১৮৯৩ সাল। অমৃতসরে খ্রিস্টান পাদ্রী আব্দুল্লাহ আথমের সঙ্গে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর দীর্ঘ বিতর্ক হয়ে গেছে। এর কিছুদিন পর এক পাদ্রী একটি বই ছাপালেন, নাম “তাওযীনুল আকওয়াল”। লেখকের নাম ইমাদুদ্দীন। একসময় তিনি মুসলমান ছিলেন, পরে খ্রিস্টান হয়ে যান, কিন্তু নিজের নামের সঙ্গে “মৌলভী” পরিচয় ধরে রেখেছিলেন।
বইটিতে কুরআনের ভাষা নিয়ে উপহাস করা হয়েছিল, আর মহানবী (সা.)-এর পবিত্র চরিত্রের ওপর জঘন্য আক্রমণ ছিল। alislam.org জানায়, বইটি এতটাই উসকানিমূলক ছিল যে হিন্দু পত্রিকাগুলো, এমনকি একটি খ্রিস্টান প্রকাশনাও, প্রকাশ্যে লিখেছিল: ১৮৫৭ সালের মতো আরেকটি বিদ্রোহ যদি হয়, তবে তা হবে এই লোকের লেখার কারণে।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: আহমদীরা বলেন “সবার জন্য ভালোবাসা, কারও প্রতি ঘৃণা নয়”, অথচ তাঁদের প্রতিষ্ঠাতা “নূরুল হক” পুস্তকে শত্রুদের হাজারবার লানত (অভিশাপ) দিয়েছেন। আপত্তিকারীদের মতে, মুখে ভালোবাসার কথা আর কাজে অভিশাপ, এটা স্ববিরোধ।
“নূরুল হক”-এর প্রেক্ষাপট
“নূরুল হক” (সত্যের আলো) ১৮৯৪ সালে আরবি ভাষায় লেখা হয়, “তাওযীনুল আকওয়াল”-এর জবাবে। alislam.org-এর “Introducing the Books of the Promised Messiah” প্রবন্ধ অনুযায়ী এর মূল ঘটনাপ্রবাহ এরকম:
ইমাদুদ্দীন কুরআনের ভাষাশৈলীকে দুর্বল বলে উপহাস করেছিলেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) বললেন, তিনি মহানবী (সা.)-এর একজন সেবক মাত্র; কুরআনের মতো কিছু লেখা তো দূরের কথা, ইমাদুদ্দীন আর তাঁর সঙ্গীরা আগে তাঁর নিজের আরবি লেখার সমকক্ষ কিছু লিখে দেখান। “নূরুল হক”-এর মতো একটি বই লিখতে পারলে তাঁদের পাঁচ হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে, সময় দুই মাস।
তিনি লিখলেন, বইটি আরবিতে লেখার কারণই হলো, যে খ্রিস্টানরা নিজেদের “মৌলভী” বলে আর জ্ঞানের অহংকার করে, তাদের জন্য এটি একটি চ্যালেঞ্জ। তিনি নিশ্চিত ছিলেন, তারা এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারবে না। আর তারপর লিখলেন: এই পরাজয়ের পরও যদি তারা মহানবী (সা.)-কে গালি দেওয়া বন্ধ না করে, তবে তাদের জন্য হাজার লানত; পাঠকদেরও তিনি এতে শরিক হতে বললেন।
এবার শর্তগুলো খেয়াল করুন। লানত কোনো সাধারণ বিরোধীর জন্য নয়, কোনো মুসলমানের জন্য নয়। লানত সেই নির্দিষ্ট লোকদের জন্য, যারা মিথ্যা পরিচয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করে মহানবী (সা.)-কে গালি দিচ্ছিল, এবং তাও এই শর্তে যে, চ্যালেঞ্জে হারার পরও তারা যদি গালি বন্ধ না করে। ফেরার দরজা খোলা রাখা হয়েছিল।
কুরআন ঠিক এই ধরনের মানুষের কথা বলে, যারা সত্য জেনেও গোপন করে:
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“ভালোবাসার বাণী আর লানত কি একসঙ্গে চলে?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, যিনি সবার প্রতি ভালোবাসার কথা বলেন, তাঁর মুখে অভিশাপ মানায় না। চলুন মহানবী (সা.)-এর দিকে তাকাই। তিনি “রাহমাতুল্লিল আলামীন”, সমগ্র জগতের জন্য রহমত। অথচ জীবনের শেষ অসুখের সময় তিনি বলেছিলেন:
নাজরানের খ্রিস্টানরা যখন সত্য জেনেও তর্ক চালিয়ে যাচ্ছিল, তখন আল্লাহ তাঁকে মুবাহালার নির্দেশ দিলেন: “এসো… তারপর কান্নাকাটি করে দোয়া করি এবং মিথ্যাবাদীদের ওপর আল্লাহর লানত যাচনা করি” (সূরা আলে ইমরান ৩:৬২)। কুরআন আরও জানায়, বনী ইসরাঈলের অস্বীকারকারীদের দাউদ (আ.) ও ঈসা (আ.)-এর ভাষায় অভিশপ্ত করা হয়েছিল (সূরা আল-মায়েদা ৫:৭৯)।
সাধারণ মানুষের প্রতি ভালোবাসা আর আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরুদ্ধে ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারের নিন্দা, এ দুটি পরস্পরবিরোধী নয়। ডাক্তার রোগীকে ভালোবাসেন বলেই রোগকে ঘৃণা করেন।
“লানত তো গালি; একজন আল্লাহওয়ালা মানুষ গালি দেন কীভাবে?”
লানত গালি নয়, একটি দোয়া: আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার প্রার্থনা। এ কারণেই কুরআন শব্দটি বারবার ব্যবহার করেছে, এমনকি আল্লাহর নিজের কাজ হিসেবেও। যে শব্দ কুরআন আল্লাহ, ফিরিশতা ও নবীদের ভাষায় ব্যবহার করেছে, তাকে অশ্লীল গালি বলা যায় না। আর এখানে লানতের বিষয়বস্তু নির্দিষ্ট: যারা মহানবী (সা.)-কে গালি দেওয়ার কাজ চালিয়ে যাবে।
“এক হাজার বার কেন?”
কুরআন এমন লোকদের সম্পর্কে বলেছে, যারা রসূলকে সত্য বলে সাক্ষ্য দেওয়ার পর এবং সুস্পষ্ট প্রমাণ পাওয়ার পর অস্বীকার করেছে:
আল্লাহ, সব ফিরিশতা আর সমগ্র মানবজাতির লানত, তার কোনো সংখ্যা নেই। ইমাদুদ্দীনের মতো লোকেরা একসময় মুসলমান আলেম ছিলেন, তারপর ইসলাম ছেড়ে কুরআন ও মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে কলম ধরেছিলেন। কুরআনের বর্ণনার তুলনায় “হাজার” বরং একটি সীমিত সংখ্যা। এটি মহানবী (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার এক তীব্র প্রকাশ, যা একজন মুসলমান সহজেই বুঝতে পারেন।
সিদ্ধান্ত: হাজার লানত কোনো মুসলমান বা সাধারণ বিরোধীর জন্য ছিল না। এটি ছিল মহানবী (সা.)-কে গালি দেওয়া একদল ধর্মত্যাগী পাদ্রীর প্রতি, শর্তসাপেক্ষে, কুরআনেরই ভাষায় দেওয়া জবাব। মানুষকে ভালোবাসা আর রসূলের অবমাননার নিন্দা, দুটোই একই ঈমানের দুই দিক।
সংক্ষেপে
- “নূরুল হক” (১৮৯৪) লেখা হয়েছিল ইমাদুদ্দীনের “তাওযীনুল আকওয়াল”-এর জবাবে, যেখানে কুরআন ও মহানবী (সা.)-কে আক্রমণ করা হয়েছিল।
- পাঁচ হাজার টাকার আরবি চ্যালেঞ্জের পর শর্ত দেওয়া হয়: হারার পরও মহানবী (সা.)-কে গালি দেওয়া বন্ধ না করলে হাজার লানত।
- মহানবী (সা.) নিজে লানতের কথা বলেছেন (সহীহ বুখারী ১৩৩০), আর কুরআন মুবাহালায় মিথ্যাবাদীদের ওপর লানত চাইতে শিখিয়েছে।
- কুরআন এমন লোকদের ওপর আল্লাহ, ফিরিশতা ও সব মানুষের লানতের কথা বলে; তাই এই আপত্তি টেকে না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.