হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কোন অর্থে নবী হওয়ার দাবি করেছেন?

তিনি এক ধরনের নবুওয়াত অস্বীকার করেছেন, আরেক ধরনের নবুওয়াত স্বীকার করেছেন। দুটিকে আলাদা করে দেখলেই বোঝা যায়, তাঁর দাবি মহানবী (সা.)-এর খাতামান নাবিয়্যীন মর্যাদার ভেতরেই।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

ধরুন একজন বললেন, “আমি নৌপথে চট্টগ্রাম যাইনি।” কিছুদিন পর তিনিই বললেন, “আমি কয়েকবার চট্টগ্রাম গেছি।” প্রথম কথা শুনে কেউ যদি সিদ্ধান্ত নেন যে তিনি কখনো চট্টগ্রাম যাননি, আর দ্বিতীয় কথা শুনে তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেন, ভুলটা কার? আসলে তিনি রেলে গিয়েছিলেন। একটি পথ অস্বীকার করেছেন, আরেকটি স্বীকার করেছেন।

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নবুওয়াত নিয়ে আলোচনা বুঝতে এই সহজ উদাহরণটি কাজে লাগে।

আপত্তিটি কী

একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নবী হওয়ার দাবি করেছেন, অথচ মহানবী (সা.) খাতামান নাবিয়্যীন। কুরআন বলছে:

مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَلٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَخَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا
“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কাহারও পিতা নহে, কিন্তু সে আল্লাহ্‌র রসূল এবং নবীগণের মোহর; এবং আল্লাহ্ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞানী।”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩৩:৪০।

আহমদীয়া মুসলিম জামাত এই আয়াতের ওপর পূর্ণ ঈমান রাখে। প্রশ্ন হলো, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঠিক কী দাবি করেছেন, আর কী অস্বীকার করেছেন।

তাঁর নিজের ভাষায়

১৯০১ সালে প্রকাশিত “এক গলতী কা ইযালা” (একটি ভুলের অপনোদন) পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন:

“যেখানেই আমি নবী বা রসূল হওয়া অস্বীকার করেছি, তা কেবল এই অর্থে যে আমি কোনো স্বতন্ত্র শরীয়ত আনিনি, আর আমি স্বতন্ত্র নবীও নই। আমি রসূল ও নবী কেবল এই অর্থে যে, যে রসূলের আমি অনুসরণ করি, তাঁর কাছ থেকে আধ্যাত্মিক কল্যাণ লাভ করে, নিজের জন্য তাঁর নাম লাভ করে, তাঁরই মাধ্যমে আমি আল্লাহর কাছ থেকে অদৃশ্যের জ্ঞান পেয়েছি; কিন্তু কোনো নতুন শরীয়ত নিয়ে আসিনি। এই অর্থে নবী বলাকে আমি কখনো অস্বীকার করিনি।” (এক গলতী কা ইযালা, ইংরেজি অনুবাদ A Misconception Removed, পৃ. ১০)

পরের পৃষ্ঠায় তিনি যোগ করেছেন, এই নেয়ামত তাঁর ওপর সরাসরি আসেনি; আকাশে এক পবিত্র সত্তা আছেন, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.), যাঁর আধ্যাত্মিক কল্যাণ তাঁর সঙ্গে আছে। তাঁর মধ্যে বিলীন হয়ে, প্রতিচ্ছবি (যিল্ল) হিসেবে তাঁর নাম পেয়েই তিনি নবী; ফলে খাতামান নাবিয়্যীনের মোহর অক্ষত থাকে। (একই পুস্তক, পৃ. ১০-১১)

“হাকীকাতুল ওহী”-তে তিনি বিষয়টি আরও পরিষ্কার করেছেন: মহানবী (সা.)-এর সঙ্গে স্বতন্ত্র নবুওয়াত শেষ হয়েছে; যে ব্যক্তি সত্যিকার আনুগত্যের মাধ্যমে তাঁর উম্মতী প্রমাণিত না হয়, সে পূর্ণাঙ্গ ওহী পেতে পারে না। কিন্তু যিল্লি নবুওয়াত, অর্থাৎ কেবল মুহাম্মদী কল্যাণের মাধ্যমে ওহী পাওয়া, কিয়ামত পর্যন্ত থাকবে, যেন মানুষের পূর্ণতার দরজা বন্ধ না হয়। তিনি লিখেছেন, এই অর্থেই আল্লাহ মহানবী (সা.)-কে খাতামুল আম্বিয়া বানিয়েছেন। (Haqiqatul-Wahi, ইংরেজি সংস্করণ, পৃ. ৩৭)

অর্থাৎ তিনি অস্বীকার করেছেন: নতুন শরীয়ত, আর মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের বাইরে স্বতন্ত্র নবুওয়াত। তিনি স্বীকার করেছেন: মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের ফলে, তাঁর উম্মতী হয়ে, প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর বাক্যালাপ ও অদৃশ্যের জ্ঞান লাভ, যাকে আল্লাহ নিজেই নবুওয়াত নামে ডেকেছেন। রেল আর জাহাজের মতো, দুটি আলাদা পথ।

কুরআনও আনুগত্যের এই পুরস্কারের কথা বলে:

وَمَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَالرَّسُوۡلَ فَاُولٰٓئِکَ مَعَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ مِّنَ النَّبِیّٖنَ وَالصِّدِّیۡقِیۡنَ وَالشُّہَدَآءِ وَالصّٰلِحِیۡنَ ۚ وَحَسُنَ اُولٰٓئِکَ رَفِیۡقًا
“এবং যাহারা আল্লাহ্ এবং এই রসূলের আনুগত্য করিবে তাহারা ঐ সকল লোকদের মধ্যে শামিল হইবে যাহাদিগকে আল্লাহ্ পুরস্কার দান করিয়াছেন অর্থাৎ নবীগণ এবং সিদ্দীকগণ এবং শহীদগণ এবং সালেহগণের মধ্যে। এবং ইহারাই সঙ্গী হিসাবে উত্তম।”
সূরা আন-নিসা ৪:৭০
✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“খাতামান নাবিয়্যীন মানে তো শেষ নবী; তাহলে আর কোনো নবী কীভাবে?”

এখানে অনেকে বলেন, আয়াতটি সব ধরনের নবুওয়াতের দরজা বন্ধ করেছে। চলুন দেখি অন্য মুসলমানরা নিজেরা কী বিশ্বাস করেন। প্রায় সব মুসলিম ফিরকা বিশ্বাস করে, শেষ যুগে হযরত ঈসা (আ.) আসবেন, আর তিনি নবী ছিলেন। সহীহ মুসলিমে হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.) আগমনকারী মসীহকে চারবার “নবীউল্লাহ ঈসা”, অর্থাৎ আল্লাহর নবী ঈসা বলেছেন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান ওয়া আশরাতিস সাআ)। তাহলে মহানবী (সা.)-এর পরে একজন নবীর আগমনকে সবাই খাতামান নাবিয়্যীনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করেন না। বিরোধ শুধু এই: সেই নবী কি বনী ইসরাঈলের পুরনো ঈসা, যিনি আকাশ থেকে নামবেন, নাকি এই উম্মতেরই একজন, যিনি মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যে সেই মর্যাদা পাবেন?

মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.) তাঁর মাকতুবাতে লিখেছেন, খাতামুর রসূল (সা.)-এর পরে তাঁর অনুসারীদের মধ্য থেকে, উত্তরাধিকার হিসেবে, নবীদের আবির্ভাব তাঁর খাতামুর রসূল হওয়ার পরিপন্থী নয়। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের অবস্থান এই ঐতিহ্যেরই ধারাবাহিকতা।

“আগে অস্বীকার, পরে দাবি: এটা কি স্ববিরোধ নয়?”

শুরুর উদাহরণটি আবার ভাবুন। “এক গলতী কা ইযালা” লেখাই হয়েছিল এই ভুল বোঝাবুঝি দূর করতে। তিনি নিজে বলে দিয়েছেন, যেখানে অস্বীকার করেছেন, সেটি শরীয়তবাহী ও স্বতন্ত্র নবুওয়াতের অস্বীকার; আর যেখানে স্বীকার করেছেন, সেটি উম্মতী নবুওয়াতের স্বীকৃতি। একজন লেখক নিজের কথার যে ব্যাখ্যা দেন, তা বাদ দিয়ে অন্য অর্থ চাপানো ন্যায়সংগত নয়।

“তাঁর দাবিতে কি মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা কমে যায়?”

বরং উল্টো। তাঁর বক্তব্য হলো, মহানবী (সা.)-এর কল্যাণ এত বড় যে তাঁর আনুগত্য করে একজন উম্মতী এই মর্যাদায় পৌঁছাতে পারেন। “হাকীকাতুল ওহী”-তে তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর সংকল্প ও দরদ চায়নি যে তাঁর উম্মত অপূর্ণ থাকুক, বা আল্লাহকে চেনার আসল উৎস ওহীর দরজা তাদের জন্য বন্ধ থাকুক (পৃ. ৩৭)। আর একই বইয়ে তিনি লিখেছেন, কুরআন যে নবুওয়াত বন্ধ করেছে, তার কোনো দাবি করা হয়নি; দাবি শুধু এই যে এক দিক থেকে তিনি উম্মতী, অন্য দিক থেকে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের কল্যাণে নবী (পৃ. ৪৯৭)। যে নবুওয়াত পুরোপুরি মহানবী (সা.)-এর দান, তা তাঁর মর্যাদা কমায় না, বাড়ায়।

সিদ্ধান্ত: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নতুন শরীয়ত বা স্বতন্ত্র নবুওয়াতের দাবি করেননি। তাঁর দাবি মহানবী (সা.)-এর আনুগত্য থেকে জন্ম নেওয়া উম্মতী নবুওয়াতের, যা খাতামান নাবিয়্যীনের মোহরের ভেতরেই।

সংক্ষেপে

  1. তিনি নতুন শরীয়ত ও স্বতন্ত্র নবুওয়াত অস্বীকার করেছেন; উম্মতী নবুওয়াত স্বীকার করেছেন (এক গলতী কা ইযালা, ইংরেজি অনুবাদ A Misconception Removed, পৃ. ১০)।
  2. তাঁর নবুওয়াত মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি হিসেবে, তাঁরই কল্যাণে; তাই খাতামান নাবিয়্যীনের মোহর অক্ষত।
  3. অধিকাংশ মুসলমান নিজেরাই মহানবী (সা.)-এর পরে “নবীউল্লাহ ঈসা”-র আগমনে বিশ্বাস করেন; বিরোধ কেবল তাঁর পরিচয় নিয়ে।
  4. মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-ও অনুসারীদের মধ্য থেকে উত্তরাধিকার হিসেবে নবুওয়াতকে খাতামুর রসূলের পরিপন্থী বলেননি।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.