১৮৯১ সাল। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঘোষণা দিলেন, হযরত ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, আর প্রতিশ্রুত মসীহ তিনি নিজেই। ঘোষণাটি যেন একটি ঝড় তুলল। বাটালার মৌলভী মুহাম্মদ হোসেন সাহেব ও দিল্লির মৌলভী নযীর হোসেন সাহেবের উদ্যোগে একটি ফতোয়া তৈরি হলো, যা চারদিকে বিরাট আলোড়ন তুলল।
এই ফতোয়ার গল্প না জানলে এই আপত্তিটি বোঝা যায় না।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, মির্যা সাহেব অ-আহমদী মুসলমানদের কাফের বলেছেন। অর্থাৎ তিনিই মুসলিম উম্মাহকে বিভক্ত করেছেন এবং কোটি মুসলমানকে ইসলাম থেকে বের করে দিয়েছেন।
ফতোয়াগুলো কোন দিক থেকে এসেছিল?
আলইসলাম ডট অর্গ তখনকার কয়েকটি ফতোয়া তুলে ধরেছে। দিল্লির মৌলভী নযীর হোসেন সাহেব ১৮৯২ সালে ঘোষণা দিলেন, মির্যা সাহেব বা তাঁর অনুসারীদের সালাম দেওয়া যাবে না, দাওয়াত দেওয়া বা গ্রহণ করা যাবে না, তাঁদের পেছনে নামায পড়া যাবে না। (ইশাআতুস সুন্নাহ, ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫) মৌলভী রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী, মৌলভী সানাউল্লাহ অমৃতসরী, মৌলভী আহমদ রেযা খান বেরেলভী সহ আরও অনেকে একই রকম ফতোয়া দেন। এসব ফতোয়া উপমহাদেশের শহর-গ্রামের মসজিদে মসজিদে পড়ে শোনানো হয়।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) পরে সেই দিনগুলোর কথা লিখেছেন: তাঁর দাবির পর ফতোয়ায় লেখা হয়েছিল, এই ব্যক্তি কাফের, দাজ্জাল, মিথ্যাবাদী; তার জানাযা পড়া যাবে না; যে তাকে সালাম দেয়, হাত মেলায় বা মুসলমান বলে, সে-ও কাফের।
শিয়ালকোটের বক্তৃতায় (১৯০৪) তিনি দুঃখের সঙ্গে স্মরণ করেছেন, রমযান মাসে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের নিদর্শন দেখার পরও মানুষ তাঁর দিকে ফেরেনি; বরং তারা আগের চেয়েও বেশি গালমন্দ করতে লাগল এবং তাঁকে দাজ্জাল, কাফের ও মহা মিথ্যাবাদী বলতে লাগল। (লেকচার শিয়ালকোট)
তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন: “কোনো মৌলভী, কোনো বিরোধী বা কোনো নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি কি প্রমাণ দিতে পারবেন যে প্রথমে আমরা তাদের কাফের বলেছি? তাদের ফতোয়ার আগে আমাদের পক্ষ থেকে এমন কোনো কাগজ, বিজ্ঞাপন বা পত্রিকা থাকলে তা দেখান। নইলে ভাবুন, এটা কত বড় অবিচার যে নিজেরাই কাফের ফতোয়া দেয়, আবার আমাদের ওপর অপবাদ দেয় যে আমরা সব মুসলমানকে কাফের বলেছি।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১২০)
এই ফতোয়ার ফল কত নির্মম ছিল, তার একটি উদাহরণ আলইসলাম ডট অর্গ তুলে ধরেছে। ১৯১৫ সালের ২০ আগস্ট মালাবারের কান্নানোরে এক আহমদীর ছোট্ট শিশু মারা যায়। স্থানীয় কাজী আহমদী মুসলমানদের কাফের ঘোষণা করে ফতোয়া দিয়েছিলেন, তাই শিশুটিকে মুসলমানদের কোনো কবরস্থানে দাফন করতে দেওয়া হলো না। সেদিন দাফনই হলো না; পরদিন সন্ধ্যায় মুসলিম কবরস্থান থেকে দুই মাইলেরও বেশি দূরে এক জমিতে তাকে দাফন করা হয়। (আল-ফযল, ১৯ অক্টোবর ১৯১৫)
মহানবী (সা.)-এর সতর্কবাণী
তাহলে পরে কেন তিনি ফতোয়াদাতাদের সম্পর্কে কঠিন কথা বললেন? উত্তর একটি হাদীসে:
সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় আরও স্পষ্ট করে আছে: যাকে বলা হলো, সে যদি তেমনই হয় তো ঠিক আছে; নইলে কথাটি যে বলেছে, তার ওপরই ফিরে আসে। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান)
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই হাদীসের ভিত্তিতেই বলেছেন: এটি সর্বসম্মত কথা যে, যে মুমিনকে কাফের বলে, সে নিজেই কাফের হয়। “আমরা তাদের ওপর প্রথমে কোনো ফতোয়া দিইনি। এখন যে তাদের কাফের বলা হয়, তা তাদের কাফের ফতোয়া দেওয়ারই ফল।”
অন্য জায়গায় তিনি বলেছেন: “যারা আমাদের কাফের বলে না, আমরা তাদের কাফের বলি না। কিন্তু যে আমাদের কাফের বলে, তাকে কাফের না বললে তা হাদীস ও সর্বসম্মত বিষয়ের পরিপন্থী হয়, আর তা আমরা করতে পারি না।” (মলফূযাত, ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৬–৩৭৭)
অর্থাৎ তিনি নিজে থেকে কাউকে কাফের বলেননি। মহানবী (সা.)-এর হাদীসই বলে দিয়েছে, অন্যায় ফতোয়া কার ওপর ফিরে যায়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
যারা কোনো ফতোয়া দেয়নি, সেই সাধারণ মুসলমানদের কী হবে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, ফতোয়া তো কিছু আলেম দিয়েছেন, সাধারণ মানুষের দোষ কী? তাঁর নিজের কথায়: “আমরা কোনো কালেমা পাঠকারীকে ইসলামের বাইরে মনে করি না, যদি না সে আমাদের কাফের বলে নিজেই কাফের হয়।” (মলফূযাত, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩৫, ১৯৮৮ সংস্করণ) আর তিনি লিখেছেন: “আমি কোনো কালেমা পাঠকারীকে কাফের বলি না।” (তিরিয়াকুল কুলূব, রূহানী খাযায়েন, ১৫শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩৩) কুরআনও শিখিয়েছে:
তাহলে আহমদী মুসলমানরা অন্যদের পেছনে নামায পড়ে না কেন?
আলইসলাম ডট অর্গ এর ইতিহাস তুলে ধরেছে। প্রথমে অ-আহমদী আলেমরাই আহমদী মুসলমানদের তাঁদের পেছনে নামায পড়া নিষিদ্ধ করেন, মসজিদে ঢোকা বন্ধ করেন; কোথাও কোথাও আহমদী নামায পড়লে মসজিদের মেঝে ধুয়ে “পবিত্র” করা হতো। জামাত প্রতিষ্ঠার এগারো বছর পর, ১৯০০ সালে, মসজিদে বিশৃঙ্খলা এড়াতে আহমদী মুসলমানদের আলাদা নামায পড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। আর কোনো অ-আহমদীকে আজও আহমদী মুসলিম মসজিদে নামায পড়তে বাধা দেওয়া হয় না।
এমন পরস্পর কাফের বলা কি শুধু আহমদী মুসলমানদের সঙ্গেই ঘটেছে?
না। আলইসলাম ডট অর্গ দেখিয়েছে, তখনকার বিভিন্ন মুসলিম ফিরকার আলেমরা একে অপরকেও কাফের ঘোষণা করে ফতোয়া দিয়েছিলেন, এবং একে অপরের পেছনে নামায নিষিদ্ধ করেছিলেন। তাই আহমদী মুসলমানদের ক্ষেত্রে আলাদা মানদণ্ড ব্যবহার করা ন্যায্য নয়।
সংক্ষেপে
- ১৮৯১ সালের দাবির পর ১৮৯২ সাল থেকেই বিভিন্ন আলেম তাঁর ও তাঁর অনুসারীদের বিরুদ্ধে কাফের ফতোয়া দেন।
- তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন, কেউ দেখাক যে তাঁর পক্ষ থেকে আগে কাফের বলা হয়েছিল; কেউ দেখাতে পারেনি।
- মহানবী (সা.)-এর হাদীস অনুযায়ী অন্যায় কাফের ফতোয়া বক্তার ওপরই ফিরে আসে; তিনি শুধু সেই হাদীসের কথাই বলেছেন।
- যারা তাঁদের কাফের বলে না, তাদের তিনি কাফের বলেননি; কালেমা পাঠকারীকে তিনি ইসলামের বাইরে গণ্য করেননি।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Prayer Services led by a non-Ahmadi Muslim · alislam.org
- Are non-Ahmadis Muslim or non-Muslim? Ahmadiyya Muslim perspective · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.