ইয়া’জুজ-মা’জুজ: দেয়ালের ওপারের দৈত্য, না আগুনের জাতি?

কেউ ভাবেন তারা ছোট ছোট অদ্ভুত মানুষ, প্রতিদিন দেয়াল চেটে পাতলা করছে। কুরআন আর হাদীস কিন্তু এমন জাতির ছবি আঁকে, যারা প্রতিটি উচ্চতা জয় করবে আর যাদের সাথে যুদ্ধে কেউ পারবে না।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

একদিন মহানবী (সা.) ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। মুখমণ্ডল লাল, চোখে উদ্বেগ। তিনি বারবার বলছিলেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!” তারপর বললেন, আরবদের জন্য দুর্ভোগ, এক অনিষ্ট কাছে এসে গেছে; আজ ইয়া’জুজ-মা’জুজের প্রাচীরে এতটুকু ফাঁক হয়ে গেছে। এ কথা বলে তিনি বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে একটি বৃত্ত বানিয়ে দেখালেন।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মাঝে পুণ্যবান লোক থাকতেও কি আমরা ধ্বংস হব? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যখন পাপাচার বেড়ে যাবে” (জামে তিরমিযী, আবওয়াবুল ফিতান, হাদীস ২১৮৭; একই ঘটনা সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৩৪৬)।

কারা এই ইয়া’জুজ-মা’জুজ, যাদের কথা ভেবে মহানবী (সা.) এত উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন?

কুরআনের ছবি: প্রতিটি উচ্চতা থেকে ছুটে আসা

কুরআন শেষ যুগে তাদের আত্মপ্রকাশের কথা বলেছে এভাবে:

حَتَّىٰ إِذَا فُتِحَتْ يَأْجُوجُ وَمَأْجُوجُ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ
“এমন কি যখন ইয়া’জুজ ও মা’জুজকে ছাড়িয়া দেওয়া হইবে এবং তাহারা প্রত্যেক উচ্চভূমি (ও সামুদ্রিক তরঙ্গমালার উপর) হইতে ছুটিয়া আসিবে।”
সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৯৭
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২১:৯৬।

হাদাব মানে উঁচু ভূমি, আর নাসাল মানে দ্রুত ছুটে আগে চলে যাওয়া। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, অর্থাৎ শেষ যুগে এমন জাতি উঠবে যারা যা কিছু বড় ও মর্যাদাপূর্ণ, তাতে অন্য সব জাতিকে পেছনে ফেলবে; জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, রাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য, সবখানে তারা এগিয়ে থাকবে। দুনিয়ার সব উচ্চতায় তারা পৌঁছাবে, কিন্তু আধ্যাত্মিক উচ্চতা থেকে বঞ্চিত থাকবে (শাহাদাতুল কুরআন, রূহানী খাযায়েন, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬১-৩৬২)।

নামের ভেতরেই পরিচয়: আগুন

নাম দুটির মূল আরবি শব্দ আজীজ, যার অর্থ আগুনের লেলিহান শিখা। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, আল্লাহ্ তাঁকে জানিয়েছেন, ইয়া’জুজ-মা’জুজ সেই জাতি যারা আগুনের ব্যবহারে অন্য সবার চেয়ে দক্ষ। তাদের জাহাজ, রেলগাড়ি আর কলকারখানা চলবে আগুনে, তাদের যুদ্ধও হবে আগুনে। এরা পশ্চিমের জাতিগুলো। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থেও ইউরোপের জাতিগুলোকেই গগ ও মাগগ বলা হয়েছে (আইয়ামুস সুলহ, রূহানী খাযায়েন, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৪-৪২৫)।

বাইবেলের হিযকিল (যিহিষ্কেল) পুস্তকের ৩৮ অধ্যায়ে “মাগোগ দেশের গোগ”-এর কথা আছে, যাকে মেশক আর তুবলের অধিপতি বলা হয়েছে; আর বলা হয়েছে সে উত্তরের দূর প্রান্ত থেকে ঝড়ের মতো, মেঘের মতো দেশ ঢেকে আসবে।

✦

হাদীসের দৃশ্য: যাদের সাথে কেউ পারবে না

হযরত নাওয়াস ইবনে সাম‘আন (রা.)-এর দীর্ঘ হাদীসে মহানবী (সা.) বলেছেন, দাজ্জালের পর আল্লাহ্ ঈসা (আ.)-কে ওহী করে জানাবেন:

إِنِّي قَدْ أَخْرَجْتُ عِبَادًا لِي لاَ يَدَانِ لأَحَدٍ بِقِتَالِهِمْ فَحَرِّزْ عِبَادِي إِلَى الطُّورِ. وَيَبْعَثُ اللَّهُ يَأْجُوجَ وَمَأْجُوجَ وَهُمْ مِنْ كُلِّ حَدَبٍ يَنْسِلُونَ
“আমি আমার এমন কিছু বান্দা বের করেছি, যাদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কারও নেই। তাই তুমি আমার বান্দাদের নিয়ে তূর পাহাড়ে আশ্রয় নাও।” আর আল্লাহ্ ইয়া’জুজ-মা’জুজকে পাঠাবেন, তারা প্রতিটি উঁচু ভূমি থেকে ছুটে আসবে।
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯৩৭

এই হাদীসের কয়েকটি কথা লক্ষ্য করুন। প্রথম কথা: তাদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কারও নেই, এমনকি মসীহেরও না। তাই মসীহ্ তলোয়ার তুলবেন না; তিনি নিজের লোকদের নিয়ে আশ্রয় নেবেন। একই হাদীসে আছে, এরপর ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা আল্লাহর কাছে কাতর হয়ে দোয়া করবেন, আর আল্লাহ্ তাদের ঘাড়ে এক ধরনের কীট পাঠাবেন। অর্থাৎ ইয়া’জুজ-মা’জুজের পতন আসবে দোয়া আর আল্লাহর ফয়সালায়, মানুষের অস্ত্রে নয়।

দ্বিতীয় কথা: তাদের প্রথম দল তবারিয়া হ্রদ পার হওয়ার সময় সব পানি পান করে ফেলবে, আর শেষ দল এসে বলবে, এখানে একসময় পানি ছিল। পৃথিবীর সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলার এ এক জীবন্ত ছবি।

এবার আমাদের চারপাশে তাকান। গত দুই শতাব্দীতে কোন জাতিগুলো আগুন দিয়ে চলা ইঞ্জিন, জাহাজ, বিমান আর অস্ত্রে পৃথিবীর প্রতিটি উচ্চতা দখল করেছে? কাদের সামরিক শক্তির সামনে অন্যরা অসহায়? হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, কুরআনে আর হাদীসে বলা ইয়া’জুজ-মা’জুজের প্রতিটি চিহ্ন ইউরোপের শক্তিগুলোর উপরই মেলে; যুদ্ধ আর রাষ্ট্রনীতিতে তাদের সমকক্ষ কেউ নেই (চশমায়ে মা‘রিফত, রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৩-৮৮)।

শিঙায় ফুঁ: মসীহ্ মওউদের ডাক

সূরা কাহফে যুলকারনাইন আর ইয়া’জুজ-মা’জুজের কাহিনীর শেষে আল্লাহ্ বলেন:

وَتَرَكْنَا بَعْضَهُمْ يَوْمَئِذٍ يَمُوجُ فِي بَعْضٍ ۖ وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَجَمَعْنَاهُمْ جَمْعًا
“এবং সেই দিন আমরা তাহাদের কতককে কতকের বিরুদ্ধে প্রচণ্ড আক্রমণ করিতে ছাড়িয়া দিব, এবং শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হইবে। তখন আমরা তাহাদের সকলকে একত্রিত করিব।”
সূরা আল-কাহফ ১৮:১০০

জাতিগুলো ঢেউয়ের মতো একে অপরের উপর আছড়ে পড়বে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস যেন এই আয়াতেরই ছবি। তারপর শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, নবীরা আল্লাহর শিঙা, যাদের হৃদয়ে তিনি নিজের আওয়াজ ফুঁকে দেন। ইয়া’জুজ-মা’জুজের যুগে আল্লাহ্ মসীহ্ মওউদের মাধ্যমে পৃথিবীকে ডাক দেবেন, আর সেই ডাক শুনে সৎ মানুষেরা এক ধর্মের পতাকাতলে একত্রিত হবেন (চশমায়ে মা‘রিফত, রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড)।

লেকচার লাহোর-এর এক টীকায় তিনি আরও লিখেছেন, যুলকারনাইনের কাহিনী আসলে মসীহ্ মওউদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী: যারা ইয়া’জুজ-মা’জুজের হাতে কষ্ট পাবে আর তাঁর কাছে সাহায্য চাইবে, তিনি তাদের জন্য ইসলামের পক্ষে মজবুত যুক্তির এক উজ্জ্বল প্রাচীর গড়ে দেবেন, যা ইয়া’জুজ-মা’জুজের আক্রমণ ঠেকাবে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

ইয়া’জুজ-মা’জুজ তো দেয়ালের পেছনে আটকে থাকা এক বিশেষ সৃষ্টি, তারা মানুষ কি না তাও তো স্পষ্ট নয়?

কুরআনে যুলকারনাইনের কাহিনীতে স্পষ্ট, তারা দেশে ফাসাদ সৃষ্টিকারী মানুষ, যাদের ঠেকাতে স্থানীয় লোকেরা কর দিয়ে প্রতিবন্ধক বানাতে চেয়েছিল (সূরা আল-কাহফ ১৮:৯৫)। দেয়াল চেটে চেটে পাতলা করার যে গল্প প্রচলিত, তা কুরআনে নেই, বুখারী বা মুসলিমেও নেই। তিরমিযীর বর্ণনায় মহানবী (সা.) প্রাচীরে “এতটুকু ফাঁক”-এর কথা বলেছিলেন ঘুম থেকে জেগে উঠে। আঙুলের বৃত্তের মতো ছোট্ট সেই ফাঁক জানাচ্ছিল, তাদের উত্থানের সূচনা হয়ে গেছে; কোনো দৈত্যের জিভে দেয়াল ক্ষয়ের গল্প নয়।

দাজ্জাল আর ইয়া’জুজ-মা’জুজ কি আলাদা দুটি শক্তি নয়?

হাদীসগুলোতে দুটোরই প্রায় সারা পৃথিবীর উপর আধিপত্যের কথা আছে, আর একই সময়ে, মসীহের যুগে। একই সময়ে পৃথিবীতে দুটি আলাদা সর্বগ্রাসী শক্তি থাকতে পারে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাই বলেছেন, একই পশ্চিমা খ্রিষ্টান জাতির দুই দিক: ধর্মীয় প্রতারণার দিকটি দাজ্জাল, আর রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের দিকটি ইয়া’জুজ-মা’জুজ (চশমায়ে মা‘রিফত, রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫-৮৭, পাদটীকা)।

মসীহ্ তাহলে তাদের হারাবেন কীভাবে?

হাদীস নিজেই বলেছে, তাদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কারও নেই। তাই উত্তর তলোয়ার নয়। মসীহের অস্ত্র দোয়া, যুক্তি আর আল্লাহর নিদর্শন। হাদীসে মসীহ্ ও তাঁর সঙ্গীরা দোয়া করেন, আর আল্লাহ্ নিজেই ফয়সালা পাঠান। আজ আহমদীয়া মুসলিম জামাত ঠিক এই পথেই চলছে: অস্ত্র নয়, দলিল আর দোয়া দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে ইসলামের দাওয়াত।

সংক্ষেপে

  1. কুরআন বলে, শেষ যুগে ইয়া’জুজ-মা’জুজ প্রতিটি উচ্চতা থেকে ছুটে আসবে, অর্থাৎ দুনিয়ার সব ক্ষেত্রে সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।
  2. নামের মূল “আজীজ” মানে আগুন; আগুনে চলা যন্ত্র আর অস্ত্রে যারা পৃথিবী জয় করেছে, তারা পশ্চিমের শক্তিগুলো।
  3. সহীহ মুসলিমের হাদীসে তাদের সাথে কারও যুদ্ধের শক্তি নেই; মসীহ্ তাদের মোকাবিলা করবেন দোয়ায়।
  4. শিঙায় ফুঁ মানে মসীহ্ মওউদের ডাক, যা মানুষকে এক পতাকাতলে একত্রিত করবে।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.