কাদিয়ানের একদিনের ঘটনা। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) অসুস্থ শরীরে বিছানায় শুয়ে আছেন। ঘরের এক কোণে কেউ মক্কার কাবা আর মদীনায় মহানবী (সা.)-এর রওজার কথা তুলল। কথাটি কানে যেতেই তাঁর চোখ ভিজে উঠল। গলা ভারী করে তিনি বললেন, “আমি কি কখনো মহানবী (সা.)-এর রওজা দেখতে পাব?” (তাহরীরাতে মুবারকা, পৃষ্ঠা ১৫৫–১৫৬)
যে মানুষটির হৃদয়ে এমন আকুলতা, তিনি হজে যাননি কেন? এই প্রশ্নটিই একটি আপত্তি হয়ে আছে।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, মির্যা সাহেব কখনো হজ করেননি। অথচ সহীহ মুসলিমের হাদীসে আছে, ইবনে মারইয়াম হজ বা উমরার জন্য ইহরাম বাঁধবেন। তাহলে তিনি প্রতিশ্রুত মসীহ হন কীভাবে?
হজ কার ওপর ফরয?
কুরআন হজকে ফরয করেছে একটি শর্তসহ:
“যাওয়ার সামর্থ্য” শুধু টাকা-পয়সা নয়। এর মধ্যে আছে বাহন, খরচ, শরীরের সক্ষমতা, আর পথের নিরাপত্তা। আলইসলাম ডট অর্গও লেখে, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক অবস্থা অনুকূল হলে জীবনে একবার হজ করতে হয়।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ক্ষেত্রে এই শর্তগুলো পূর্ণ হয়নি। মক্কা পর্যন্ত তাঁর বিরুদ্ধে কাফের ফতোয়া পৌঁছেছিল, তাঁকে হত্যা করাকে সওয়াবের কাজ বলে প্রচার করা হচ্ছিল, তাঁর ওপর হামলার চেষ্টা হয়েছিল। এর সঙ্গে তিনি মাথা ঘোরা ও ডায়াবেটিসের মতো অসুস্থতায় ভুগতেন।
তাঁর নিজের উত্তর
প্রশ্নটি তাঁর জীবদ্দশাতেই উঠেছিল। কেউ জানাল, বিরোধী মৌলভীরা জিজ্ঞেস করছে, মির্যা সাহেব হজে যান না কেন। তিনি বললেন:
“এরা দুষ্টামি করে এই আপত্তি তোলে। মহানবী (সা.) দশ বছর মদীনায় ছিলেন। মদীনা থেকে মক্কা মাত্র দুই দিনের পথ, অথচ দশ বছর তিনি হজ করেননি, যদিও বাহনের ব্যবস্থা করতে পারতেন। হজের শর্ত শুধু যথেষ্ট অর্থ নয়; এটাও জরুরি যে কোনো ফিতনার আশঙ্কা থাকবে না, আর নিরাপদে সেখানে পৌঁছানোর ব্যবস্থা থাকবে। যখন এখানেই উগ্র মৌলভীরা হত্যার ফতোয়া দিচ্ছে এবং সরকারকেও ভয় পাচ্ছে না, তখন সেখানে তারা কী না করবে?… এই আপত্তি আমাদের ওপর নয়, মহানবী (সা.)-এর ওপরও পড়ে, কারণ তিনিও জীবনের শেষ বছরেই হজ করেছিলেন।” (মলফূযাত, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৮)
ইতিহাস সাক্ষী: হিজরতের পর মহানবী (সা.) প্রথম হজ করেন দশম হিজরিতে, বিদায় হজে। হিজরতের পর বহু বছর মক্কার পথ মুসলমানদের জন্য নিরাপদ ছিল না। কুরআন হুদায়বিয়ার পর মুসলমানদের সান্ত্বনা দিয়েছিল যে তারা একদিন “নিরাপদে” মসজিদুল হারামে প্রবেশ করবে (সূরা আল-ফাতহ ৪৮:২৮)। নিরাপত্তা যে হজের শর্ত, এ থেকেই বোঝা যায়।
তাঁর পক্ষ থেকে হজ আদায়
যে নিজে হজ করতে অক্ষম, তার পক্ষ থেকে অন্য কেউ হজ করতে পারে। বিদায় হজের সময় খাসআম গোত্রের এক নারী মহানবী (সা.)-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, তাঁর বৃদ্ধ পিতার ওপর হজ ফরয, কিন্তু তিনি বাহনে স্থির হয়ে বসতে পারেন না; তিনি কি পিতার পক্ষ থেকে হজ করবেন? মহানবী (সা.) বললেন, “হ্যাঁ।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল হাজ্জ, হাদীস ১৫১৩)
হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছিল। হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রা.) তাঁর মায়ের বরাতে লিখেছেন, জীবনের শেষ দিনগুলোতে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) হজের ইচ্ছা প্রকাশ করেছিলেন; তাঁর ইন্তেকালের পর হযরত আম্মাজান (রা.) নিজের খরচে পুরোনো সাহাবী হাফেয আহমদুল্লাহ সাহেব (রা.)-কে তাঁর পক্ষ থেকে বদলি হজে পাঠান। (সীরাতুল মাহদী, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪)
কাবার প্রতি তাঁর ভালোবাসার আরেকটি ছবি পাওয়া যায় হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.)-এর একটি খুতবায়। কেউ হজে যাচ্ছেন জেনে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁকে চিঠি লিখে অনুরোধ করেছিলেন, প্রথম যখন কাবা চোখে পড়বে, তখন যেন তাঁর জন্য দোয়া করেন: আল্লাহ যেন তাঁর ওপর সন্তুষ্ট হন, তাঁর ত্রুটি ক্ষমা করেন, আল্লাহর ভালোবাসায় বাঁচা-মরার তওফিক দেন, আর ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের যে দায়িত্ব তাঁকে দেওয়া হয়েছে, তা পূর্ণ করার শক্তি দেন। (২০২৬ সালের ২ জানুয়ারির জুমুআর খুতবা, আলইসলাম ডট অর্গ)
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
সহীহ মুসলিমের হাদীসে তো ইবনে মারইয়ামের হজের কথা আছে?
হাদীসটি এই: মহানবী (সা.) কসম খেয়ে বলেছেন, “ইবনে মারইয়াম অবশ্যই ফাজ্জুর রাওহা থেকে হজ বা উমরা অথবা দুটোরই তালবিয়া পাঠ করবেন।” (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হাজ্জ) এখানে কেউ কেউ বলেন, প্রতিশ্রুত মসীহ সশরীরে হজ না করলে ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হয় না। চলুন মসীহের কাবা তাওয়াফ সংক্রান্ত আরেকটি হাদীস দেখি। মহানবী (সা.) বলেছেন, তাঁকে স্বপ্নে কাবার কাছে দেখানো হলো যে মসীহ ইবনে মারইয়াম কাবা তাওয়াফ করছেন; আর তাঁর পরে মসীহ দাজ্জালকেও কাবা তাওয়াফ করতে দেখলেন। (সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪০)
দাজ্জাল কাবা তাওয়াফ করছে: এটি যে আক্ষরিক নয়, তা সবাই মানেন। মসীহের হজ ও তাওয়াফের বর্ণনাগুলো তাই ব্যাখ্যাসাপেক্ষ দৃশ্য। তা ছাড়া হাদীসে কোনো সময়সীমা বলা নেই; আর তাঁর পক্ষ থেকে বদলি হজ আদায় হয়েছে, যা শরীয়তে হজ আদায়েরই একটি স্বীকৃত পথ।
নিরাপত্তার অজুহাত কি অতিরঞ্জন নয়?
তাঁর বিরুদ্ধে কাফের ও হত্যার উপযুক্ত ঘোষণা করে ফতোয়া প্রকাশিত হয়েছিল এবং বিভিন্ন সময় তাঁর ওপর হামলা হয়েছিল। এমন অবস্থায় হাজার মাইল দূরের এক দেশে, যেখানে এসব ফতোয়া পৌঁছে গেছে, যাওয়াকে নিরাপদ বলা যায় না। কুরআন যে নিরাপত্তার শর্ত রেখেছে, তা মানাই শরীয়তের আনুগত্য।
হজ না করা কি নবুওয়তের দাবির বিরুদ্ধে প্রমাণ?
যদি তা-ই হতো, তাহলে মহানবী (সা.)-এর হিজরতের পরের দীর্ঘ বছরগুলোও প্রশ্নবিদ্ধ হতো। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে সেটিই মনে করিয়ে দিয়েছেন। আর শুরুর গল্পটি মনে রাখুন: যে মানুষ মহানবী (সা.)-এর রওজার কথা শুনে কেঁদে ফেলেন, তাঁর হজে না যাওয়া অনীহা নয়, অপারগতা।
সংক্ষেপে
- কুরআন হজ ফরয করেছে সামর্থ্যের শর্তে, যার মধ্যে পথের নিরাপত্তা ও শারীরিক সক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত।
- তাঁর বিরুদ্ধে হত্যার ফতোয়া, হামলার চেষ্টা আর অসুস্থতার কারণে এই শর্ত পূর্ণ হয়নি।
- মহানবী (সা.)-ও মদীনায় দশ বছর থেকে জীবনের শেষ বছরে হজ করেছিলেন।
- তাঁর ইচ্ছা অনুযায়ী ইন্তেকালের পর তাঁর পক্ষ থেকে বদলি হজ আদায় হয়েছে; তাই এই আপত্তি টেকে না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.