হিজরতের দ্বিতীয় বছর। বদরের প্রান্তর। একদিকে মক্কার সুসজ্জিত বাহিনী, অন্যদিকে মহানবী (সা.)-এর সাথে মাত্র তিনশ তেরোজনের একটি ছোট দল। অস্ত্র কম, বাহন কম, কিন্তু ঈমান অটল। সেদিন আল্লাহ এই ছোট দলটিকে বিজয় দিয়েছিলেন।
মুসলিম ঐতিহ্যে এই সংখ্যাটি তাই একটি প্রতীক হয়ে আছে। আর শেষ যুগের মাহদী সম্পর্কে বর্ণনায়ও এই সংখ্যাটি ফিরে এসেছে।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, হাদীসে আছে, ইমাম মাহদীর কাছে একটি কিতাব থাকবে, যাতে তাঁর ৩১৩ জন সাথীর নাম লেখা থাকবে; আর সেই ভবিষ্যদ্বাণী আজ পূর্ণ হলো (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩২৪)। বিরোধীরা প্রশ্ন তোলেন, এ কথার ভিত্তি কী?
বর্ণনাটির উৎস
শেখ আলী হামযা ইবনে আলী মালিক আত-তূসী (রহ.)-এর জাওয়াহিরুল আসরার গ্রন্থে মাহদী সম্পর্কে একটি বর্ণনা আছে। এর একটি অংশ উদ্ধৃত হয়েছে: “মাহদী এমন একটি গ্রাম থেকে আবির্ভূত হবেন, যার নাম কাদআ।” (জাওয়াহিরুল আসরার, পৃষ্ঠা ৫৫)
আমাদের সূত্র-প্রবন্ধে একই বর্ণনার বাকি অংশও উল্লেখ আছে, যার ভাবার্থ: আল্লাহ সেই মাহদীকে সাহায্য করবেন, দূর-দূরান্ত থেকে তাঁর ভক্তদের একত্র করবেন, যাঁদের সংখ্যা হবে বদরের যোদ্ধাদের সমান, অর্থাৎ তিনশ তেরো; আর তাঁর কাছে একটি ছাপানো বই থাকবে, যাতে তাঁদের নাম, ঠিকানা ও পরিচয় লেখা থাকবে।
একটু থেমে ভাবুন। এই গ্রন্থটি লেখা হয়েছিল হযরত মির্যা সাহেবের জন্মের অনেক আগে, যখন এই অঞ্চলে বই ছাপানো সাধারণ কোনো বিষয় ছিল না। অথচ বর্ণনাটি বলছে, মাহদীর কাছে সাথীদের নামের একটি ছাপানো বই থাকবে। আর গ্রামের নাম “কাদআ”, যা “কাদিয়ান”-এর সাথে বিস্ময়করভাবে মেলে।
কীভাবে পূর্ণ হলো
১৮৯৬ সালে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) আঞ্জামে আথম পুস্তক প্রকাশ করেন। এর পরিশিষ্টে (যমীমা) তিনি তাঁর ৩১৩ জন সাহাবীর নাম, অনেকের ঠিকানা ও পরিচয়সহ, ছাপিয়ে দেন।
এই বইটি মহানবী (সা.)-এর একটি ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার কারণ হয়েছিল: প্রতিশ্রুত মাহদীর কাছে তাঁর ৩১৩ জন সাহাবীর নামসহ একটি বই থাকবে; আর এই বইয়েই তিনি ৩১৩ জন সাহাবীর নাম প্রকাশ করেন।
এই তালিকা কোনো কল্পকাহিনি নয়; এর মানুষগুলো বাস্তব। হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) ২০১৯ সালের ১ ফেব্রুয়ারির জুমুআর খুতবায় একজন প্রয়াত সদস্যের কথা বলতে গিয়ে উল্লেখ করেছেন, তাঁর দাদা হযরত মাহমুদ হাসান খান সাহেব (রা.), পাতিয়ালার একজন শিক্ষক, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ৩১৩ সাহাবীর তালিকায় ৩০১ নম্বরে ছিলেন (যমীমা রিসালা আঞ্জামে আথম, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১১, পৃষ্ঠা ৩২৮)। আজও এই সাহাবীদের বংশধররা পৃথিবীর নানা প্রান্তে আছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“এটি তো সহীহ বুখারী বা মুসলিমের হাদীস নয়”
ঠিক। এখানে কেউ কেউ বলেন, ছয় কিতাবের বাইরের বর্ণনা দিয়ে কিছু প্রমাণ হয় না। কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণীর ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সাক্ষী হলো তার পূর্ণতা। তাঁর জন্মের অনেক আগের একটি বইয়ে লেখা ছিল: গ্রামের নাম কাদআ, ৩১৩ জন সাথী, আর ছাপানো বইয়ে তাঁদের নাম। কোনো মানুষ নিজের ইচ্ছায় আগের যুগের লেখা বদলাতে পারে না। যখন তিনটি চিহ্ন একজন দাবিদারের জীবনে একসাথে মিলে যায়, তখন সেই মিলটাই কথা বলে।
“নিজেই ৩১৩ জনের তালিকা ছাপিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী ‘পূর্ণ’ করা কি সহজ নয়?”
প্রশ্নটি শুনতে যুক্তিসঙ্গত, কিন্তু একটু ভাবলেই এর দুর্বলতা দেখা যায়। ৩১৩ জন নিষ্ঠাবান সাথী জোগাড় করাটাই আসল কাজ। কাদিয়ান তখন যোগাযোগবিহীন একটি অখ্যাত গ্রাম, আর তাঁর বিরুদ্ধে চলছে কুফরের ফতোয়া আর তীব্র বিরোধিতা। এমন অবস্থায় দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ এসে জীবন-সম্পদ দিয়ে তাঁর সাথে যুক্ত হয়েছেন। তালিকা ছাপানো সহজ, কিন্তু তালিকার প্রতিটি নাম একজন বাস্তব মানুষ, যিনি নিজের ইচ্ছায় এসেছেন। সেই মানুষদের হৃদয় আল্লাহ ছাড়া কেউ টেনে আনতে পারে না।
“৩১৩ সংখ্যা কি কেবল কাকতালীয় নয়?”
সংখ্যাটি এককভাবে দেখলে হয়তো তেমন মনে হতে পারে। কিন্তু বর্ণনাটির প্রতিটি অংশ একসাথে মিলিয়ে দেখুন: একটি গ্রাম থেকে আবির্ভাব, যার নাম কাদআ; দূর-দূরান্ত থেকে সাথীদের আগমন; বদরের সংখ্যা; আর ছাপানো বই। একটির পর একটি মিল যখন একজন মানুষের জীবনে জমা হয়, তখন তাকে আর কাকতালীয় বলা কঠিন।
সংক্ষেপে
- জাওয়াহিরুল আসরার গ্রন্থে মাহদীর গ্রামের নাম “কাদআ” বলা হয়েছে; একই বর্ণনায় ৩১৩ সাথী ও ছাপানো বইয়ের কথা আছে।
- ১৮৯৬ সালে আঞ্জামে আথমের পরিশিষ্টে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ৩১৩ জন সাহাবীর নাম ছাপিয়ে দেন।
- এটি মাহদী সম্পর্কিত একটি ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা; তালিকার মানুষেরা ছিলেন বাস্তব, যাঁদের বংশধররা আজও আছেন।
- ভবিষ্যদ্বাণীর সবচেয়ে বড় প্রমাণ তার পূর্ণতা, আর এখানে একাধিক চিহ্ন একসাথে পূর্ণ হয়েছে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Introducing the Books of the Promised Messiah (as) · alislam.org
- Conclusion of the 14th Century and A Moment of Reflection for the Muslims · alislam.org
- Men of Excellence (Friday Sermon, 1 February 2019) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.