একজন বাবা দূরে যাওয়ার আগে ছেলেকে বলে গেলেন, “আমার এক বন্ধু একদিন আসবেন। তিনি এলে যত কষ্টই হোক, তাঁর কাছে যাবি, তাঁর কথা শুনবি।” বহু বছর পর সেই বন্ধু সত্যিই এলেন। ছেলে বলল, “আমি তো বাবাকে ভালোবাসি, বাবার বন্ধুকে মানার দরকার কী?”
ছেলেটি কি সত্যিই বাবাকে ভালোবাসে? বাবার নির্দেশ অমান্য করে বাবাকে ভালোবাসা যায় না। ইমাম মাহদীর বিষয়টিও ঠিক এমন। মহানবী (সা.) শুধু তাঁর আগমনের খবর দেননি, তাঁকে মানার স্পষ্ট নির্দেশও দিয়ে গেছেন।
“বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও”
হযরত সাওবান (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) মাহদীর কথা বলতে গিয়ে বলেছেন:
ছবিটা চোখের সামনে আনুন। হিমশীতল বরফ, হাত-পা জমে যাচ্ছে, হাঁটার উপায় নেই। তবুও হামাগুড়ি দিয়ে এগোতে হবে। মহানবী (সা.) এর চেয়ে জোরালো ভাষায় আর কী বলতে পারতেন? এটি কোনো ঐচ্ছিক পরামর্শ নয়, এটি নির্দেশ: “তাঁর হাতে বয়আত করবে।”
আরেকটি হাদীসে মহানবী (সা.) বলেছেন, তোমাদের মধ্যে যে ঈসা ইবনে মারইয়ামের সাক্ষাৎ পাবে, সে যেন তাঁকে আমার সালাম পৌঁছে দেয় (আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন)। যাঁর কাছে মহানবী (সা.) নিজে সালাম পাঠাচ্ছেন, তাঁকে উপেক্ষা করার সুযোগ কোথায়?
যুগের ইমাম ছাড়া মৃত্যু
এবার একটি কঠিন কথা। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি মহানবী (সা.)-কে বলতে শুনেছেন:
জাহেলিয়াত মানে ইসলামের আগের অন্ধকার যুগ। মহানবী (সা.) বলছেন, বয়আতহীন মৃত্যু যেন সেই অন্ধকার যুগের মৃত্যু। হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনাতেও একই সতর্কবাণী আছে: যে আনুগত্য থেকে বেরিয়ে যায় এবং জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে মারা যায়, সে জাহেলিয়াতের মৃত্যু বরণ করে (সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৮৪৮; সুনান নাসাঈ, হাদীস ৪১১৪)।
জামাত আর ইমামকে আঁকড়ে থাকো
হযরত হুযাইফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) মহানবী (সা.)-কে ভবিষ্যতের ফিতনার কথা জিজ্ঞেস করেছিলেন। মহানবী (সা.) বললেন, এমন লোক আসবে যারা আমাদেরই জাতির, আমাদেরই ভাষায় কথা বলবে, কিন্তু মানুষকে জাহান্নামের দরজার দিকে ডাকবে। হুযাইফা (রা.) জানতে চাইলেন, সেই সময় পেলে তিনি কী করবেন?
এই হাদীস দেখায়, মুসলমানের জন্য একটি জামাত আর একজন ইমাম কতটা জরুরি। দলে দলে বিভক্ত উম্মতের জন্য আল্লাহ শেষ যুগে একজন ইমাম পাঠানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, আর তাঁর হাতে বয়আতের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি এলে তাঁকে মেনে নেওয়াই মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“আমি তো কালেমা পড়ি, আল্লাহ আর রসূলকে মানি। এটুকুই কি যথেষ্ট নয়?”
আলইসলাম ডট অর্গে ঠিক এই প্রশ্নের উত্তরে বলা হয়েছে: আল্লাহ আর তাঁর রসূলের ওপর ঈমান অর্থহীন হয়ে যায়, যদি কেউ তাঁদের ইচ্ছা ও নির্দেশ মেনে না চলে। কুরআন বলে:
মহানবী (সা.)-এর অনুসরণের মধ্যেই আছে তাঁর এই নির্দেশ: মাহদী এলে তাঁর হাতে বয়আত করো। যে এই নির্দেশ উপেক্ষা করে, সে মহানবী (সা.)-এর একটি কথাকে উপেক্ষা করে। কালেমা আমাদের মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যে বাঁধে, আর সেই আনুগত্যই আমাদের ইমাম মাহদীর কাছে নিয়ে যায়।
“জামাত আর ইমামের হাদীসগুলো তো রাজনৈতিক শাসকদের নিয়ে।”
এখানে কেউ কেউ বলেন, বয়আত আর ইমামের এসব হাদীস রাষ্ট্রের শাসকের আনুগত্য বোঝায়। চলুন দেখি। হুযাইফা (রা.)-এর হাদীসে মহানবী (সা.) এমন অবস্থার কথাও বলেছেন, যখন মুসলমানদের কোনো জামাত বা ইমাম থাকবে না, আর বিভক্ত দলগুলো থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। অর্থাৎ শুধু কোনো দেশের শাসক থাকলেই সমস্যার সমাধান হয় না; উম্মতের দরকার এক আধ্যাত্মিক ঐক্য আর এক সত্যিকারের ইমাম।
আর ইবনে মাজাহর হাদীসটি তো কোনো সাধারণ শাসকের কথা বলেনি। নির্দিষ্ট করে বলেছে, “তিনি আল্লাহর খলীফা আল-মাহদী।” এই বয়আতের নির্দেশ সরাসরি মাহদীর জন্য।
“তিনি সত্য হলে অধিকাংশ আলেম তাঁকে মানেন না কেন?”
প্রশ্নটা স্বাভাবিক। কিন্তু কুরআন এর উত্তর অনেক আগেই দিয়ে রেখেছে:
মূসা (আ.)-এর সময়ের পণ্ডিতেরা, ঈসা (আ.)-এর সময়ের ইহুদি আলেমরা, মহানবী (সা.)-এর সময়ের মক্কার নেতারা, প্রত্যেকেই শুরুতে সংখ্যায় ভারী ছিলেন। সত্য কখনো ভোটের সংখ্যা দিয়ে মাপা হয়নি। প্রত্যেক মানুষকে নিজেকেই প্রমাণ দেখে, আল্লাহর কাছে দোয়া করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, কারণ কিয়ামতের দিন প্রত্যেকে একাই আল্লাহর সামনে দাঁড়াবে।
সংক্ষেপে
- মহানবী (সা.) নির্দেশ দিয়েছেন, মাহদীকে দেখলে বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাঁর হাতে বয়আত করবে (ইবনে মাজাহ ৪০৮৪)।
- বয়আতহীন মৃত্যুকে তিনি জাহেলিয়াতের মৃত্যু বলেছেন (মুসলিম ১৮৫১)।
- তিনি জামাত আর ইমামকে আঁকড়ে থাকতে বলেছেন (মুসলিম ১৮৪৭)।
- আল্লাহ ও রসূলকে ভালোবাসার দাবি তাঁদের নির্দেশ মানার মধ্য দিয়েই পূর্ণ হয় (৩:৩২); তাই প্রতিশ্রুত ইমামকে মানা মহানবী (সা.)-এরই আনুগত্য।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- When I believe in Allah and the Holy Prophet (sa), why do I have to believe in the Promised Messiah (as)? · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.