বিতর্কের আসরে এই কথাটি প্রায়ই শোনা যায়: “মির্যা সাহেব নিজেই মৌলভী সানাউল্লাহ অমৃতসরীর বিরুদ্ধে দোয়া করেছিলেন, যে মিথ্যাবাদী সে সত্যবাদীর জীবদ্দশায় মারা যাবে। তারপর ১৯০৮ সালে তিনিই আগে মারা গেলেন। তাহলে তো ফয়সালা হয়েই গেছে।”
শুনতে খুব জোরালো লাগে। কিন্তু একটি ঘটনার বিচার করতে হলে শুধু শেষ লাইনটি নয়, পুরো গল্পটি জানতে হয়: কে কাকে ডেকেছিলেন, কে রাজি হয়েছিলেন, আর কে লিখে জানিয়েছিলেন যে তিনি রাজি নন।
দুজন মানুষ, দশ বছরের বিতর্ক
মৌলভী সানাউল্লাহ অমৃতসরী ছিলেন আহলে হাদীস ঘরানার একজন প্রসিদ্ধ আলেম ও “আহলে হাদীস” পত্রিকার সম্পাদক। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর দাবির তিনি ছিলেন সবচেয়ে সরব বিরোধীদের একজন।
১৮৯৭ সালে “আঞ্জামে আথম” গ্রন্থে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) বিরোধী আলেমদের মুবাহালার আহ্বান জানান, সেই তালিকায় মৌলভী সানাউল্লাহর নামও ছিল। মুবাহালা মানে, দুই পক্ষ একসাথে আল্লাহর কাছে কাতরভাবে দোয়া করবে যেন মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর লা’নত পড়ে।
১৯০২ সালে “ইজাযে আহমদী” গ্রন্থে বিষয়টি আবার ওঠে। সেখানে তিনি লেখেন, মৌলভী সানাউল্লাহ এমন ফয়সালার জন্য রাজি বলে লিখিত বক্তব্য দিয়েছেন, আর তিনি যদি সত্যিই এই চ্যালেঞ্জে অটল থাকেন, তবে তিনিই আগে মারা যাবেন (ইজাযে আহমদী, রূহানী খাযায়েন ১৯, পৃ. ১২১, ১৪৮)। কিন্তু মৌলভী সাহেব তখন “ইলহামাতে মির্যা” পুস্তিকায় জবাব দিলেন, এমন প্রতিযোগিতায় নামার সাহস তাঁর নেই।
১৯০৭ সালের এপ্রিল: “শেষ ফয়সালা”
১৯০৭ সালের ২৯ মার্চ মৌলভী সানাউল্লাহ তাঁর পত্রিকায় আবার চ্যালেঞ্জ ছুড়লেন। ৪ এপ্রিলের “বদর” পত্রিকায় তা গ্রহণ করা হলো। তারপর ১৫ এপ্রিল ১৯০৭ হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ইশতেহার প্রকাশ করলেন, যার শিরোনাম ছিল “মৌলভী সানাউল্লাহ সাহেবের সাথে শেষ ফয়সালা”।
এটি ছিল আল্লাহর কাছে একটি দোয়া: দুজনের মধ্যে যে মিথ্যাবাদী, আল্লাহ যেন তাকে সত্যবাদীর জীবদ্দশায় শেষ করে দেন। আর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশটি এর শেষে: তিনি মৌলভী সাহেবকে অনুরোধ করলেন, এই লেখাটি তাঁর পত্রিকায় ছাপুন এবং এর নিচে যা খুশি লিখুন। অর্থাৎ পুরো প্রস্তাবটি অপর পক্ষের জবাবের অপেক্ষায় রাখা হলো।
মৌলভী সানাউল্লাহর নিজের জবাব
মৌলভী সাহেব ইশতেহারটি ছাপলেন। ২৬ এপ্রিল ১৯০৭ তারিখের “আহলে হাদীস” পত্রিকার ৫ম পৃষ্ঠায় এর নিচে তিনি যা লিখলেন, সেটিই এই ঘটনার চাবিকাঠি। তাঁর কথাগুলো ছিল মোটামুটি এরকম:
“এই দোয়ার জন্য আমার সম্মতি নেওয়া হয়নি।” “আপনার এই লেখা কোনো অবস্থাতেই চূড়ান্ত ফয়সালা হতে পারে না।” “আমি যদি মারা যাই, আমার মৃত্যুতে কী প্রমাণ হবে?” আর শেষে স্পষ্ট ঘোষণা: “আপনার এই লেখা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।”
শুধু তাই নয়। একই জবাবে তাঁর সমর্থনে লেখা হলো, আল্লাহ মিথ্যাবাদীদের দীর্ঘ আয়ু দেন, যাতে তারা সেই সময়ে আরও মন্দ কাজ করে নিজেদের শাস্তি পূর্ণ করে।
এবার একটু থামুন। যে ফয়সালার প্রস্তাব অপর পক্ষ লিখিতভাবে ফিরিয়ে দিয়েছেন, এবং যিনি নিজেই বলেছেন যে মিথ্যাবাদী বরং বেশি দিন বাঁচে, সেই ফয়সালার ফলাফল দাবি করার অধিকার কি তাঁর থাকে?
কয়েক মাস পর, ১৯০৭ সালের আগস্টে “মুরাক্কায়ে কাদিয়ানী”-তে মৌলভী সাহেব নিজেই আরেকটি কথা লিখলেন: মহানবী (সা.) মিথ্যা নবুয়তের দাবিদার মুসায়লামার আগে ইন্তেকাল করেছিলেন। অর্থাৎ তিনি নিজেই মেনে নিলেন, কে আগে মারা গেলেন, শুধু সেটি দিয়ে সত্য-মিথ্যা যাচাই হয় না।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ১৯০৮ সালের ২৬ মে লাহোরে ইন্তেকাল করেন। মৌলভী সানাউল্লাহ মারা যান ১৯৪৮ সালে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এটি কি মুবাহালা ছিল না? মুবাহালায় তো মিথ্যাবাদীই আগে মরে।
কুরআন মুবাহালার নিয়মটি নিজেই বলে দিয়েছে। নাজরানের খ্রিস্টানদের সাথে বিতর্কের সময় আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে নির্দেশ দিলেন:
শব্দগুলো লক্ষ করুন: “আস”, “আমরা ডাকি”, “আমরা দোয়া করি”। মুবাহালা দুই পক্ষের যৌথ কাজ। নাজরানের প্রতিনিধিরা রাজি হননি, তাই সেই মুবাহালা হয়নি, আর কেউ বলে না যে একতরফা আহ্বানেই ফয়সালা হয়ে গেছে।
মৌলভী সানাউল্লাহও ঠিক একই কথা লিখেছিলেন: মুবাহালা হয় তখন, যখন দুই পক্ষই একে অপরের বিরুদ্ধে শপথ করে, আর তিনি এতে রাজি নন। তাই তাঁর নিজের ভাষাতেই এটি মুবাহালা ছিল না।
তবুও দোয়ায় তো বলা হয়েছিল, মিথ্যাবাদী আগে মরবে। তিনি আগে মারা গেলেন কেন?
দোয়াটি ছিল একটি ফয়সালার প্রস্তাব, আর প্রস্তাবের শেষেই অপর পক্ষের মত জানতে চাওয়া হয়েছিল। অপর পক্ষ লিখে জানালেন: এই ফয়সালা আমার কাছে গ্রহণযোগ্য নয়, আর মিথ্যাবাদী তো দীর্ঘ আয়ু পায়। দুজন মানুষের মধ্যে যে চুক্তি একজন প্রকাশ্যে প্রত্যাখ্যান করেছেন, তা দিয়ে পরে সেই মানুষটিই জয় দাবি করতে পারেন না।
ভেবে দেখুন, মৌলভী সাহেব নিজের নীতি অনুযায়ী তাঁর দীর্ঘ জীবনকে সত্যের প্রমাণ বলতে পারেন না, কারণ তিনিই লিখেছিলেন আল্লাহ মিথ্যাবাদীকে বেশি সময় দেন। আর তিনি নিজেই মুসায়লামার উদাহরণ দিয়ে মেনেছেন, আগে-পরে মৃত্যু একা কোনো প্রমাণ নয়।
তাহলে কি এই ঘটনা থেকে কিছুই প্রমাণ হয় না?
প্রমাণ হয় একটি জিনিস: বারবার আহ্বানের সময় কে পিছিয়ে গেছেন। ১৯০২ সালে মৌলভী সাহেব লিখেছিলেন, এমন প্রতিযোগিতায় নামার সাহস তাঁর নেই। ১৯০৭ সালে তিনি লিখলেন, এই দোয়ায় তিনি রাজি নন। যিনি দুবার প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন, তাঁর পক্ষে পরে “ফয়সালা হয়ে গেছে” বলা যুক্তির কথা নয়।
সত্য-মিথ্যা যাচাইয়ের আসল মাপকাঠি কুরআন অন্য জায়গায় দিয়েছে: দাবিকারকের শিক্ষা, তাঁর জীবন, আর আল্লাহর সাহায্য তাঁর কাজের সাথে থাকে কি না। সেই আলোচনা এই সাইটের অন্যান্য প্রবন্ধে আছে।
সংক্ষেপে
- ১৫ এপ্রিল ১৯০৭-এর “শেষ ফয়সালা” ছিল একটি দোয়ার প্রস্তাব, যেখানে মৌলভী সানাউল্লাহর জবাব চাওয়া হয়েছিল।
- ২৬ এপ্রিল ১৯০৭-এর “আহলে হাদীস” পত্রিকায় তিনি লিখে জানান, এতে তাঁর সম্মতি নেই এবং এই লেখা তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
- কুরআনের মুবাহালা দুই পক্ষের যৌথ দোয়া; এক পক্ষ রাজি না হলে মুবাহালা হয় না।
- মৌলভী সাহেব নিজেই লিখেছিলেন, মিথ্যাবাদী দীর্ঘ আয়ু পায়, আর আগে মৃত্যু একা কোনো প্রমাণ নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.