মক্কার এক ঘরে একের পর এক শিশুর জন্ম হচ্ছে। খুশির খবর আসে, আবার কিছুদিন পর আসে শোকের খবর। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পুত্রসন্তানরা কেউই শৈশব পার হয়ে বড় হননি। এই বেদনার কথা মুসলমানরা চৌদ্দশো বছর ধরে জানেন।
কিন্তু তাঁর পুত্রসন্তান মোট কতজন ছিলেন? এই প্রশ্নের উত্তর সব ইতিহাসগ্রন্থে এক রকম নয়। আজকের আপত্তিটি এখান থেকেই শুরু।
আপত্তিটি কী
রূহানী খাযায়েন ২৩ খণ্ডের ২৯৯ পৃষ্ঠায় হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, ঐতিহাসিকরা জানেন যে মহানবী (সা.)-এর ঘরে এগারোজন পুত্র জন্মেছিলেন এবং তাঁরা সকলেই মারা গিয়েছিলেন।
বিরোধীদের আপত্তি হলো, প্রসিদ্ধ মতে মহানবী (সা.)-এর পুত্র তিনজন: হযরত কাসেম, হযরত আব্দুল্লাহ (যাঁকে তাইয়্যেব ও তাহেরও বলা হয়) এবং হযরত ইবরাহীম। তাহলে এগারো জনের কথা তিনি কোথায় পেলেন?
বাক্যটি আরেকবার পড়ুন
প্রথমেই লক্ষ করার বিষয়, তিনি কথাটি নিজের গবেষণা বা ইলহাম হিসেবে বলেননি। বলেছেন, “ঐতিহাসিকরা জানেন।” অর্থাৎ তিনি ইতিহাসের বইয়ে যা লেখা আছে, সেদিকে ইঙ্গিত করেছেন। তাই প্রশ্নটি দাঁড়ায় এমন: কোনো সীরাতগ্রন্থে কি এগারো পুত্রের নাম আছে?
উত্তর হলো, হ্যাঁ। প্রসিদ্ধ সীরাতগ্রন্থ সীরাতে হালাবিয়্যাহ-তে মহানবী (সা.)-এর সন্তানদের নিয়ে আলাদা একটি পরিচ্ছেদ আছে। সেখানে বিভিন্ন বর্ণনা একত্র করে পুত্রসন্তান হিসেবে এগারোটি নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আহমদীয়া বাংলা ওয়েবসাইটে সেই গ্রন্থের উর্দু অনুবাদের সংশ্লিষ্ট পৃষ্ঠার ছবিও দেওয়া আছে, যেখানে নামগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংখ্যা নিয়ে এই ভিন্নতা নতুন কিছু নয়। যেমন “তাইয়্যেব” ও “তাহের” নাম দুটি কারও মতে হযরত আব্দুল্লাহরই উপাধি, আবার কেউ এগুলোকে আলাদা সন্তানের নাম মনে করেছেন। এভাবেই সন্তানের সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় মতভেদ রয়ে গেছে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই ঐতিহাসিক বর্ণনার কথাই বলেছেন।
ইতিহাস আর কুরআনের পার্থক্য
এখানে একটি মূলনীতি মনে রাখা দরকার। কুরআনের প্রতিটি শব্দ নির্ভুল, কিন্তু ইতিহাসের বইয়ে নানা বর্ণনা থাকে, যার কিছু দুর্বল, কিছু শক্তিশালী। যেমন আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া-তে মহানবী (সা.)-এর জন্মের আলোচনায় একটি বর্ণনা উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, তাঁর পিতার ইন্তেকালের সময় তাঁর বয়স ছিল দুই বছর, অথচ প্রসিদ্ধ মত হলো পিতা তাঁর জন্মের আগেই ইন্তেকাল করেছিলেন।
কোনো লেখক যখন বলেন, “ঐতিহাসিকরা লিখেছেন”, তখন তিনি সেই বর্ণনার উদ্ধৃতি দিচ্ছেন। ইতিহাসের বইয়ে যা আছে, তা বলার জন্য উদ্ধৃতিদাতাকে দোষ দেওয়া যায় না।
আর মূল যে কথাটি তিনি বোঝাতে চেয়েছেন, সেটি নিয়ে কোনো মুসলমানের দ্বিমত নেই: মহানবী (সা.)-এর কোনো পুত্র বেঁচে থেকে বড় হননি। কুরআন নিজেই বলেছে:
অর্থাৎ পুত্রসন্তান যতজনই জন্মে থাকুন, কেউই প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ হয়ে বেঁচে থাকেননি। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর বাক্যের মূল বক্তব্য ঠিক এটাই।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
প্রসিদ্ধ মত তিন পুত্র হলে, অন্য মত উল্লেখ করাই কি ভুল নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, যেহেতু অধিকাংশ আলেম তিন পুত্রের কথা বলেন, তাই অন্য সংখ্যা বলা মানে ভুল তথ্য দেওয়া। চলুন দেখি। সীরাতের আলেমরা নিজেরাই তাঁদের বইয়ে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণনা উল্লেখ করেছেন। সীরাতে হালাবিয়্যাহর মতো বইয়ে এগারো নামের তালিকা থাকাই প্রমাণ করে যে, এই বর্ণনা মুসলিম ইতিহাসের ভেতরেই আছে। কোনো একটি বর্ণনার উল্লেখ করলে সেটিকে মিথ্যা বলা যায় না; বড়জোর বলা যায়, এটি অন্য মতের চেয়ে কম প্রসিদ্ধ।
এমন বিষয় নিয়ে আপত্তির প্রয়োজন কী?
সত্যি বলতে, মহানবী (সা.)-এর পুত্রসংখ্যা ঈমানের কোনো মৌলিক বিষয় নয়। এই সংখ্যার উপর কারও দাবির সত্য-মিথ্যা নির্ভর করে না। কুরআন আমাদের শিখিয়েছে, কোনো খবর এলে আগে যাচাই করো (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৭)। যাচাই করলে দেখা যায়, যে কথা ইতিহাসের বইয়েই আছে, সেটিকে কারও “অজ্ঞতা” বলার সুযোগ নেই।
এই আলোচনার মানবিক দিকটি কী?
সংখ্যার তর্কে আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, প্রতিটি নাম ছিল একটি ছোট্ট প্রাণ, আর প্রতিটি মৃত্যু ছিল মহানবী (সা.)-এর হৃদয়ের একটি ক্ষত। তাঁর শেষ পুত্র হযরত ইবরাহীম যখন শৈশবে মৃত্যুশয্যায়, তখনকার দৃশ্য হযরত আনাস ইবনে মালিক (রা.) বর্ণনা করেছেন। মহানবী (সা.)-এর দুচোখ বেয়ে অশ্রু ঝরছিল। হযরত আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রা.) অবাক হয়ে বললেন, “হে আল্লাহর রসূল, আপনিও?” তিনি বললেন, “এ তো রহমত।” তারপর বললেন:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) যখন লিখেছেন যে মহানবী (সা.)-এর পুত্ররা সবাই মারা গিয়েছিলেন, তখন তিনি এই বেদনা আর ধৈর্যের দিকেই দৃষ্টি দিয়েছেন। পুত্রসংখ্যা তিন হোক বা এগারো, মূল সত্য একই: আল্লাহর ইচ্ছায় মহানবী (সা.)-এর কোনো পুত্র বড় হয়ে ওঠেননি, আর তিনি প্রতিটি শোক ধৈর্য ও আল্লাহর সন্তুষ্টির কথা বলে বহন করেছেন। এই আলোচনায় তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা আর ভালোবাসাই প্রকাশ পায়, অবমাননা নয়।
শেষ কথা হলো, একজন লেখক যখন স্পষ্ট করে বলেন “ঐতিহাসিকরা জানেন”, তখন তাঁর বাক্যের সত্যতা যাচাইয়ের সঠিক পথ হলো ইতিহাসের বই খুলে দেখা। এখানে সেই পথে হাঁটলে দেখা যায়, সীরাতগ্রন্থেই এগারোটি নামের তালিকা আছে। কাজেই যে কথা মুসলিম ঐতিহাসিকদের বইয়ে আছে, তা উদ্ধৃত করার জন্য হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-কে দোষী করা যায় না। আর আমাদের সবার জন্য শিক্ষা হলো, কারও বিরুদ্ধে রায় দেওয়ার আগে তিনি কী বলেছেন আর কার বরাতে বলেছেন, দুটোই মন দিয়ে দেখা।
সংক্ষেপে
- হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কথাটি “ঐতিহাসিকরা জানেন” বলে উদ্ধৃত করেছেন, নিজের দাবি হিসেবে নয়।
- সীরাতে হালাবিয়্যাহতে মহানবী (সা.)-এর পুত্রসন্তান হিসেবে এগারোটি নাম পাওয়া যায়।
- সন্তানের সংখ্যা নিয়ে ঐতিহাসিক বর্ণনায় মতভেদ আছে; ইতিহাসের বই কুরআনের মতো নির্ভুল নয়।
- মূল কথা, কোনো পুত্র বেঁচে থেকে বড় হননি, কুরআন নিজেই তা নিশ্চিত করে (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১)।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- আপত্তি: মির্যা সাহেব উল্লেখ্য করেছেন যে, মুহাম্মদ (সা.)-এর ১১ পুত্র সন্তান ছিল · ahmadiyyabangla.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.