দ্বীন পূর্ণ হয়েছে, তবে সারা পৃথিবীতে পৌঁছানোর কাজ কার?

অভিযোগ: হযরত মির্যা সাহেব নাকি বলেছেন মহানবী (সা.) প্রচার পূর্ণ করেননি, তিনি করেছেন। আসল লেখায় আছে দুটি আলাদা কাজের কথা, আর দুটিরই কৃতিত্ব মহানবী (সা.)-এর।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

একজন বাবুর্চি একটি অসাধারণ খাবার রান্না করলেন। স্বাদে, গন্ধে, পুষ্টিতে কোনো খুঁত নেই। খাবারটি পূর্ণ। কিন্তু গ্রামের দূরের ঘরগুলোতে সেই খাবার পৌঁছাতে হলে পথ লাগে, বাহন লাগে, সময় লাগে।

রান্না পূর্ণ হওয়া এক কথা। সবার ঘরে পৌঁছে দেওয়া আরেক কথা। এই সহজ পার্থক্যটি মনে রাখলে আজকের আপত্তিটি নিজেই খুলে যায়।

আপত্তিটি কী?

আপত্তিতে বলা হয়, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন: রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দ্বারা দ্বীন প্রচারের কাজ পূর্ণভাবে হয়নি, তিনি পূর্ণ প্রচার করেননি, “আমি পূর্ণ করেছি।” সূত্র: রূহানী খাযায়েন ১৭ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৩, পাদটীকা (তোহফায়ে গোলড়বিয়া)।

এভাবে উপস্থাপন করলে মনে হয়, তিনি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বড় কাজের দাবিদার বানিয়েছেন। কিন্তু মূল লেখাটি এমন নয়।

মূল লেখাটি কী বলে?

উৎস প্রবন্ধে উদ্ধৃত সেই পাদটীকার মূল কথা এরকম: মহানবী (সা.)-এর ওপর অর্পিত দ্বিতীয় দায়িত্ব ছিল হেদায়াতের প্রচার ও প্রসারকে পূর্ণতা দেওয়া। কিন্তু তাঁর যুগে প্রচারের মাধ্যম আর উপকরণ ছিল না বলে তখন সারা বিশ্বে তা পৌঁছানো সম্ভব ছিল না। তাই সূরা জুমুআর আয়াত “ওয়া আখারীনা মিনহুম”-এ মহানবী (সা.)-এর আরেকটি আগমনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। সেই কাজ মহানবী (সা.) তাঁর বুরুযী (প্রতিচ্ছবিরূপ) আগমনের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছেন, এমন যুগে যখন সব জাতির কাছে ইসলামের বাণী পৌঁছানোর উপায় তৈরি হয়ে গেছে।

বাক্যটি আবার পড়ুন। কাজটি কে সম্পন্ন করছেন? মহানবী (সা.) নিজেই, তাঁর দ্বিতীয় আধ্যাত্মিক আগমনের মাধ্যমে। এখানে মহানবী (সা.)-এর পাশে আলাদা কোনো ব্যক্তিকে দাঁড় করানো হয়নি।

একই কথা হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাঁর এক বক্তৃতায় আরও খুলে বলেছেন। alislam.org-এ প্রকাশিত এক জুমুআর খুতবায় তা উদ্ধৃত হয়েছে: মহানবী (সা.)-কে যে ইতমামে নেয়ামত আর ইকমালে দ্বীন দেওয়া হয়েছিল, তার দুটি দিক আছে। প্রথমটি হেদায়াতের পূর্ণতা, দ্বিতীয়টি এই হেদায়াতের পূর্ণ প্রচার। প্রথমটি হয়েছে মহানবী (সা.)-এর প্রথম আগমনে; আর দ্বিতীয়টির জন্য রয়েছে তাঁর বুরুযী আগমন, যা এই যুগে ঘটছে। (মলফুযাত, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৯-১০)

কুরআন কোন পূর্ণতার কথা বলেছে?

বিদায় হজের সময় অবতীর্ণ আয়াতটি সবারই জানা:

اَلۡیَوۡمَ اَکۡمَلۡتُ لَکُمۡ دِیۡنَکُمۡ وَاَتۡمَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ نِعۡمَتِیۡ وَرَضِیۡتُ لَکُمُ الۡاِسۡلَامَ دِیۡنًا
“…আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দীনকে পরিপুর্ন করিলাম এবং তোমাদের উপর আমার নেয়ামতকে (অনুগ্রহকে) সম্পূর্ণ করিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দীন রূপে মনোনীত করিলাম।…”
সূরা আল-মায়েদা ৫:৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৫:৩।

এটি শিক্ষার পূর্ণতা। শরীয়তে আর কিছু যোগ হবে না। হযরত মির্যা সাহেবও এটাই বিশ্বাস করতেন। কিন্তু একই কুরআন বলে, মহানবী (সা.) এসেছেন সমগ্র মানবজাতির জন্য:

وَمَاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ اِلَّا کَآفَّۃً لِّلنَّاسِ بَشِیۡرًا وَّنَذِیۡرًا
“এবং আমরা তোমাকে বিনাব্যতিক্রমে সমগ্র মানব জাতির জন্য সুসংবাদদাতা ও সতর্ককারীরূপে প্রেরণ করিয়াছি…”
সূরা সাবা ৩৪:২৯

মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া কিংবা দূরপ্রাচ্যের মানুষ ইসলামের নামও শোনেনি। এটা তাঁর কোনো ত্রুটি নয়; সে যুগে জাহাজ, ছাপাখানা, ডাক, টেলিগ্রাফ কিছুই ছিল না। শিক্ষা পূর্ণ ছিল, কিন্তু পৃথিবীজুড়ে তা পৌঁছানোর কাজ সময়ের অপেক্ষায় ছিল।

সূরা জুমুআর প্রতিশ্রুতি

এই সময়ের কথাই আল্লাহ সূরা জুমুআয় বলে দিয়েছেন:

وَّاٰخَرِیۡنَ مِنۡہُمۡ لَمَّا یَلۡحَقُوۡا بِہِمۡ ؕ وَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ
“এবং (তিনি তাহাকে আবির্ভূত করিবেন) তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও যাহারা এখন পর্যন্ত তাহাদের সঙ্গে মিলিত হয় নাই। এবং তিনি মহাপ্ররাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।”
সূরা আল-জুমুআ ৬২:৪

এই আয়াত নাজিল হলে সাহাবীরা জিজ্ঞেস করেছিলেন, এরা কারা? মহানবী (সা.)-এর উত্তর সহীহ বুখারীতে আছে:

وَضَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدَهُ عَلَى سَلْمَانَ ثُمَّ قَالَ لَوْ كَانَ الإِيمَانُ عِنْدَ الثُّرَيَّا لَنَالَهُ رِجَالٌ ـ أَوْ رَجُلٌ ـ مِنْ هَؤُلاَءِ
রাসূলুল্লাহ (সা.) হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর ওপর হাত রাখলেন, তারপর বললেন: “ঈমান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রের কাছেও চলে যায়, তবু এদের মধ্য থেকে কিছু লোক, অথবা একজন লোক, তা ফিরিয়ে আনবে।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, সূরা আল-জুমুআ, হাদীস ৪৮৯৭

অর্থাৎ শেষ যুগে পারস্য বংশের এক ব্যক্তির মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এরই শিক্ষা আবার জীবন্ত হবে। তাঁর মাধ্যমে যা হবে, তা মহানবী (সা.)-এরই কাজ, যেমন একজন শিষ্যের সাফল্য তাঁর শিক্ষকের গৌরব।

✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

দ্বীন যেহেতু পূর্ণ, তাহলে আর কারো আসার কী প্রয়োজন?

কেউ কেউ এ প্রশ্ন করেন। উত্তর আয়াতের ভেতরেই আছে। দ্বীন পূর্ণ হয়েছে, তাই নতুন শরীয়ত আসবে না। কিন্তু পূর্ণ দ্বীন প্রচারের কাজ তো খলীফা, সাহাবী, তাবেয়ী, মুজাদ্দিদরা যুগে যুগে করে গেছেন। তাঁরা কেউ দ্বীনে কিছু যোগ করেননি, শুধু পৌঁছে দিয়েছেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর দাবিও এটুকুই: নতুন কিছু নয়, মহানবী (সা.)-এর আনা দ্বীনকে সারা পৃথিবীতে পৌঁছানো।

তাহলে কি মহানবী (সা.)-এর মিশন অসম্পূর্ণ ছিল?

না। আল্লাহ বলেছেন, তিনি নিজ রসূলকে হেদায়াত ও সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছেন “যেন তিনি সকল ধর্মের উপর ইহাকে জয়যুক্ত করেন” (সূরা আত-তাওবা ৯:৩৩)। এই প্রতিশ্রুতি মহানবী (সা.)-এর মিশনের অংশ, আর তা পূর্ণ হচ্ছে তাঁর অনুসারীদের হাতে, যুগের পর যুগ ধরে। মালিকের মাল কাঁধে করে গন্তব্যে নিয়ে যাওয়া শ্রমিক কখনো মালিক হয়ে যায় না। মাল মালিকেরই থাকে।

“মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমন” কি পুনর্জন্মের কথা?

একেবারেই নয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এক গলতী কা ইযালা পুস্তিকায় স্পষ্ট লিখেছেন, ছায়া কখনো মূল থেকে স্বাধীন হয় না; মহানবী (সা.)-এর নবুওয়ত মহানবী (সা.)-এর কাছেই থাকে। “বুরুয” মানে আধ্যাত্মিক প্রতিচ্ছবি: একজন অনুসারী এমনভাবে নিজেকে বিলীন করেন যে তাঁর মধ্যে নেতার রং ফুটে ওঠে। কোনো আত্মা কোনো দেহে ঢোকে না।

সব মিলিয়ে: আপত্তিতে “আমি পূর্ণ করেছি” বাক্যটি আলাদা করে দেখানো হয়েছে। কিন্তু মূল লেখায় কাজটি করছেন মহানবী (সা.) নিজে, তাঁর প্রতিশ্রুত বুরুযী আগমনের মাধ্যমে। এতে তাঁর মর্যাদা কমে না, বরং প্রমাণ হয় যে কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর কল্যাণধারা বন্ধ হবে না।

সংক্ষেপে

  1. দুটি কাজ আলাদা: দ্বীনের পূর্ণতা (৫:৪) আর সেই দ্বীন সারা বিশ্বে পৌঁছানো।
  2. প্রথমটি মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশায় সম্পূর্ণ; দ্বিতীয়টির জন্য সূরা জুমুআ (৬২:৪) পরবর্তী যুগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
  3. হযরত মির্যা সাহেব লিখেছেন, এই কাজ মহানবী (সা.)-ই তাঁর বুরুযী আগমনের মাধ্যমে সম্পন্ন করেছেন।
  4. বুখারী (৪৮৯৭)-এর হাদীসে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় পারস্য বংশের এক ব্যক্তির কথা আছে।
  5. তাই এখানে মহানবী (সা.)-কে ছোট করা হয়নি; তাঁর কল্যাণের চিরস্থায়িত্ব প্রমাণ করা হয়েছে।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.