মক্কার তেরো বছর। মহানবী (সা.) আর তাঁর সাহাবীরা মার খাচ্ছেন, গালি শুনছেন, তবু হাত তুলছেন না। ধৈর্য, ক্ষমা আর দোয়া। তারপর মদিনা। আক্রমণ এলে তলোয়ারের জবাব তলোয়ারে, আর মক্কা বিজয়ের দিনে আবার সেই ক্ষমা।
একই মানুষের জীবনে দুটি রং। একটি কোমল সৌন্দর্যের, আরেকটি প্রতাপ আর দৃঢ়তার। এই দুটি রং বুঝলেই আজকের আপত্তির জট খুলে যাবে।
আপত্তিটি কী?
রূহানী খাযায়েন ১৭ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪৫ (তোহফায়ে গোলড়বিয়া) থেকে একটি অনুবাদ এভাবে দেখানো হয়: “এখন মুহাম্মদ (সা.)-এর নামের তেজোদ্দীপ্ত কিরণ প্রকাশের সময় নেই… এখন আর সূর্যের কিরণ সহ্য হচ্ছে না। এখন পূর্ণিমার রাতের শীতল ও কোমল আলোর প্রয়োজন, যা আহমদের রঙে আমার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে।”
এই অনুবাদের মাঝে কয়েকটি বন্ধনী বসানো হয়েছে, যেমন “সূর্যের কিরণ (রাসূল (সা.)-এর দ্বীন)”, “(সূর্য ডুবার পর)”, “আহমদের রং (কাদিয়ানী ধর্মমতের রং)”। ফলে পাঠকের মনে হয়, মহানবী (সা.)-এর দ্বীনের যুগ শেষ, এখন নতুন ধর্মের যুগ।
বন্ধনীগুলো কার?
প্রথমেই একটি সোজা কথা। এই বন্ধনীগুলো হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর লেখায় নেই। এগুলো আপত্তিকারীর নিজের যোগ করা ব্যাখ্যা। মূল লেখায় “রাসূলের দ্বীন”-কে সূর্য বলা হয়নি, “সূর্য ডুবে গেছে” বলা হয়নি, “কাদিয়ানী ধর্মমত” বলেও কিছু নেই।
কারো বাক্যের ভেতরে নিজের শব্দ ঢুকিয়ে তারপর সেই শব্দের জন্য তাঁকে দায়ী করা ন্যায়সঙ্গত নয়।
মূল আলোচনা: মহানবী (সা.)-এর দুই নাম
উৎস প্রবন্ধে পুরো অনুচ্ছেদটির অনুবাদ দেওয়া আছে। সেখানে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) শুরুই করেছেন এভাবে: “তোমরা শুনেছ আমাদের নবী (সা.)-এর দু’টি নাম রয়েছে। একটি হলো মুহাম্মদ (সা.)… দ্বিতীয় নাম আহমদ (সা.)।” প্রথম নামের সাথে তিনি এই আয়াত উল্লেখ করেছেন:
আর দ্বিতীয় নামের সাথে এই আয়াত, যেখানে হযরত ঈসা (আ.) সুসংবাদ দিচ্ছেন:
তাঁর ব্যাখ্যা হলো: “মুহাম্মদ” নামে প্রতাপের (জালাল) প্রকাশ, “আহমদ” নামে সৌন্দর্য আর কোমলতার (জামাল) প্রকাশ। মহানবী (সা.) দুটিরই পূর্ণ সমন্বয়। মক্কার জীবন ছিল জামালের রঙে, মদিনার জীবন জালালের রঙে। পরে সাহাবীরা (রা.) জালালের দৃষ্টান্ত দেখিয়েছেন, কারণ তখন তলোয়ার দিয়ে ঈমানদারদের হত্যা করা হচ্ছিল; আর শেষ যুগে প্রতিশ্রুত মসীহের মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর জামালী রং প্রকাশিত হওয়ার কথা।
তোহফায়ে গোলড়বিয়া থেকে একই ধারণা উদ্ধৃত হয়েছে: মহানবী (সা.)-এর প্রথম আগমন ছিল “মুহাম্মদ” নামের প্রতাপের প্রকাশ, আর সূরা জুমুআর “ওয়া আখারীনা মিনহুম” আয়াতে যে দ্বিতীয় আগমনের ইঙ্গিত, তা তাঁর জামালী নাম “আহমদ”-এর প্রকাশ।
“এখন প্রতাপের যুগ নয়” কথাটির অর্থ
এবার আপত্তির বাক্যটি তার আসল জায়গায় পড়ুন। উৎস প্রবন্ধের অনুবাদে ঠিক তার আগে তিনি দুঃখ করে লিখেছেন, সীমান্ত এলাকার কিছু অজ্ঞ মানুষ কিছু মৌলভীর ভুল শিক্ষায় প্রতারিত হয়ে “মুহাম্মদী প্রতাপ”-এর নামে লুটপাট আর অন্যায় রক্তপাত করছে। তারপর বলেছেন: “কিন্তু তোমরা খুব মনোযোগ দিয়ে শোন! এখন মুহাম্মদ নামের প্রতাপ প্রকাশের যুগ নয়… কেননা সেই প্রতাপ যথোপযুক্তভাবে প্রকাশিত ও বিকশিত হয়ে গেছে… এখন প্রয়োজন চাঁদের স্নিগ্ধ জ্যোতির। আর আহমদ (সা.)-এর রঙে রঙিন হয়ে আমি সেই জ্যোতি… অর্থাৎ স্নিগ্ধতা বিকাশী ধর্মীয় সেবা প্রদানের সময়।”
অর্থাৎ কথাটি ধর্মের নামে তলোয়ার চালানোর বিরুদ্ধে। ইসলামের নামে আজ নিরীহ মানুষের রক্ত ঝরানো যাবে না; এখন সময় যুক্তি, চরিত্র আর ভালোবাসা দিয়ে ইসলামের সৌন্দর্য দেখানোর। আর সেই সৌন্দর্যও “আহমদ (সা.)-এর রং”, অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এরই নামের রং।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“মুহাম্মদ নামের প্রতাপের সময় নেই” বলা কি মহানবী (সা.)-কে ছোট করা নয়?
কেউ কেউ এভাবেই দেখেন। কিন্তু ভেবে দেখুন: মুহাম্মদ আর আহমদ দুটিই একই নবীর নাম। একটি নামের এক রঙের পরে অন্য নামের অন্য রঙের যুগ আসা মানে নবী বদলে যাওয়া নয়। সকালে সূর্যের আলো, রাতে চাঁদের আলো। চাঁদের আলোও আসলে সূর্যেরই আলো, শুধু কোমল হয়ে আসে। এই অনুচ্ছেদেই হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেকে চাঁদের স্নিগ্ধ আলোর সাথে তুলনা করেছেন; আর চাঁদ আলো পায় সূর্য থেকে।
তাহলে কি জিহাদ চিরতরে বাতিল?
না। কুরআনের হুকুম বাতিল হয় না। তবে কুরআন যুদ্ধের একটি সীমাও বলেছে: “যতক্ষণ পর্যন্ত না যুদ্ধ উহার অস্ত্র রাখিয়া দেয়” (সূরা মুহাম্মদ ৪৭:৫)। উদ্ধৃত অনুচ্ছেদেই হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, সাহাবীরা তলোয়ার ধরেছিলেন তাদের বিরুদ্ধে, যারা ধর্মের কারণে তলোয়ার দিয়ে মু’মিনদের হত্যা করছিল। যখন ধর্মের জন্য কেউ তলোয়ার তুলছে না, তখন ইসলামের নামে তলোয়ার তোলা ইসলামের শিক্ষা নয়। তখন জিহাদ হলো কলম, যুক্তি আর চরিত্রের জিহাদ।
“আমার মাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে” বলা কি অহংকার নয়?
একই বাক্যে তিনি বলছেন, “আহমদ (সা.)-এর রঙে রঙিন হয়ে” তিনি সেই আলো। রং যাঁর, গৌরবও তাঁর। এক গলতী কা ইযালাতে তিনি এ কথাই বলেছেন যে তিনি মহানবী (সা.)-এর নাম পেয়েছেন প্রতিচ্ছবি হিসেবে, “ভালোবাসার আয়নার মাধ্যমে”। আয়নায় যে আলো দেখা যায়, তা আয়নার নিজের নয়।
সব মিলিয়ে: বন্ধনীগুলো সরিয়ে পুরো অনুচ্ছেদ পড়লে ছবিটি সম্পূর্ণ বদলে যায়। এখানে মহানবী (সা.)-এর দ্বীন শেষ হওয়ার কথা নেই; আছে তাঁরই দুই নামের দুই রঙের কথা, আর এ যুগে ধর্মের নামে রক্তপাত বন্ধ করে তাঁর কোমল সৌন্দর্য দেখানোর আহ্বান।
সংক্ষেপে
- আপত্তির অনুবাদে যে বন্ধনীগুলো আছে, সেগুলো মূল লেখার অংশ নয়।
- মূল আলোচনা মহানবী (সা.)-এর দুই নাম নিয়ে: মুহাম্মদ (প্রতাপ, ৪৮:৩০) আর আহমদ (সৌন্দর্য, ৬১:৭)।
- “প্রতাপের যুগ নয়” কথাটি ইসলামের নামে লুটপাট ও রক্তপাতের বিরুদ্ধে বলা।
- যে কোমল আলোর কথা বলা হয়েছে, তা “আহমদ (সা.)-এর রং”, অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এরই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Truth Prevails, Chapter IV · alislam.org
- A Misconception Removed (Eik Ghalati Ka Izala), PDF · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.