দাজ্জাল আসলে কে? চারটি ‘উত্তর’ কি পরস্পরবিরোধী?

পাদ্রী, পশ্চিমা জাতি, ইবনে সাইয়াদ: সবাইকে কি দাজ্জাল বলা হয়েছে? শব্দটির অর্থ বুঝলেই দেখা যায়, এখানে বিরোধ নয়, একটি সুসংগত চিত্র আছে।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

ছোটবেলায় আমরা অনেকেই দাজ্জালের গল্প শুনেছি। এক চোখ কানা এক দৈত্য, যার কপালে লেখা “কাফের”, যে গাধায় চড়ে পৃথিবী ঘুরবে। গল্পটি শুনে ভয় লাগত।

কিন্তু হাদীসগুলো মন দিয়ে পড়লে দেখা যায়, “দাজ্জাল” শব্দটি একজন মানুষের নাম নয়। এটি একটি গুণবাচক শব্দ। আর এই বিষয়টি না বুঝলেই একটি আপত্তি জন্ম নেয়।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) দাজ্জাল সম্পর্কে চার রকম কথা বলেছেন: তাঁর বিরোধী আলেমরা দাজ্জাল; উন্নত পশ্চিমা জাতিগুলো দাজ্জাল, আর রেলগাড়ি তাদের গাধা (ইযালায়ে আওহাম, পৃষ্ঠা ১৩৪); পাদ্রীরা দাজ্জাল (ইযালায়ে আওহাম, পৃষ্ঠা ১৫৯); আর ইবনে সাইয়াদ দাজ্জাল। তাঁদের মতে, চারটি কথা একটি আরেকটির বিরোধী।

প্রথম দাবিটি সম্পর্কে জামাতের আলেমরা বলেন, ফতেহ ইসলাম গ্রন্থে তিনি বিরোধী আলেমদের দাজ্জাল বলেননি। বাকি তিনটি দেখতে হলে আগে শব্দটির অর্থ বুঝতে হবে।

“দাজ্জাল” শব্দের অর্থ

আরবি “দাজ্জাল” শব্দের মূল অর্থ ঢেকে দেওয়া। যে মিথ্যা দিয়ে সত্যকে ঢেকে দেয়, সে দাজ্জাল: বড় প্রতারক, বিভ্রান্তকারী। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন:

“দাজ্জাল কোনো একজন মানুষের নাম নয়। আরবি অভিধানে দাজ্জাল বলতে এমন একটি দলকে বোঝায়, যারা নিজেদের বিশ্বস্ত ও ধার্মিক হিসেবে উপস্থাপন করে, অথচ তারা বিশ্বস্তও নয়, ধার্মিকও নয়; বরং তাদের প্রতিটি কথা অসততা ও প্রতারণায় ভরা।” (কিতাবুল বারিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন, ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৪৩–২৪৪, টীকা)

শব্দটি যদি একটি গুণ হয়, তাহলে সেই গুণ যার মধ্যে পাওয়া যাবে, তাকেই দাজ্জাল বলা যাবে। মহানবী (সা.) নিজেও এভাবেই শব্দটি ব্যবহার করেছেন:

وَلاَ تَقُومُ السَّاعَةُ حَتَّى يُبْعَثَ دَجَّالُونَ كَذَّابُونَ قَرِيبًا مِنْ ثَلاَثِينَ، كُلُّهُمْ يَزْعُمُ أَنَّهُ رَسُولُ اللَّهِ
“আর কিয়ামত হবে না, যতক্ষণ না প্রায় ত্রিশজন মিথ্যাবাদী দাজ্জাল আবির্ভূত হয়, যাদের প্রত্যেকে দাবি করবে যে সে আল্লাহর রসূল।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস ৩৬০৯

একটি হাদীসেই ত্রিশজন দাজ্জাল! অর্থাৎ ইসলামের পরিভাষাতেই দাজ্জাল অনেক। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তাই লিখেছেন: “দাজ্জাল অনেক গত হয়েছে, সামনেও অনেক হবে।”

✦

তাহলে “মহা দাজ্জাল” কে?

অনেক দাজ্জালের মধ্যে একটি সবচেয়ে বড়। তাকে চিনব কীভাবে? হযরত মসীহ মওউদ (আ.) উত্তরটি কুরআন থেকে দিয়েছেন। কুরআন এমন এক মিথ্যার কথা বলে, যার ভয়াবহতায় আকাশ ফেটে যাওয়ার উপক্রম হয়:

تَکَادُ السَّمٰوٰتُ یَتَفَطَّرۡنَ مِنۡہُ وَتَنۡشَقُّ الۡاَرۡضُ وَتَخِرُّ الۡجِبَالُ ہَدًّا اَنۡ دَعَوۡا لِلرَّحۡمٰنِ وَلَدًا
“আকাশসমূহ ফাটিয়া যাইবার ও পৃথিবী বিদীর্ণ হইবার এবং পর্বতমালা খণ্ডবিখণ্ড হইয়া পড়িয়া যাইবার উপক্রম হইয়াছে। কারণ তাহারা রহমান আল্লাহ্‌র প্রতি পুত্র আরোপ করিয়াছে।”
সূরা মারইয়াম ১৯:৯১–৯২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ১৯:৯০–৯১।

তিনি লিখেছেন: “কুরআনে আল্লাহ ইহুদি, মুশরিক ও অন্যদের নানা প্রতারণার কথা বলেছেন, কিন্তু কোনোটির ব্যাপারে বলেননি যে তাতে আকাশ ফেটে যাবে। তাই আল্লাহ নিজের বাণীতে যে দলকে মহা দাজ্জাল বলেছেন, তাদের ছাড়া অন্য কাউকে মহা দাজ্জাল বলা উচিত নয়।” আর হাদীস বলে, মসীহের কাজ হবে ক্রুশ ভাঙা। তাই মহা দাজ্জাল সেই দল, যারা একজন মানুষকে খোদা বানায় আর ক্রুশকে মুক্তির পথ বলে প্রচার করে: খ্রিস্টান পাদ্রীদের সংগঠিত প্রচারশক্তি। (আনজামে আথম, রূহানী খাযায়েন, ১১শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৬–৪৮)

পাদ্রী আর পশ্চিমা জাতি কি আলাদা উত্তর?

না, এরা একই দেহের দুটি অংশ। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, প্রতিশ্রুত দাজ্জালের দুটি চোয়াল: একটি খ্রিস্টান মিশনারিরা, অন্যটি ইউরোপের দার্শনিকেরা। সাধারণ মানুষ পাদ্রীদের মিথ্যায় ধরা পড়ে, আর যারা সেখান থেকে বাঁচে, তারা দার্শনিকদের জালে আটকায়। (কিতাবুল বারিয়্যাহ, রূহানী খাযায়েন, ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৫২–২৫৩, টীকা)

পশ্চিমা খ্রিস্টান জাতিগুলোর বস্তুগত শক্তিই সেই প্রচারের বাহন। রেলগাড়ি, ছাপাখানা, জাহাজ: এসবের পিঠে চড়েই পাদ্রীরা পৃথিবীর কোণে কোণে পৌঁছেছিল। তাই “দাজ্জালের গাধা” বলতে এই যানবাহনকে বোঝানো একটি রূপক, স্ববিরোধ নয়।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

হাদীসে তো দাজ্জাল এক চোখ কানা এক ব্যক্তি?

এখানে কেউ কেউ বলেন, হাদীসে দাজ্জালের দেহের বর্ণনা আছে, তাই সে একজন মানুষই। চলুন সেই হাদীসটিই দেখি। মহানবী (সা.) বলেছেন, “আজ রাতে স্বপ্নে আমাকে কাবার কাছে দেখানো হলো।” সেখানে তিনি মসীহ ইবনে মারইয়ামকে কাবা তাওয়াফ করতে দেখলেন, আর তাঁর পেছনে এক চোখ কানা আরেকজনকেও কাবা তাওয়াফ করতে দেখলেন; বলা হলো, সে মসীহ দাজ্জাল। (সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৪৪০)

দাজ্জাল কাবা তাওয়াফ করছে! আক্ষরিক অর্থে এটি কল্পনাও করা যায় না। হাদীসটি নিজেই বলছে, এটি স্বপ্ন। স্বপ্নের দৃশ্যের ব্যাখ্যা লাগে, যেমন হযরত ইউসুফ (আ.)-এর গল্পে গাভী আর শীষের ব্যাখ্যা লেগেছিল। “এক চোখ কানা” মানে এমন শক্তি, যার দুনিয়ার চোখ তীক্ষ্ণ কিন্তু ধর্মের চোখ অন্ধ।

ইবনে সাইয়াদকে দাজ্জাল বলা কি আলাদা মত?

ইবনে সাইয়াদ মহানবী (সা.)-এর যুগের মদীনার এক ব্যক্তি, যার অদ্ভুত দাবি-দাওয়ার কথা হাদীসে আছে। তাকে দাজ্জাল বলা নতুন কিছু নয়। হযরত জাবির (রা.) কসম করে বলতেন, ইবনে সাইয়াদ দাজ্জাল। কারণ জানতে চাইলে বলেন, তিনি হযরত উমর (রা.)-কে মহানবী (সা.)-এর সামনেই এ কথা কসম করে বলতে শুনেছেন, আর মহানবী (সা.) তাতে আপত্তি করেননি। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ই’তিসাম, হাদীস ৭৩৫৫)

অর্থাৎ একজন ছোট দাজ্জাল তখনই ছিল, আর শেষ যুগে মহা দাজ্জাল আসবে। দুটি কথা একসঙ্গে সত্য হতে পারে, কারণ দাজ্জাল অনেক।

এত অর্থ থাকলে শব্দটির কোনো স্থির অর্থ থাকল কি?

অর্থ একটিই: বড় প্রতারণা, যা সত্যকে ঢেকে দেয়। সেই অর্থ যার ওপর যতটুকু খাটে, ততটুকুই তাকে দাজ্জাল বলা যায়। ছোট প্রতারকও দাজ্জাল, তবে “মহা দাজ্জাল” একটিই: যে মিথ্যার ভয়াবহতার কথা কুরআন নিজেই বলেছে। এটি একটি সুসংগত চিত্র, পরস্পরবিরোধী চারটি মত নয়।

সংক্ষেপে

  1. “দাজ্জাল” একটি গুণবাচক শব্দ: বড় প্রতারক বা প্রতারক দল। মহানবী (সা.) নিজেই ত্রিশজন দাজ্জালের কথা বলেছেন।
  2. মহা দাজ্জাল সেই দল, যারা মানুষকে খোদা বানায়; কুরআন বলেছে এ মিথ্যায় আকাশ ফেটে যাওয়ার উপক্রম।
  3. পাদ্রী ও পশ্চিমা দার্শনিক-জাতি একই দাজ্জালের দুই চোয়াল; রেলগাড়িকে গাধা বলা একটি রূপক।
  4. ইবনে সাইয়াদকে দাজ্জাল বলা সাহাবীদের যুগ থেকেই প্রচলিত; তাই এখানে কোনো স্ববিরোধ নেই।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.