মহানবী (সা.)-এর “দ্বিতীয় আগমন” বলতে কী বোঝানো হয়েছে?

সূরা জুমুআর একটি আয়াত শুনে সাহাবীরা প্রশ্ন করেছিলেন, “এরা কারা, হে আল্লাহর রসূল?” উত্তরে মহানবী (সা.) হাত রেখেছিলেন হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর কাঁধে।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

মদীনার মসজিদে নববী। মহানবী (সা.)-এর চারপাশে সাহাবীরা বসে আছেন। এমন সময় নাযিল হলো সূরা আল-জুমুআ। মহানবী (সা.) তিলাওয়াত করলেন। একটি আয়াতে এসে সাহাবীরা থমকে গেলেন।

আয়াতটি বলছিল, আল্লাহ এই রসূলকে শুধু আরবের উম্মীদের মধ্যেই পাঠাননি; তিনি তাঁকে পাঠাবেন আরও কিছু মানুষের মধ্যে, যারা এখনো এদের সাথে মিলিত হয়নি।

ہُوَ الَّذِیۡ بَعَثَ فِی الۡاُمِّیّٖنَ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ … وَّاٰخَرِیۡنَ مِنۡہُمۡ لَمَّا یَلۡحَقُوۡا بِہِمۡ
“তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাহাদেরই মধ্য হইতে এক রসূল আবির্ভূত করিয়াছেন, … এবং (তিনি তাহাকে আবির্ভূত করিবেন) তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও যাহারা এখন পর্যন্ত তাহাদের সঙ্গে মিলিত হয় নাই।…”
সূরা আল-জুমুআ ৬২:৩–৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৬২:২–৩।

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসূল, এরা কারা?” মহানবী (সা.) উত্তর দিলেন না। তিনবার প্রশ্ন করার পর তিনি পাশে বসা হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর ওপর হাত রাখলেন, আর বললেন:

لَوْ كَانَ الإِيمَانُ عِنْدَ الثُّرَيَّا لَنَالَهُ رِجَالٌ ـ أَوْ رَجُلٌ ـ مِنْ هَؤُلاَءِ
“ঈমান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রপুঞ্জের কাছেও চলে যায়, তবু এদের (সালমানের জাতির) কিছু লোক, অথবা একজন লোক, তা অর্জন করে আনবে।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, সূরা আল-জুমুআ, হাদীস ৪৮৯৭

আপত্তিটি কী?

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, এই আয়াতে মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমনের প্রতিশ্রুতি আছে, আর সেই আগমন হবে প্রতিশ্রুত মাহদীর মাধ্যমে। বিরোধীরা বলেন, এটি এক ভয়ংকর দাবি। মহানবী (সা.) কি আবার জন্ম নেবেন? নাকি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেকেই মুহাম্মদ (সা.) বানাতে চাইছেন?

প্রশ্নটির উত্তর পেতে আমাদের দেখতে হবে, “দ্বিতীয় আগমন” বলতে তিনি ঠিক কী বুঝিয়েছেন। তাঁর নিজের লেখাতেই এর উত্তর আছে।

তিনি নিজে কী লিখেছেন?

তোহফায়ে গোলড়বিয়া গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, “ওয়া আখারীনা মিনহুম” আয়াত অনুযায়ী মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয়বার আসা “বুরুয” ছাড়া অসম্ভব ছিল। বুরুয মানে আধ্যাত্মিক প্রতিফলন। তাই মহানবী (সা.)-এর রূহানিয়াত এমন একজনকে বেছে নিয়েছে, যিনি চরিত্রে, স্বভাবে, সাহসে আর সৃষ্টির প্রতি সহানুভূতিতে তাঁর সদৃশ; আর রূপক অর্থে তাঁকে নিজের নাম আহমদ ও মুহাম্মদ দিয়েছে। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৩)

কেন এই দ্বিতীয় আগমন দরকার ছিল? তিনি একটি টীকায় ব্যাখ্যা করেছেন। মহানবী (সা.)-এর দায়িত্ব ছিল দুটি: হেদায়াতকে পূর্ণ করা, আর সেই হেদায়াত পৃথিবীর সব জাতির কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রথমটি তাঁর জীবদ্দশায় পূর্ণ হয়েছে। কিন্তু দ্বিতীয়টি, অর্থাৎ সারা পৃথিবীতে প্রচার, তখন উপায়ের অভাবে সম্ভব ছিল না। তাই এমন এক যুগে তাঁর বুরুযী আগমনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যখন সব জাতির কাছে ইসলাম পৌঁছানোর উপায় তৈরি হবে। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৩, টীকা)

আর সেই যুগের ছবিও তিনি এঁকেছেন: ছাপাখানা চালু হলো, ডাকব্যবস্থা উন্নত হলো, সব দেশে যাতায়াত সহজ হলো, মানুষ একে অপরের ভাষা শিখল। তিনি লিখেছেন, ষাট বছর আগেও তাঁর দেশে এসব উপায় প্রায় ছিল না। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৬৪)

✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“দ্বিতীয় আগমন” কি পুনর্জন্ম বা আত্মার স্থানান্তর?

এখানে কেউ কেউ বলেন, এ তো হিন্দুদের পুনর্জন্মের ধারণার মতো। চলুন দেখি। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এক গলতী কা ইযালা-য় বুরুযের অর্থ পরিষ্কার করেছেন। বুরুয হলো এমন একজন, যিনি আধ্যাত্মিকভাবে আসল নবীর প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠেন; যেমন হযরত ইউশা (আ.) ছিলেন হযরত মূসা (আ.)-এর বুরুয। বুরুযের কোনো স্বাধীন অস্তিত্ব নেই, আর ছায়া কখনো আসল থেকে স্বাধীন নয়। (A Misconception Removed, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ১২–১৬)

তিনি লিখেছেন, এমন বুরুয নিজের থেকে কিছুই পান না; সবকিছু পান মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকে, আর তাঁর মধ্যে এমনভাবে বিলীন হন যে তাঁর ছবিই প্রতিফলিত হয়। এটি দেহ বা আত্মার স্থানান্তর নয়; এটি গুণ ও চরিত্রের প্রতিফলন।

হাদীসে তো সালমানের জাতির কিছু লোকের কথা, মাহদীর নাম নেই?

ঠিক, হাদীসে নাম নেই; আছে একটি পরিচয়। মহানবী (সা.) “আখারীনা মিনহুম” আয়াতের ব্যাখ্যায় এমন একজনের কথা বললেন, যিনি পারস্যবংশীয় হবেন আর আকাশে উঠে যাওয়া ঈমানকে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবেন। এটি ঠিক সেই কাজ, যা শেষ যুগের সংস্কারকের কাজ বলে সবাই মানেন।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, ইলহামের ভিত্তিতে তিনি জানেন তিনি পারস্যবংশীয়। (A Misconception Removed, পৃষ্ঠা ১৩–১৪, টীকা) আর এই আয়াতে যে “অন্য লোকদের” সাহাবীদের সাথে যুক্ত করা হয়েছে, তা থেকেই বোঝা যায় শেষ যুগে এমন একটি জামাত হবে যা সাহাবীদের জামাতের সদৃশ। আইয়ামুস সুলেহ-তে তিনি লিখেছেন, এই আয়াতে ইঙ্গিত আছে যে সেই জামাতের ইমামও ছায়া হিসেবে মহানবী (সা.)-এর সদৃশ হবেন; আর মহানবী (সা.) নিজেই প্রতিশ্রুত মাহদীর গুণ বর্ণনা করে বলেছেন, তিনি তাঁর সদৃশ হবেন। (রূহানী খাযায়েন, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৭)

তাই আয়াত, হাদীস আর বাস্তবতা একই দিকে ইশারা করছে।

এতে কি মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা কমে না, বা খতমে নবুওয়ত ভাঙে না?

বরং উল্টো। তিনি লিখেছেন, খাতামান নাবিয়্যীন হলো মুহাম্মদী নবুওয়তের ওপর আল্লাহর মোহর, যা কখনো ভাঙবে না। তবে মহানবী (সা.) বুরুয হিসেবে পৃথিবীতে প্রকাশিত হতে পারেন, “একবার নয়, হাজার বার”। আর নবীরা নিজেদের বুরুযের প্রতি ঈর্ষা করেন না, কারণ তা তাঁদেরই প্রতিচ্ছবি। (A Misconception Removed, পৃষ্ঠা ১৭)

ভাবুন, কোন কথাটি মহানবী (সা.)-এর জন্য বেশি সম্মানের? শেষ যুগে ইসলামকে বাঁচাতে আরেক জাতির এক নবী (ঈসা আ.) আকাশ থেকে নেমে আসবেন? নাকি মহানবী (সা.)-এর নিজের এক অনুগত সেবক, তাঁরই আলোয় আলোকিত হয়ে, তাঁরই কাজ পূর্ণ করবেন? দ্বিতীয়টিতে কৃতিত্ব পুরোটাই মহানবী (সা.)-এর।

সংক্ষেপে

  1. সূরা জুমুআর ৪ নম্বর আয়াত বলে, আল্লাহ এই রসূলকে পরবর্তী এক জাতির মধ্যেও আবির্ভূত করবেন।
  2. এর ব্যাখ্যায় মহানবী (সা.) সালমান ফারসী (রা.)-এর ওপর হাত রেখে পারস্যবংশীয় একজনের কথা বলেছেন, যিনি হারানো ঈমান ফিরিয়ে আনবেন (বুখারী ৪৮৯৭)।
  3. হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর মতে এই “দ্বিতীয় আগমন” বুরুযী, অর্থাৎ আধ্যাত্মিক প্রতিফলন; পুনর্জন্ম বা স্বতন্ত্র নবুওয়ত নয়।
  4. এর উদ্দেশ্য ইসলামকে সারা পৃথিবীতে পৌঁছানো, আর এর সব কৃতিত্ব মহানবী (সা.)-এর।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.