বাজারে দুজন মানুষ দাঁড়িয়ে। একজনের হাতে পণ্য, আরেকজনের হাতে মূল্য। হাত মেলালেন, লেনদেন হলো। পণ্য গেল একজনের কাছে, মূল্য গেল আরেকজনের কাছে। আরবী ভাষায় এই লেনদেনের নাম “বাই”, আর একই মূল থেকে এসেছে “বয়আত” শব্দটিও।
এই শব্দের অর্থ না বুঝলে কী ধরনের ভুল বোঝাবুঝি হতে পারে, আজকের আপত্তিটি তার উদাহরণ।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) রূহানী খাযায়েন ১৮ খণ্ডের ২২৭ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “আল্লাহ আমার হাতে বয়আত গ্রহণ করেছেন।” অর্থাৎ যেন তিনি দাবি করেছেন, আল্লাহ তাঁর মুরীদ হয়েছেন, নাউযুবিল্লাহ।
পৃষ্ঠাটিতে আসলে কী আছে
রূহানী খাযায়েন ১৮ খণ্ডের ২২৭ পৃষ্ঠায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁর কয়েকটি আরবী ইলহাম প্রকাশ করেছেন। সেগুলোর একটি বাক্য হলো: ইন্নী বায়া‘তুকা, বায়া‘নী রাব্বী। আর ঠিক সেখান থেকেই তিনি নিজে এই ইলহামগুলোর অনুবাদ দিয়েছেন, যা পরের পৃষ্ঠা, অর্থাৎ ২২৮ পৃষ্ঠায় গিয়ে শেষ হয়েছে।
এই বাক্যের অনুবাদে তিনি লিখেছেন, যার ভাব হলো: “আমি তোমার সঙ্গে একটি লেনদেন করেছি। অর্থাৎ একটি জিনিস আমার ছিল, যার মালিক তোমাকে করা হয়েছে; আর একটি জিনিস তোমার ছিল, যার মালিক আমি হয়েছি। তুমিও এই লেনদেনের স্বীকৃতি দিয়ে বলো, খোদা আমার সঙ্গে একটি লেনদেন করেছেন।”
শুরুর গল্পটি মনে করুন: আরবী “বাই” মানে কেনাবেচা বা লেনদেন। “বয়আত” শব্দটিও এখান থেকেই এসেছে, কারণ বয়আতকারী নিজেকে আল্লাহর পথে সঁপে দেওয়ার অঙ্গীকার করে। ইলহামে এই মূল অর্থটিই ব্যবহৃত হয়েছে।
দেখুন, এখানে “হাতে বয়আত গ্রহণ” বা “মুরীদ হওয়া”র কোনো কথাই নেই। আছে একটি আধ্যাত্মিক লেনদেনের কথা: বান্দা নিজেকে আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়েছে, আর আল্লাহ তাকে নিজের সন্তুষ্টি ও নৈকট্য দান করেছেন। যিনি ইলহাম পেয়েছেন, তিনিই যখন অর্থ বলে দিয়েছেন, তখন সেই অর্থ বাদ দিয়ে নিজের অর্থ চাপানো ন্যায্য নয়।
কুরআনের সেই মহান লেনদেন
এই লেনদেনের ধারণাটি নতুন কিছু নয়। কুরআন নিজেই আল্লাহ আর মুমিনের সম্পর্ককে একটি কেনাবেচা বলেছে:
আয়াতের আরবী শব্দ দুটি লক্ষ করুন: বাই‘ইকুম (তোমাদের লেনদেন) আর বায়া‘তুম (তোমরা যে লেনদেন করেছ)। ইলহামের শব্দও এই একই মূল থেকে। কুরআন বলছে, এই লেনদেনই মহাসাফল্য। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-কে ইলহামে জানানো হয়েছে, তাঁর জীবনে এই মহাসাফল্য পূর্ণ হয়েছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
আল্লাহর সঙ্গে “বয়আত” শব্দ ব্যবহার করা কি বেয়াদবি নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আল্লাহর ক্ষেত্রে এমন শব্দ ব্যবহারই অশোভন। চলুন দেখি, কুরআন নিজে কী বলে:
কুরআন নিজেই বান্দা আর আল্লাহর সম্পর্ক বোঝাতে “বয়আত” শব্দ ব্যবহার করেছে। সুতরাং শব্দটি নিজে অশোভন নয়; প্রশ্ন শুধু অর্থের, আর সেই অর্থ ইলহামপ্রাপ্ত নিজেই বলে দিয়েছেন।
তিনি কি কোথাও দাবি করেছেন যে আল্লাহ তাঁর অনুসারী?
না। এমন দাবি তাঁর কোনো লেখায় নেই। বরং সারা জীবন তিনি নিজেকে আল্লাহর এক নগণ্য বান্দা আর মহানবী (সা.)-এর সেবক বলেছেন। একটি আরবী শব্দের ভুল অনুবাদ করে তাঁর মুখে এমন কথা বসানো, যা তিনি কখনো বলেননি, সেটি উদ্ধৃতি নয়, অপবাদ।
এই লেনদেনে বান্দা আসলে কী দেয়, আর কী পায়?
কুরআন আরেক জায়গায় এই লেনদেনের ছবি আঁকে আরও সহজ ভাষায়:
বান্দা দেয় নিজের সত্তা, নিজের ইচ্ছা, নিজের সময় ও সম্পদ। বিনিময়ে পায় আল্লাহর সন্তুষ্টি। ইলহামের অনুবাদে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ঠিক এ কথাই বলেছেন: একটি জিনিস বান্দার ছিল, যার মালিক আল্লাহ হলেন; আর একটি জিনিস আল্লাহর ছিল, যার মালিক বান্দাকে করা হলো।
এটি কোনো নতুন আকীদা নয়, বরং কুরআনের পুরোনো শিক্ষারই একটি জীবন্ত উদাহরণ। আর মজার ব্যাপার হলো, আহমদীয়া জামাতে প্রবেশের অঙ্গীকারকেও “বয়আত” বলা হয়, যেখানে একজন মানুষ ধর্মকে দুনিয়ার উপর প্রাধান্য দেওয়ার প্রতিজ্ঞা করেন। অর্থাৎ এই ইলহামের শিক্ষা হলো আত্মসমর্পণ, অহংকার নয়।
সব মিলিয়ে বিষয়টি পরিষ্কার। একটি আরবী শব্দের অর্থ বদলে দিয়ে এমন একটি দাবি তাঁর নামে চাপানো হয়েছে, যা তিনি কখনো করেননি। অথচ ইলহামপ্রাপ্ত নিজেই একই জায়গায় অনুবাদ দিয়ে গেছেন। সেই অনুবাদ কুরআনের শিক্ষার সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়: বান্দা নিজেকে আল্লাহর কাছে বিক্রি করে, আর আল্লাহ তাকে নিজের সন্তুষ্টি দান করেন। এটিই মুমিনের মহাসাফল্য। যে ইলহাম বান্দার পূর্ণ আত্মসমর্পণের কথা বলে, তাকে অহংকারের দাবি বানানো শব্দের অর্থ উল্টে দেওয়ার শামিল।
সংক্ষেপে
- রূহানী খাযায়েন ১৮ খণ্ডের ২২৭ পৃষ্ঠায় একটি আরবী ইলহাম আছে, আর তার অনুবাদ সেখান থেকেই ২২৮ পৃষ্ঠা পর্যন্ত দেওয়া।
- তিনি নিজে অর্থ করেছেন: আল্লাহ তাঁর সঙ্গে একটি লেনদেন করেছেন; “আল্লাহ হাতে বয়আত গ্রহণ করেছেন” এমন কথা সেখানে নেই।
- কুরআনেও আল্লাহ মুমিনদের জান-মাল জান্নাতের বিনিময়ে কিনে নেওয়ার কথা বলেছেন, আর একে মহাসাফল্য বলেছেন (৯:১১১)।
- কুরআন নিজেই “বয়আত” শব্দ আল্লাহর সঙ্গে সম্পর্ক বোঝাতে ব্যবহার করেছে (৪৮:১১)।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.