মহানবী (সা.)-এর জীবনে দুটি শহর দুটি অধ্যায়ের প্রতীক। মক্কা হলো কঠিন সংগ্রাম আর শেষে বিজয়ের শহর, যেখানে দীর্ঘ বিরোধিতার পর শত্রুরা পরাজিত হয়েছিল। মদীনা হলো ভালোবাসার শহর, যেখানে মানুষ নিজে থেকেই দলে দলে এসে ইসলাম গ্রহণ করেছিল।
এই দুটি শহরের নাম যখন একটি ইলহামে আসে, তখন তা কি শুধু ভূগোলের কথা, নাকি এর পেছনে আরও গভীর কোনো অর্থ আছে?
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা তাযকেরাহ (৪র্থ সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৫০৩)-এর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর একটি ইলহাম ছিল, “আমি মক্কায় মৃত্যুবরণ করব অথবা মদীনায়।” কিন্তু তিনি ইন্তেকাল করেছেন লাহোরে। সুতরাং তাঁদের মতে ভবিষ্যদ্বাণীটি পূর্ণ হয়নি। তাঁরা আরও বলেন, মৃত্যুর পর আহমদী মুসলমানরা “মক্কী বিজয়” আর “মাদানী বিজয়”-এর নতুন ব্যাখ্যা বানিয়েছে।
ইলহামের পুরো পাঠ
ইলহামটি এসেছিল ১৯০৬ সালের ১৪ জানুয়ারি। এর তিনটি অংশ ছিল। প্রথম অংশ কুরআনের একটি আয়াতের শব্দে:
দ্বিতীয় অংশও কুরআনের শব্দে:
আর তৃতীয় অংশ: “আমি মক্কায় মৃত্যুবরণ করব অথবা মদীনায়।”
তিনটি অংশ একসঙ্গে পড়লে বোঝা যায়, ইলহামটি বিজয় আর শান্তির খবর দিচ্ছে, কবরের ঠিকানা নয়।
তিনি নিজে কী ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা হলো, এর ব্যাখ্যা কোনো পরবর্তী আহমদীর বানানো নয়। ইলহামের মাত্র কয়েকদিন পরে, ১৯০৬ সালের জানুয়ারিতেই, বদর পত্রিকা (১৯ জানুয়ারি ১৯০৬, পৃষ্ঠা ২) এবং আল-হাকাম পত্রিকায় (১৭ জানুয়ারি ১৯০৬, পৃষ্ঠা ৩) হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর নিজের ব্যাখ্যা ছাপা হয়েছিল।
সেই ব্যাখ্যার ভাব এমন: রহীম খোদা বলছেন, তোমার প্রতি শান্তি, অর্থাৎ তুমি ব্যর্থ হয়ে মারা যাবে না। আর মক্কায় বা মদীনায় মারা যাওয়ার অর্থ হলো, মৃত্যুর আগে হয় মক্কী বিজয় লাভ হবে, যেমন মক্কায় শত্রুরা পরাজিত হয়েছিল; অথবা মাদানী বিজয় লাভ হবে, যেখানে মানুষের হৃদয় নিজে থেকেই এদিকে ঝুঁকে পড়বে। “আল্লাহ লিখে রেখেছেন, আমি ও আমার রসূলগণই বিজয়ী হব” অংশটি মক্কী বিজয়ের দিকে, আর “পরম দয়াময় প্রভুর পক্ষ থেকে শান্তি” অংশটি মাদানী বিজয়ের দিকে ইঙ্গিত করে।
এই ব্যাখ্যা ছাপা হয়েছিল তাঁর ইন্তেকালের (মে ১৯০৮) প্রায় আড়াই বছর আগে। অর্থাৎ “মৃত্যুর পর নতুন ব্যাখ্যা” কথাটি তারিখের সঙ্গে মেলে না।
ভবিষ্যদ্বাণী কীভাবে পূর্ণ হলো
তাঁর জীবদ্দশায় বহু ঘোর বিরোধী তাঁর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী পরাজিত ও ধ্বংস হয়েছিল; এটি ছিল মক্কী বিজয়ের রূপ। আর লাখো মানুষ নিজের ইচ্ছায় তাঁকে গ্রহণ করেছিল, তাঁর মৃত্যুতে বহু বিশিষ্ট ব্যক্তি ইসলামের পক্ষে তাঁর ভূমিকার প্রশংসা করেছিলেন; এটি ছিল মাদানী বিজয়ের রূপ। তিনি ব্যর্থ হয়ে নয়, বিজয়ী হয়ে, শান্তির বার্তা নিয়ে এই পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
শব্দে তো শহরের নাম আছে, রূপক অর্থ কেন নেব?
এখানে কেউ কেউ বলেন, ইলহামে মক্কা-মদীনার নাম স্পষ্ট, তাই আক্ষরিক অর্থই নিতে হবে। চলুন দেখি, মহানবী (সা.)-এর স্বপ্নের ক্ষেত্রে কী হয়েছিল। সহীহ বুখারীতে আছে, তিনি স্বপ্নে দেখলেন মক্কা থেকে খেজুর বাগানের এক দেশে হিজরত করছেন। তিনি ভেবেছিলেন সেটি ইয়ামামা বা হাজার, কিন্তু পরে দেখা গেল সেটি মদীনা (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৬২২)। ওহী ও স্বপ্নের ভাষায় নাম ও দৃশ্য প্রায়ই প্রতীক হয়, আর তার প্রকৃত অর্থ ঘটনা ঘটলে স্পষ্ট হয়। এখানে তো ইলহামপ্রাপ্ত ব্যক্তি নিজেই অর্থ বলে দিয়েছেন, তাই অন্য অর্থ চাপানোর সুযোগ নেই।
অর্থ কে ঠিক করবে: ইলহামপ্রাপ্ত, না আপত্তিকারী?
যার উপর ইলহাম হয়েছে, তাকে আল্লাহ যে অর্থ বুঝিয়েছেন, সেটিই মূল অর্থ। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কোনো অভিধান থেকে নয়, ইলহামের সঙ্গে সঙ্গেই এর অর্থ জানিয়েছেন এবং তা ছাপা হয়ে মানুষের হাতে পৌঁছেছে। তিনি নিজে কখনো দাবি করেননি যে তিনি মক্কা বা মদীনা শহরে মারা যাবেন। তাই এমন একটি দাবি তাঁর উপর চাপিয়ে তারপর তাকে “অপূর্ণ” বলা ন্যায়সঙ্গত নয়।
“মক্কী বিজয়” আর “মাদানী বিজয়” বলতে কী বোঝায়?
মহানবী (সা.)-এর জীবনে মক্কার অধ্যায় ছিল দীর্ঘ বিরোধিতার। তেরো বছর ধরে অত্যাচার, বয়কট, শেষে জন্মভূমি ছেড়ে হিজরত। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই মক্কাই প্রায় বিনা রক্তপাতে তাঁর সামনে মাথা নত করল, আর যারা তাঁকে বের করে দিয়েছিল, তারা তাঁর দয়ার মুখাপেক্ষী হলো। এ হলো বিরোধীদের পরাজয়ের মাধ্যমে বিজয়।
মদীনার অধ্যায় ছিল ভিন্ন রকম। সেখানে মানুষ তলোয়ারের ভয়ে নয়, হৃদয়ের টানে ইসলাম গ্রহণ করেছিল। কুরআন এই দৃশ্যের কথা বলেছে:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ইলহামে এই দুই ধরনের বিজয়ের সুসংবাদই দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ শহর দুটি এখানে দুই ধরনের সাফল্যের প্রতীক। যিনি মক্কা বা মদীনার মতো বিজয় দেখে মারা যান, তিনি যেন “মক্কায়” বা “মদীনায়” মারা গেলেন। এই অর্থেই তিনি নিজে ইলহামটি বুঝেছিলেন এবং প্রকাশ করেছিলেন।
সব মিলিয়ে দেখা যায়, ইলহামটি একটি সুসংবাদ ছিল: তিনি ব্যর্থ হয়ে মারা যাবেন না, বরং বিজয় দেখে বিদায় নেবেন। ইলহামের কয়েকদিনের মধ্যেই তাঁর ব্যাখ্যা ছাপা হয়ে মানুষের হাতে পৌঁছেছিল, আর পরবর্তী ঘটনাবলি সেই অর্থকেই সত্য প্রমাণ করেছে।
সংক্ষেপে
- ১৪ জানুয়ারি ১৯০৬-এর ইলহামের তিনটি অংশ ছিল; প্রথম দুটি কুরআনের আয়াতে বিজয় (৫৮:২২) ও শান্তি (৩৬:৫৯)-র কথা।
- তিনি নিজেই সঙ্গে সঙ্গে ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন: মৃত্যুর আগে মক্কী বিজয় বা মাদানী বিজয় লাভ হবে।
- এই ব্যাখ্যা বদর ও আল-হাকাম পত্রিকায় তাঁর ইন্তেকালের প্রায় আড়াই বছর আগে ছাপা হয়েছিল।
- স্বপ্ন ও ইলহামে স্থানের নাম প্রতীকী হতে পারে, মহানবী (সা.)-এর হিজরতের স্বপ্ন তার উদাহরণ (বুখারী ৩৬২২)।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- আপত্তি: আমি মক্কা বা মদীনায় মৃত্যুবরণ করবো · ahmadiyyabangla.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.