কেউ যদি সাহসী ছেলেকে বলে “বাঘের বাচ্চা”, ছেলেটি খুশি হয়। কেউ তো ভাবে না যে, তাকে হিংস্র পশু বলা হলো। আমরা সবাই বুঝি, উপমায় একটি নির্দিষ্ট গুণকেই ধরা হয়, বাকিটা নয়।
এই সহজ ভাষাজ্ঞান হারিয়ে গেলে কী হয়, তার একটি উদাহরণ আজকের আপত্তি।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা রূহানী খাযায়েন ২০ খণ্ডের ৩৯৬ পৃষ্ঠার উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন যে, আল্লাহ বলেছেন, “আমি চোরের মতো গোপনে আসব।” তাঁদের প্রশ্ন: মহান আল্লাহকে চোরের সঙ্গে তুলনা করা কি আল্লাহর অবমাননা নয়? গোপনে আসা বোঝাতে কি অন্য উপমা ছিল না?
প্রথম কথা: এটি কার বাক্য
প্রথমেই মনে রাখতে হবে, এটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নিজের রচনা নয়, বরং একটি ইলহাম, যা তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রাপ্ত বলে প্রকাশ করেছেন। কেউ যদি একে সত্য ইলহাম না-ও মানেন, তবু একজন মুসলমান হিসেবে তাঁকে কুরআনের এই মানদণ্ড মানতে হবে:
মহানবী (সা.) নবুওয়তের দাবির পর প্রায় তেইশ বছর জীবিত ছিলেন। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) বারাহীনে আহমদীয়া-তে নিজের ইলহাম প্রকাশ করার পর ১৯০৮ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ এর চেয়েও বেশি সময় জীবিত ছিলেন, আর আল্লাহ তাঁকে ও তাঁর জামাতকে ক্রমাগত সাহায্য করেছেন। কেউ যদি আল্লাহর নামে আল্লাহর জন্য অপমানজনক কথা বানাত, কুরআনের এই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আল্লাহ নিজেই তাকে ধরতেন।
উপমার ভাষা: কুরআন ও হাদীস থেকে
এবার উপমাটির কথা। কুরআনে আল্লাহ বলেছেন:
আল্লাহ কি অভাবী যে ঋণ চাইবেন? অবশ্যই না। এখানে ঋণের একটি গুণই উদ্দেশ্য: ঋণ যেমন ফেরত আসে, আল্লাহর পথে খরচও তেমনি বহুগুণে ফেরত আসবে।
সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে কুদসীতে আছে, কিয়ামতের দিন আল্লাহ বলবেন: হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ ছিলাম, তুমি আমাকে দেখতে আসোনি; আমি তোমার কাছে খাবার চেয়েছিলাম, তুমি দাওনি। মানুষ বলবে, হে প্রভু, তুমি তো জগতসমূহের প্রতিপালক, তোমাকে কীভাবে দেখতে যাব? তখন আল্লাহ বলবেন, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ ছিল, তুমি তাকে দেখতে গেলে আমাকে তার কাছে পেতে (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল বির্রি ওয়াস সিলাহ)।
আল্লাহ অসুখ আর ক্ষুধা থেকে পবিত্র। তবু উপমাটি ব্যবহার করা হয়েছে একটি গভীর সত্য বোঝাতে। কেউ এই হাদীস পড়ে আল্লাহর অবমাননার অভিযোগ তোলেন না।
চোরের কোন গুণটি ধরা হয়েছে
চোর আসে নিঃশব্দে, কাউকে না জানিয়ে, হঠাৎ। কেউ টের পায় না কখন সে এল। “চোরের মতো আসা” মানে ঠিক এটুকুই: হঠাৎ, অলক্ষ্যে, কোনো পূর্বঘোষণা ছাড়া আসা। ইলহামে বোঝানো হয়েছে, আল্লাহর নিদর্শন হঠাৎ, অপ্রত্যাশিতভাবে প্রকাশিত হবে। চুরির অন্যায় বা অসততার দিকটি এখানে আদৌ বিবেচ্য নয়, ঠিক যেমন “বাঘের বাচ্চা” বললে হিংস্রতা বিবেচ্য নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এমন উপমা কি আগের কোনো আসমানী কিতাবে আছে?
হ্যাঁ। বাইবেলের নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, “প্রভুর দিন রাত্রিকালে চোরের মতো আসবে” (১ থিষলনীকীয় ৫:২)। প্রকাশিত বাক্যে আছে, “দেখ, আমি চোরের মতো আসছি” (প্রকাশিত বাক্য ১৬:১৫)। অর্থাৎ ঐশী আগমনের আকস্মিকতা বোঝাতে এই উপমা আগের ধর্মগ্রন্থের পাঠকদের কাছেও পরিচিত ছিল। খ্রিস্টানদের মাঝে মসীহের আগমনের প্রতীক্ষার প্রসঙ্গে এই ভাষা বিশেষ অর্থবহ।
অন্য শব্দ ব্যবহার করলেই কি ভালো হতো না?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আল্লাহর জন্য আরও সম্মানজনক শব্দ বেছে নেওয়া যেত। চলুন দেখি। আল্লাহ নিজের বাণীতে কোন উপমা ব্যবহার করবেন, সেটি তাঁরই সিদ্ধান্ত। কুরআনে তিনি নিজের নূরের উপমা দিয়েছেন একটি তাকের মধ্যে রাখা প্রদীপের সঙ্গে, আর সেখানেই বলেছেন, “আল্লাহ্ মানব-মণ্ডলীর জন্য উপমাসমূহ বর্ণনা করেন” (সূরা আন-নূর ২৪:৩৬); নিজের জন্য ঋণের উপমা দিয়েছেন, হাদীসে অসুস্থতার উপমা দিয়েছেন। মানুষের কাজ হলো উপমার উদ্দেশ্য বোঝা, আল্লাহকে শব্দ বেছে দেওয়া নয়।
মিথ্যা দাবিদারও তো দীর্ঘ জীবন পেতে পারে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, অনেক ভণ্ডও তো বহু বছর বেঁচে থাকে। চলুন দেখি, কুরআনের মানদণ্ডটি ঠিক কী বলছে। সূরা আল-হাক্কার আয়াতগুলো সাধারণ কোনো ভণ্ডের কথা বলছে না; বলছে এমন ব্যক্তির কথা, যে আল্লাহর নামে কথা বানিয়ে বলে, “এটি আমার উপর আল্লাহর বাণী।” এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর সত্যতার প্রমাণ হিসেবেই নাযিল হয়েছিল, আর মুসলমান আলেমরা যুগ যুগ ধরে একে সেভাবেই উপস্থাপন করেছেন।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) শুধু দীর্ঘ জীবনই পাননি। তাঁর জীবদ্দশাতেই বহু মানুষ তাঁকে গ্রহণ করেছিল, আর তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামাত পরে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। যদি “চোরের মতো আসা”র মতো কথা সত্যিই আল্লাহর জন্য অপমানজনক মিথ্যা হতো, তাহলে প্রশ্ন জাগে: আল্লাহ তাঁকে এভাবে সাহায্য করে গেলেন কেন? কুরআনের মানদণ্ড এখানে নিজেই উত্তর দিয়ে দেয়।
সংক্ষেপে
- বাক্যটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর নিজের রচনা নয়, একটি ইলহাম; আর আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনাকারীকে আল্লাহ ছাড় দেন না (৬৯:৪৫-৪৮)।
- কুরআনে আল্লাহ ঋণ চাওয়ার উপমা দিয়েছেন (২:২৪৬), হাদীসে নিজেকে অসুস্থ ও ক্ষুধার্ত বলার উপমা দিয়েছেন; এগুলো অবমাননা নয়।
- “চোরের মতো আসা” মানে হঠাৎ ও অলক্ষ্যে আসা; উপমায় শুধু এই গুণটিই উদ্দেশ্য।
- বাইবেলেও ঐশী আগমনের আকস্মিকতা বোঝাতে একই উপমা আছে।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.