তিনি কেন ছবি তুলেছিলেন?

হাদীসে ছবি তৈরিকারীদের কঠোর শাস্তির কথা আছে। তাহলে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কেন নিজের ছবি তুলতে দিলেন? উত্তরটি তিনি নিজেই লিখে গেছেন, আর তাতে আছে ইউরোপ-আমেরিকা থেকে আসা কিছু চিঠির গল্প।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

আমেরিকার এক নারী একটি ছবির দিকে তাকিয়ে ছিলেন। ছবিটি পাঞ্জাবের ছোট্ট গ্রাম কাদিয়ানের এক মানুষের, যিনি নিজেকে প্রতিশ্রুত মসীহ বলে দাবি করেছেন। অনেকক্ষণ দেখার পর তিনি চিঠি লিখলেন: এ তো ইয়াসূ, অর্থাৎ ঈসা (আ.)-এর ছবি!

এমন অনেক চিঠি ইউরোপ-আমেরিকা থেকে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর কাছে আসত। এই চিঠিগুলোর পেছনের গল্পই এই আপত্তির উত্তর।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা বলেন, সহীহ মুসলিমে আছে, “প্রত্যেক ছবি তৈরিকারী জাহান্নামে যাবে।” (কিতাবুল লিবাস ওয়ায যীনা) তাহলে মির্যা সাহেব কেন নিজের ছবি তুলতে দিলেন?

তাঁর নিজের ব্যাখ্যা

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) বারাহীনে আহমদীয়া-র পঞ্চম খণ্ডে বিষয়টি বিস্তারিত লিখেছেন। প্রথমেই তিনি নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন:

“কেউ আমার ছবি তুলে মূর্তিপূজকদের মতো নিজের কাছে রেখে দেবে বা প্রকাশ করবে, এর আমি ঘোর বিরোধী। আমি এমন কোনো নির্দেশ দিইনি। মূর্তিপূজা ও ছবিপূজার বিরুদ্ধে আমার চেয়ে বড় বিরোধী আর কেউ হতে পারে না।”

তাহলে ছবি কেন? তিনি লিখেছেন, ইউরোপের মানুষ কারো বই পড়ার আগে লেখকের ছবি দেখতে চায়। সেখানে মুখাবয়ব দেখে চরিত্র বোঝার বিদ্যা বেশ উন্নত; অনেকে শুধু ছবি দেখেই বলতে পারে দাবিদার সত্যবাদী না মিথ্যাবাদী। হাজার মাইল দূরের সেই মানুষেরা কাদিয়ানে এসে তাঁর মুখ দেখতে পারে না। তাই ছবির মাধ্যমে তারা তাঁর ভেতরের অবস্থা বোঝার চেষ্টা করে। বহু চিঠিতে তারা লিখেছে, ছবি ভালো করে দেখে তারা মানতে বাধ্য হয়েছে যে এটি কোনো মিথ্যাবাদীর ছবি নয়। (বারাহীনে আহমদীয়া, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯০–৪৯২; ২০২৬ সালের ১০ এপ্রিলের জুমুআর খুতবায় উদ্ধৃত)

এরপর তিনি উল্লেখ করেছেন সেই নীতি: ইন্নামাল আ’মালু বিন্নিয়্যাত, কাজের বিচার হয় নিয়ত দিয়ে।

✦

কুরআন ও হাদীস কী বলে?

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, ছবির নিষেধাজ্ঞা নিঃশর্ত নয়। কুরআন থেকে প্রমাণ হয় যে হযরত সুলায়মান (আ.)-এর জন্য প্রতিমূর্তি তৈরি করা হতো:

یَعۡمَلُوۡنَ لَہٗ مَا یَشَآءُ مِنۡ مَّحَارِیۡبَ وَتَمَاثِیۡلَ وَجِفَانٍ کَالۡجَوَابِ وَقُدُوۡرٍ رّٰسِیٰتٍ
“সে (সুলায়মান) যাহা চাহিত তাহারা তাহার জন্য উহাই নির্মাণ করিত যথা: ইবাদতখানাসমূহ, ঢালাইকরা প্রতিমূর্তিসমূহ, পুকুর সদৃশ গামলাসমূহ এবং সর্বদা (চুল্লিতে) রাখা বড় বড় ডেগসমূহ।…”
সূরা সাবা ৩৪:১৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩৪:১৩।

তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, জিবরাঈল (আ.) মহানবী (সা.)-কে রেশমি কাপড়ে হযরত আয়েশা (রা.)-এর ছবি দেখিয়েছিলেন। সহীহ বুখারীতে মহানবী (সা.) হযরত আয়েশা (রা.)-কে বলেছেন, “স্বপ্নে তোমাকে আমাকে দুবার দেখানো হয়েছে: রেশমের এক টুকরো কাপড়ে তোমাকে দেখলাম, আর কেউ বলল, এ তোমার স্ত্রী।” (সহীহ বুখারী, কিতাবু মানাকিবিল আনসার, হাদীস ৩৮৯৫)

আর তিনি একটি সহজ কথা বলেছেন: ছবি তোলার যে যন্ত্র আজ ব্যবহার হয়, তা মহানবী (সা.)-এর যুগে আবিষ্কৃতই হয়নি। এই যন্ত্র দিয়ে রোগ নির্ণয় হয়, মানুষের হাড়ের ছবি তুলে বাত-গেঁটে বাতের মতো রোগ বোঝা যায়, প্রাণী-পতঙ্গের ছবি দিয়ে জ্ঞানের বই তৈরি হয়। যে আল্লাহ জ্ঞান অর্জনে উৎসাহ দেন, তিনি কি এমন উপকারী যন্ত্র নিষিদ্ধ করবেন?

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

হাদীসে তো ছবি তৈরিকারীর শাস্তির কথা স্পষ্ট?

এখানে কেউ কেউ বলেন, হাদীস সব ধরনের ছবিকে নিষিদ্ধ করেছে। চলুন হাদীসটি পুরো পড়ি। এক ব্যক্তি হযরত ইবনে আব্বাস (রা.)-কে বলল, সে হাতের কাজে জীবিকা চালায়, ছবি তৈরি করে। তিনি মহানবী (সা.)-এর কথা শোনালেন:

مَنْ صَوَّرَ صُورَةً فَإِنَّ اللَّهَ مُعَذِّبُهُ، حَتَّى يَنْفُخَ فِيهَا الرُّوحَ، وَلَيْسَ بِنَافِخٍ فِيهَا أَبَدًا
“যে কোনো আকৃতি তৈরি করে, আল্লাহ তাকে শাস্তি দেবেন যতক্ষণ না সে তাতে প্রাণ ফুঁকে দেয়, আর সে কখনো তাতে প্রাণ দিতে পারবে না।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুল বুয়ূ, হাদীস ২২২৫

লোকটি ভয়ে বিবর্ণ হয়ে গেল। তখন ইবনে আব্বাস (রা.) বললেন, যদি একান্তই বানাতে হয়, তাহলে গাছপালা এবং যাতে প্রাণ নেই, এমন জিনিস বানাও। শাস্তির কারণ হাদীসেই আছে: আল্লাহর সৃষ্টির অনুকরণে প্রাণীর মূর্তি গড়া, যে মূর্তি মানুষকে শিরকের দিকে টানে। ক্যামেরার ছবি কোনো কিছু “গড়ে” না; এটি আয়নার প্রতিবিম্বের মতো, যা আছে তারই ছায়া ধরে রাখে।

যে ঘরে ছবি থাকে, সেখানে তো ফেরেশতা ঢোকে না?

হাদীসটি সহীহ বুখারীতে আছে: “যে ঘরে কুকুর বা ছবি থাকে, সেখানে ফেরেশতা প্রবেশ করে না।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল লিবাস, হাদীস ৫৯৪৯) হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এর প্রেক্ষিতে একটি প্রশ্ন রেখেছিলেন: আমাদের দেশের মৌলভীরা তাহলে পকেট আর ঘর থেকে রাজার মুখের ছবিওয়ালা টাকা-পয়সা ফেলে দেন না কেন? তাঁর ভাষায়, ইসলাম নিষেধ করেছে অর্থহীন কাজ আর এমন কাজ, যা মূর্তিপূজা বাড়ায়; জ্ঞান বাড়ায়, রোগ চেনায়, মানুষকে হিদায়াতের কাছে আনে, এমন কাজ নয়।

তাহলে কি আহমদী মুসলমানরা তাঁর ছবিকে সম্মান দেখায়?

না, এবং তিনি নিজেই এর কঠোর বিরোধিতা করেছেন। তিনি লিখেছেন, অপরিহার্য প্রয়োজন ছাড়া তাঁর ছবি নিয়মিত ছাপানোকে তিনি একেবারেই পছন্দ করেন না, কারণ এভাবেই ধীরে ধীরে বিদআত শিকড় গাড়ে আর মূর্তিপূজায় গিয়ে শেষ হয়। এক আরব ব্যক্তি তাঁর ছবি দিয়ে পোস্টকার্ড ছাপালে তিনি অসন্তুষ্ট হয়ে বলেন, তিনি ধর্মীয় প্রয়োজনে ছবি তুলিয়েছেন, এটিকে জীবিকার উপায় বা শিরকের দিকে নেওয়া কোনো কিছুতে পরিণত করা তিনি অনুমোদন করেন না; তখন কার্ডগুলো নষ্ট করে ফেলা হয়। (রিওয়ায়াতে আসহাবে আহমদ, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০৮) আজও খলীফাতুল মসীহ (আই.) জামাতকে সতর্ক করেন, ছবিকে সালাম করা বা শ্রদ্ধার বস্তু বানানো শিরকের পথ।

সংক্ষেপে

  1. তিনি ছবি তুলিয়েছিলেন একটি ধর্মীয় প্রয়োজনে: দূর দেশের সত্যান্বেষী মানুষ যেন তাঁর মুখ দেখে তাঁকে চিনতে পারে।
  2. কুরআনে সুলায়মান (আ.)-এর প্রতিমূর্তি আর বুখারীতে রেশমি কাপড়ে হযরত আয়েশা (রা.)-এর ছবির কথা আছে; তাই নিষেধাজ্ঞা নিঃশর্ত নয়।
  3. হাদীসের শাস্তি প্রাণীর মূর্তি গড়া ও শিরকের সঙ্গে যুক্ত; ক্যামেরার ছবি প্রতিবিম্ব, নতুন কিছু গড়া নয়।
  4. তিনি নিজেই ছবিপূজা ও ছবির অপব্যবহারের কঠোর বিরোধী ছিলেন; তাই এই আপত্তি টেকে না।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.