১৮৯০-এর দশকের শুরু। পাঞ্জাবের মালেরকোটলার নওয়াব পরিবারের সদস্য নওয়াব মুহাম্মদ আলী খান কাদিয়ানের এক দাবিদারের কথা শুনেছেন। মনে প্রশ্ন জাগছে: এই মানুষটি কি সত্যিই আল্লাহর প্রেরিত? তিনি চিঠি লিখে কয়েকটি প্রশ্ন পাঠালেন। একটি প্রশ্ন ছিল ইস্তেখারা নিয়ে: আল্লাহর কাছে দোয়া করে কীভাবে সত্য জানা যায়, আর শয়তানের প্রভাব থেকে কীভাবে বাঁচা যায়?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁকে বিস্তারিত উত্তর দিলেন। সেই চিঠির একটি বাক্য আজ আপত্তির বিষয়।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, মানুষ নফল হজ্জ করতে যায়, কিন্তু এখানে (কাদিয়ানে) সওয়াব তার চেয়ে বেশি; আর গাফেল থাকলে ক্ষতি, কারণ এই সিলসিলা আসমানী আর নির্দেশ খোদায়ী। আপত্তিকারীরা রূহানী খাযায়েন ৫ম খণ্ডের ৩৫২ পৃষ্ঠার বরাত দেন এবং বলেন, এতে হজ্জের চেয়ে কাদিয়ানকে বড় করা হয়েছে।
রূহানী খাযায়েনের ৫ম খণ্ডে আছে “আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম” বই। সেখানে এই অংশের শিরোনাম: “নওয়াব মুহাম্মদ আলী খানকে লেখা চিঠি”।
চিঠিটি প্রসঙ্গসহ
নওয়াব সাহেবের তৃতীয় প্রশ্নের উত্তরে তিনি লিখেছেন, ইস্তেখারা এমন অবস্থায় করতে হয় যখন মনে ভালোবাসা বা শত্রুতার উত্তেজনা থাকে না। রাগ নিয়ে ঘুমালে শত্রুকে স্বপ্নে হিংস্র প্রাণীর রূপে দেখা যেতে পারে, কিন্তু তা দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া ভুল। তারপর লিখেছেন:
“আমি নিশ্চয়তা দিতে পারি না যে প্রত্যেকেই, ভালো-মন্দ যে অবস্থাতেই থাকুক, অবশ্যই স্বপ্ন দেখবে; কিন্তু আপনার সম্পর্কে বলতে পারি, আপনি যদি ‘নিশানে আসমানী’ পুস্তকে লেখা শর্ত অনুযায়ী আল্লাহর দিকে মন ফিরিয়ে চল্লিশ দিন ইস্তেখারা করেন, আমি আপনার জন্য দোয়া করব। ভালো হয়, এই ইস্তেখারা আমার কাছে থেকে করলে, যেন আমি আপনার প্রতি আরও মনোযোগ দিতে পারি। আপনার জন্য এটা মোটেই কঠিন নয়; মানুষ কখনো কখনো সামান্য কারণেও নফল হজ্জ করতে যায়, কিন্তু এখানে সওয়াব নফল হজ্জের সওয়াবের চেয়ে বেশি, আর গাফেল থাকলে ক্ষতি ও বিপদের আশঙ্কা আছে, কারণ এই সিলসিলা আসমানী আর নির্দেশ আল্লাহর পক্ষ থেকে।” (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, পৃ. ৪১২; রূহানী খাযায়েন ৫ম খণ্ড)
এখন বাক্যটির আসল চেহারা দেখা যাচ্ছে। এটি জনসাধারণের প্রতি কোনো ঘোষণা নয়। একজন মানুষ সত্য জানতে চেয়েছেন; তাঁকে বলা হচ্ছে, সত্য যাচাইয়ের জন্য কাছে এসে চল্লিশ দিন ইস্তেখারা করুন। যে সফর মানুষ শখের নফল হজ্জের জন্য করে, তার চেয়ে এই সফরের পুরস্কার বেশি, কারণ এর বিষয় হলো আল্লাহর প্রেরিত একজনকে চেনা বা না চেনা। ফরয হজ্জের কথা এখানে নেই।
লক্ষ করার বিষয়, চিঠিতে “নফল” শব্দটি স্পষ্ট লেখা। ফরয হজ্জ সম্পর্কে তাঁর নির্দেশ ছিল একেবারে আলাদা: “যার ওপর হজ্জ ফরয হয়েছে এবং কোনো বাধা নেই, সে যেন হজ্জ করে” (কিশতিয়ে নূহ)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“কোনো কাজকে নফল হজ্জের চেয়ে বেশি সওয়াবের বলা কি ইসলামে চলে?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, হজ্জ যত নফলই হোক, তার সঙ্গে কোনো কিছুর তুলনা করা অনুচিত। চলুন দেখি মহানবী (সা.) নিজে কী বলেছেন। একজন আনসারী নারী হজ্জে যেতে পারেননি। মহানবী (সা.) তাঁকে বললেন:
তিনি আরও বলেছেন, যে ব্যক্তি জামাতে ফজরের নামায পড়ে সূর্য ওঠা পর্যন্ত বসে আল্লাহর যিকর করে, তারপর দুই রাকাত নামায পড়ে, সে একটি পূর্ণ হজ্জ ও উমরার সওয়াব পায় (জামে তিরমিযী, হাদীস ৫৮৬)। অর্থাৎ হজ্জের সওয়াবের সঙ্গে অন্য নেক কাজের তুলনা মহানবী (সা.)-এর শিক্ষাতেই আছে। এতে হজ্জের মর্যাদা কমে না, বরং অন্য নেক কাজের গুরুত্ব বোঝানো হয়।
“কাদিয়ানে যাওয়ার মধ্যে এমন কী আছে?”
বিষয়টি কাদিয়ান শহর নয়, বিষয়টি হলো যুগের ইমামকে চেনা। কুরআন বলছে, আল্লাহ রসূল না পাঠিয়ে কোনো জাতিকে শাস্তি দেন না (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:১৬)। অর্থাৎ আল্লাহর প্রেরিত কেউ এলে তাঁকে যাচাই করা মানুষের ওপর বড় দায়িত্ব হয়ে দাঁড়ায়। সুনান ইবনে মাজাহতে (হাদীস ৪০৮৪) প্রতিশ্রুত মাহদী সম্পর্কে একটি বর্ণনা আছে: “যখন তোমরা তাঁকে দেখবে, তাঁর হাতে বয়আত করবে, বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হলেও; কারণ তিনি আল্লাহর খলীফা মাহদী।” মুহাদ্দিসরা এর সনদকে দুর্বল বলেছেন, তবু বর্ণনাটি দেখায় যে মুসলিম ঐতিহ্যে মাহদীকে চেনার জন্য কষ্ট স্বীকারকে কত বড় করে দেখা হয়েছে।
“‘গাফেল থাকলে ক্ষতি’ কথাটি কি ভয় দেখানো নয়?”
প্রত্যেক নবী তাঁর জাতিকে সতর্ক করেছেন, এটাই নবুওয়াতের কাজ। নওয়াব সাহেব নিজেই সত্য জানতে চেয়েছিলেন; উত্তরে তাঁকে বলা হয়েছে, এ বিষয়ে অবহেলা করা ঠিক হবে না। একই চিঠিতে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, তিনি নওয়াব সাহেবের প্রতি সবচেয়ে ভালো অনুভূতি রাখেন এবং আল্লাহর কাছে চান যেন তিনি নষ্ট না হন (আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম, ইংরেজি অনুবাদ The Mirror of the Excellences of Islam, পৃ. ৪১৩)। এটি হুমকি নয়, এক শুভাকাঙ্ক্ষীর আন্তরিক উপদেশ।
সিদ্ধান্ত: বাক্যটি এক সত্যসন্ধানীকে লেখা ব্যক্তিগত চিঠির অংশ, যেখানে নফল হজ্জের সঙ্গে সত্য যাচাইয়ের সফরের তুলনা করা হয়েছে। ফরয হজ্জকে ছোট করার কোনো কথা এতে নেই।
সংক্ষেপে
- উদ্ধৃতিটি “আয়নায়ে কামালাতে ইসলাম”-এ ছাপা নওয়াব মুহাম্মদ আলী খানকে লেখা চিঠির অংশ, যেখানে চল্লিশ দিন ইস্তেখারার কথা বলা হয়েছে।
- তুলনাটি শুধু “নফল” হজ্জের সঙ্গে; ফরয হজ্জ পালনের নির্দেশ তিনি “কিশতিয়ে নূহ”-এ স্পষ্টভাবে দিয়েছেন।
- মহানবী (সা.) নিজেও রমযানের উমরাকে হজ্জের সমান বলেছেন (সহীহ বুখারী ১৭৮২); নেক কাজের এমন তুলনা ইসলামে পরিচিত।
- আল্লাহর প্রেরিত পুরুষকে চেনার চেষ্টা বড় নেকি; তাই আপত্তিটি প্রসঙ্গ বাদ দেওয়ার ফল।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Mirror of the Excellences of Islam (A'ina-e-Kamalat-e-Islam) · alislam.org
- Noah's Ark: Our Teaching · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.