ধরুন একজন বললেন, “আমি নৌপথে চট্টগ্রাম যাইনি।” কিছুদিন পর তিনিই বললেন, “আমি কয়েকবার চট্টগ্রাম গেছি।” প্রথম কথা শুনে কেউ যদি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি কখনো চট্টগ্রাম যাননি, আর দ্বিতীয় কথা শুনে তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেন, ভুলটা কার? আসলে তিনি রেলে গিয়েছিলেন। একটি পথ অস্বীকার করেছেন, আরেকটি স্বীকার করেছেন।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নবুওয়াত নিয়ে আলোচনা বুঝতে এই সহজ উদাহরণটি কাজে লাগে।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নবী হওয়ার দাবি করেছেন, অথচ মহানবী (সা.) খাতামান নাবিয়্যীন। কুরআন বলছে:
আহমদীয়া মুসলিম জামাত এই আয়াতের ওপর পূর্ণ ঈমান রাখে। প্রশ্ন হলো, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঠিক কী দাবি করেছেন, আর কী অস্বীকার করেছেন।
তাঁর নিজের ভাষায়
১৯০১ সালে প্রকাশিত “এক গলতী কা ইযালা” (একটি ভুলের অপনোদন) পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন:
“যেখানেই আমি নবী বা রসূল হওয়া অস্বীকার করেছি, তা কেবল এই অর্থে যে আমি কোনো স্বতন্ত্র শরীয়ত আনিনি, আর আমি স্বতন্ত্র নবীও নই। আমি রসূল ও নবী কেবল এই অর্থে যে, যে রসূলের আমি অনুসরণ করি, তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক কল্যাণ লাভ করে, নিজের জন্য তাঁর নাম লাভ করে, তাঁরই মাধ্যমে আমি আল্লাহর কাছ থেকে অদৃশ্যের জ্ঞান পেয়েছি; কিন্তু কোনো নতুন শরীয়ত নিয়ে আসিনি। এই অর্থে নবী বলাকে আমি কখনো অস্বীকার করিনি।” (A Misconception Removed, পৃ. ১০)
পরের পৃষ্ঠায় তিনি যোগ করেছেন, এই নেয়ামত তাঁর ওপর সরাসরি আসেনি; আকাশে এক পবিত্র সত্তা আছেন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.), যাঁর আধ্যাত্মিক কল্যাণ তাঁর সঙ্গে আছে। তাঁর মধ্যে বিলীন হয়ে, প্রতিচ্ছবি (যিল্ল) হিসেবে তাঁর নাম পেয়েই তিনি নবী; ফলে খাতামান নাবিয়্যীনের মোহর অক্ষত থাকে। (একই পুস্তক, পৃ. ১০-১১)
“হাকীকাতুল ওহী”-তে তিনি বিষয়টি আরও পরিষ্কার করেছেন: মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে স্বতন্ত্র নবুওয়াত শেষ হয়েছে; যে ব্যক্তি সত্যিকার আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর উম্মতী প্রমাণিত না হয়, সে পূর্ণাঙ্গ ওহী পেতে পারে না। কিন্তু যিল্লি নবুওয়াত, অর্থাৎ কেবল মুহাম্মদী কল্যাণের মাধ্যমে ওহী পাওয়া, কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে, যেন মানুষের পূর্ণতার দরজা বন্ধ না হয়। তিনি লিখেছেন, এই অর্থেই আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে খাতামুল আম্বিয়া বানিয়েছেন। (Haqiqatul-Wahi, ইংরেজি সংস্করণ, পৃ. ৩৭)
অর্থাৎ তিনি অস্বীকার করেছেন: নতুন শরীয়ত, আর মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের বাইরে স্বতন্ত্র নবুওয়াত। তিনি স্বীকার করেছেন: মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের ফলে, তাঁর উম্মতী হয়ে, প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর বাক্যালাপ ও অদৃশ্যের জ্ঞান লাভ, যাকে আল্লাহ নিজেই নবুওয়াত নামে ডেকেছেন। রেল আর জাহাজের মতো, দুটি আলাদা পথ।
কুরআনও আনুগত্যের এই পুরস্কারের কথা বলে:
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“খাতামান নাবিয়্যীন মানে তো শেষ নবী; তাহলে আর কোনো নবী কীভাবে?”
এখানে অনেকে বলেন, আয়াতটি সব ধরনের নবুওয়াতের দরজা বন্ধ করেছে। চলুন দেখি অন্য মুসলমানরা নিজেরা কী বিশ্বাস করেন। প্রায় সব মুসলিম ফিরকা বিশ্বাস করে, শেষ যুগে হযরত ঈসা (আ.) আসবেন, আর তিনি নবী ছিলেন। সহীহ মুসলিমে হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.) আগমনকারী মসীহকে চারবার “নবীউল্লাহ ঈসা”, অর্থাৎ আল্লাহর নবী ঈসা বলেছেন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান ওয়া আশরাতিস সাআ)। তাহলে মহানবী (সা.)-এর পরে একজন নবীর আগমনকে সবাই খাতামান নাবিয়্যীনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেন না। বিরোধ শুধু এই: সেই নবী কি বনী ইসরাঈলের পুরনো ঈসা, যিনি আকাশ থেকে নামবেন, নাকি এই উম্মতেরই একজন, যিনি মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যে সেই মর্যাদা পাবেন?
মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) তাঁর মাকতুবাতে লিখেছেন, খাতামুর রসূল (সা.)-এর পরে তাঁর অনুসারীদের মধ্য থেকে, উত্তরাধিকার হিসেবে, নবীদের আবির্ভাব তাঁর খাতামুর রসূল হওয়ার পরিপন্থী নয় (“Important References about Khatam-e-Nabuwwat”, alislam.org-এ উদ্ধৃত)। আহমদীয়া জামাতের অবস্থান এই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।
“আগে অস্বীকার, পরে দাবি: এটা কি স্ববিরোধ নয়?”
শুরুর উদাহরণটি আবার ভাবুন। “এক গলতী কা ইযালা” লেখাই হয়েছিল এই ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে। তিনি নিজে বলে দিয়েছেন, যেখানে অস্বীকার করেছেন, সেটি শরীয়তবাহী ও স্বতন্ত্র নবুওয়াতের অস্বীকার; আর যেখানে স্বীকার করেছেন, সেটি উম্মতী নবুওয়াতের স্বীকৃতি। একজন লেখক নিজের কথার যে ব্যাখ্যা দেন, তা বাদ দিয়ে অন্য অর্থ চাপানো ন্যায়সংগত নয়।
“তাঁর দাবিতে কি মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা কমে যায়?”
বরং উল্টো। তাঁর বক্তব্য হলো, মহানবী (সা.)-এর কল্যাণ এত বড় যে তাঁর আনুগত্য করে একজন উম্মতী এই মর্যাদায় পৌঁছাতে পারেন। “হাকীকাতুল ওহী”-তে তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর সংকল্প ও দরদ চায়নি যে তাঁর উম্মত অপূর্ণ থাকুক, বা আল্লাহকে চেনার আসল উৎস ওহীর দরজা তাদের জন্য বন্ধ থাকুক (পৃ. ৩৭)। আর একই বইয়ে তিনি লিখেছেন, কুরআন যে নবুওয়াত বন্ধ করেছে, তার কোনো দাবি করা হয়নি; দাবি শুধু এই যে এক দিক থেকে তিনি উম্মতী, অন্য দিক থেকে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের কল্যাণে নবী (পৃ. ৪৯৭)। যে নবুওয়াত পুরোপুরি মহানবী (সা.)-এর দান, তা তাঁর মর্যাদা কমায় না, বাড়ায়।
সিদ্ধান্ত: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নতুন শরীয়ত বা স্বতন্ত্র নবুওয়াতের দাবি করেননি। তাঁর দাবি মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য থেকে জন্ম নেওয়া উম্মতী নবুওয়াতের, যা খাতামান নাবিয়্যীনের মোহরের ভেতরেই।
সংক্ষেপে
- তিনি নতুন শরীয়ত ও স্বতন্ত্র নবুওয়াত অস্বীকার করেছেন; উম্মতী নবুওয়াত স্বীকার করেছেন (A Misconception Removed, পৃ. ১০)।
- তাঁর নবুওয়াত মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি হিসেবে, তাঁরই কল্যাণে; তাই খাতামান নাবিয়্যীনের মোহর অক্ষত।
- অধিকাংশ মুসলমান নিজেরাই মহানবী (সা.)-এর পরে “নবীউল্লাহ ঈসা”-র আগমনে বিশ্বাস করেন; বিরোধ কেবল তাঁর পরিচয় নিয়ে।
- মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-ও অনুসারীদের মধ্য থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে নবুওয়াতকে খাতামুর রসূলের পরিপন্থী বলেননি।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- A Misconception Removed (Eik Ghalati Ka Izala) · alislam.org
- Haqiqatul-Wahi: The Philosophy of Divine Revelation (PDF) · alislam.org
- Important References about Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.