআন বলে:
মিথ্যা দাবিদার বিরোধিতায় হারিয়ে যায়; সত্য দাবিদার বিরোধিতার মধ্যেই বাড়তে থাকে। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে কাফির ফতোয়া, নিষেধাজ্ঞা আর নির্যাতনের মধ্যেও আহমদীয়া মুসলিম জামাত পৃথিবীর বহু দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। বিরোধিতা আর উন্নতি একসাথে চলা, এটিই নবীদের জামাতের চিহ্ন।
“মসীহ আকাশ থেকে নামলে তো সবাই চোখের সামনে দেখবে, তখন অস্বীকার কে করবে?”
অনেকে ভাবেন, মসীহ এলে সবাই এক বাক্যে মেনে নেবে। কিন্তু তাহলে কুরআনের “যখনই কোনো রসূল এসেছেন” নিয়মটি তাঁর বেলায় ভেঙে যায়। আল্লাহর নিয়মে পরিবর্তন হয় না। ঈমান মানে না দেখে মানা; সূর্যের মতো চোখে দেখা জিনিসে পরীক্ষা থাকে না।
তাই ইবনে আরাবী (রহ.)-এর মতো বুযুর্গরা আগেই লিখেছেন, মাহদীর সবচেয়ে বড় বিরোধী হবেন আলেমরা। যিনি সবার চোখের সামনে আকাশ থেকে নামবেন, তাঁর সাথে এমন শত্রুতার প্রশ্নই উঠত না। এই ভবিষ্যদ্বাণী নিজেই বলে, আগমন হবে এমনভাবে যে মানুষকে চিনে নিতে হবে, আর অনেকেই চিনবে না।
সংক্ষেপে
- কুরআন বলে, যখনই কোনো রসূল এসেছেন, তাঁর জাতি তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছে ও ঠাট্টা করেছে (২৩:৪৫, ৩৬:৩১, ৫১:৫৩)।
- আগমনকারী মসীহও আল্লাহর প্রেরিত; কুরআন তাঁর জন্য কোনো ব্যতিক্রম রাখেনি।
- তিরমিযীর হাদীস (২৬৪১) বলে, বনী ইসরাঈলের ইতিহাস এই উম্মতে পুনরাবৃত্ত হবে; তাদের মসীহকে আলেমরাই প্রত্যাখ্যান করেছিল।
- ইবনে আরাবী (রহ.) ও মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) লিখে গেছেন, মাহদীর বড় বিরোধী হবেন আলেমরা।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Writings of the Promised Messiah about Ibn al-Arabi (PDF) · alislam.org
- Establishing the Truthfulness of the Promised Messiah (as) from the Holy Quran · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.