সতেরো শতকের ভারত। সম্রাট আকবরের যুগের পর ইসলামের শিক্ষায় নানা বিকৃতি ঢুকে পড়েছে। এমন সময়ে সিরহিন্দের শায়খ আহমদ ফারুকী (রহ.) সংস্কারের কাজে দাঁড়ালেন। মুসলমানরা তাঁকে “মুজাদ্দিদে আলফে সানী”, অর্থাৎ দ্বিতীয় সহস্রাব্দের সংস্কারক, আর “ইমাম রাব্বানী” নামে চেনেন। তাঁর চিঠিপত্রের সংকলন “মাকতুবাত” আজও আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ভাণ্ডার।
এই মাকতুবাতের একটি কথা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর বইয়ে উল্লেখ করেছেন। আর সেটিকে ঘিরেই একটি আপত্তি।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) মুজাদ্দিদে আলফে সানী (রহ.)-এর একটি উদ্ধৃতি দুই জায়গায় দুইভাবে লিখেছেন। এক জায়গায় আল্লাহর সঙ্গে বেশি বাক্যালাপকারীকে “মুহাদ্দাস” বলা হয়েছে, আর “হাকীকাতুল ওহী”-তে (রূহানী খাযায়েন ২২তম খণ্ড, পৃ. ৪০৬) তাঁকে “নবী” বলা হয়েছে। আপত্তিকারীদের মতে, মুজাদ্দিদ (রহ.) “নবী” শব্দ ব্যবহার করেননি, তাই এটি বিকৃতি।
“হাকীকাতুল ওহী”-তে কথাটি কীভাবে এসেছে
অংশটি এরকম। প্রথমে তিনি বিরোধীদের অভিযোগের কথা বলেছেন যে তিনি নবুওয়াতের দাবি করেছেন। তারপর লিখেছেন:
“কুরআন যে নবুওয়াতকে বন্ধ বলেছে, তার কোনো দাবি করা হয়নি। দাবি শুধু এই যে, এক দিক থেকে আমি (মহানবী (সা.)-এর) উম্মতী, আর অন্য দিক থেকে মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের কল্যাণে আমি নবী। আর নবী বলতে কেবল এটুকু বোঝানো হয়েছে যে, আমি প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর বাক্যালাপ ও সম্বোধনের সম্মান পাই।”
এরপর বলেছেন, সত্য সেটাই যা সিরহিন্দের মুজাদ্দিদ (রহ.) তাঁর মাকতুবাতে লিখেছেন: “এই উম্মতের কিছু ব্যক্তি আল্লাহর বাক্যালাপ ও সম্বোধনের সম্মান পান এবং কিয়ামত পর্যন্ত পেতে থাকবেন; তবে যিনি এই বাক্যালাপ প্রচুর পরিমাণে পান এবং যাঁর কাছে অদৃশ্যের বিষয় প্রচুর পরিমাণে প্রকাশিত হয়, তাঁকে নবী বলা হয়।” (Haqiqatul-Wahi, ইংরেজি সংস্করণ, পৃ. ৪৯৭)
লক্ষ করুন, এখানে দুটি স্তরের কথা। প্রথম স্তর: উম্মতের অনেকে আল্লাহর সঙ্গে বাক্যালাপের সম্মান পান। দ্বিতীয় স্তর: যিনি তা “প্রচুর পরিমাণে” পান এবং অদৃশ্যের সংবাদও প্রচুর পান। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজের দাবিকে ঠিক এই দ্বিতীয় স্তরে রেখেছেন, আর তার ভিত্তি দিয়েছেন কুরআন থেকে:
অর্থাৎ অদৃশ্যের বিষয় প্রচুর পরিমাণে কেবল আল্লাহর মনোনীত রসূলকেই জানানো হয়। এই কুরআনী নীতিই বলে দেয়, যাঁকে প্রচুর অদৃশ্যের সংবাদ দেওয়া হয়, তাঁর পরিচয় কী।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“মাকতুবাতে যদি ‘মুহাদ্দাস’ শব্দ থাকে, তবে ‘নবী’ লেখা কি বিকৃতি নয়?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, উদ্ধৃতি মানে হুবহু শব্দ। চলুন দেখি। প্রথমত, “হাকীকাতুল ওহী”-তে কথাটি মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর বক্তব্যের সারমর্ম হিসেবে, “সত্য সেটাই যা তিনি লিখেছেন” বলে পেশ করা হয়েছে; মূল প্রবন্ধের লেখক দেখিয়েছেন, এটি উর্দুতে করা ভাবানুবাদ। আর ঠিক তার আগের বাক্যেই হযরত মসীহ মওউদ (আ.) পাঠককে জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁর পরিভাষায় “নবী” মানে প্রচুর বাক্যালাপ লাভকারী উম্মতী। শব্দ যা-ই হোক, পাঠকের সামনে অর্থ গোপন করা হয়নি, বরং খুলে বলা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, মুজাদ্দিদ (রহ.) নিজেও উম্মতের মধ্যে নবুওয়াতের পূর্ণতা লাভের পথের কথা বলেছেন। তাঁর মাকতুবাত থেকে উদ্ধৃত হয়েছে: “খাতামুর রসূল হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)-এর পরে তাঁর অনুসারীদের মধ্য থেকে, উত্তরাধিকার হিসেবে, নবীদের আবির্ভাব তাঁর খাতামুর রসূল হওয়ার কোনোভাবেই পরিপন্থী নয়। অতএব হে পাঠক, সন্দেহকারীদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না।” (মাকতুবাতে ইমাম রাব্বানী)
মাকতুবাতের ১ম খণ্ডের ৩০১ নম্বর চিঠি থেকেও উদ্ধৃত হয়েছে যে, বেলায়েতের পূর্ণতার মাধ্যমে নবুওয়াতের পূর্ণতা পর্যন্ত পৌঁছানোর একটি পথ খোলা আছে। তাহলে মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর চিন্তায় উম্মতী নবুওয়াতের ধারণা অপরিচিত ছিল না।
“তাহলে কি মুহাদ্দাস আর নবী একই জিনিস?”
না, এবং হযরত মসীহ মওউদ (আ.) পার্থক্যটি নিজেই ব্যাখ্যা করেছেন। “হাকীকাতুল ওহী”-তে তিনি লিখেছেন, তাঁর আগে উম্মতের কোনো ওলী, আবদাল বা কুতুবকে এই পরিমাণ বাক্যালাপ ও অদৃশ্যের জ্ঞান দেওয়া হয়নি; এ কারণে নবী উপাধির জন্য কেবল তিনিই বিশিষ্ট হয়েছেন, আর অন্যরা এই উপাধির যোগ্য নন, কারণ প্রচুর ওহী ও অদৃশ্যের সংবাদ এর শর্ত (Haqiqatul-Wahi, ইংরেজি, পৃ. ৪৯৮)। অর্থাৎ পার্থক্য পরিমাণ আর পূর্ণতার। অল্প বা মাঝারি পরিমাণে বাক্যালাপপ্রাপ্ত ওলী মুহাদ্দাস; আর যাঁকে প্রচুর পরিমাণে দেওয়া হয় এবং যাঁর জন্য মহানবী (সা.) নিজেই এই উপাধি ভবিষ্যদ্বাণী করে গেছেন, তিনি উম্মতী নবী।
সেই ভবিষ্যদ্বাণী সহীহ মুসলিমে আছে। হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রা.)-এর দীর্ঘ বর্ণনায় মহানবী (সা.) আগমনকারী মসীহকে চারবার “নবীউল্লাহ ঈসা”, অর্থাৎ আল্লাহর নবী ঈসা বলেছেন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান ওয়া আশরাতিস সাআ)।
“তিনি কি এর মাধ্যমে খতমে নবুওয়াত অস্বীকার করেছেন?”
একই অনুচ্ছেদেই তিনি বলেছেন, কুরআন যে নবুওয়াত বন্ধ করেছে, তার কোনো দাবি তিনি করেননি; তিনি যা পেয়েছেন, মহানবী (সা.)-এর নবুওয়াতের কল্যাণেই পেয়েছেন। মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর ভাষায়ও, উত্তরাধিকার হিসেবে অনুসারীদের মধ্য থেকে এমন আবির্ভাব খাতামুর রসূলের মর্যাদার পরিপন্থী নয়।
সিদ্ধান্ত: এখানে কোনো বিকৃতি নেই। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর বক্তব্যের মর্ম তুলে ধরেছেন, নিজের পরিভাষা আগেই স্পষ্ট করেছেন, আর এর ভিত্তি দিয়েছেন কুরআনের সূরা আল-জিন্ন থেকে।
সংক্ষেপে
- “হাকীকাতুল ওহী”-তে তিনি আগে বলে দিয়েছেন, তাঁর পরিভাষায় নবী মানে প্রচুর পরিমাণে আল্লাহর বাক্যালাপপ্রাপ্ত উম্মতী।
- মুজাদ্দিদ (রহ.)-এর বক্তব্যের মর্মও তা-ই: বাক্যালাপ ও অদৃশ্যের জ্ঞান যাঁকে প্রচুর দেওয়া হয়, তাঁর মর্যাদা আলাদা।
- মুজাদ্দিদ (রহ.) নিজেই লিখেছেন, উত্তরাধিকার হিসেবে অনুসারীদের মধ্য থেকে নবীর আবির্ভাব খাতামুর রসূলের পরিপন্থী নয়।
- কুরআন (৭২:২৭-২৮) ও সহীহ মুসলিমের “নবীউল্লাহ ঈসা” বর্ণনা এই ব্যাখ্যার ভিত্তি; তাই বিকৃতির অভিযোগ টেকে না।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Haqiqatul-Wahi: The Philosophy of Divine Revelation (PDF) · alislam.org
- Important References about Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
- Truth Prevails, Chapter III · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.