একজন মানুষকে দিনে প্রায় বিশবার বাথরুমে যেতে হয়। বছরের পর বছর। শরীর দুর্বল, মাথায় পুরোনো ব্যথা। এমন মানুষের কাছে পায়জামার ফিতার একটি গিঁটও হয়ে ওঠে বড় কষ্টের কারণ।
এটি কোনো কল্পনা নয়। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেই তাঁর অসুখের কথা লিখে গেছেন। আর এই অসুখের সাথেই জড়িয়ে আছে আজকের আপত্তিটি।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) রেশম ব্যবহার করতেন, অথচ ইসলামে পুরুষের জন্য রেশমের পোশাক নিষিদ্ধ। কোনো কোনো বাংলা লেখায় একে “রেশমী লুঙ্গি” বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে মহানবী (সা.)-এর সতর্কবাণী সত্যিই কঠোর:
তাই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ। চলুন, আগে দেখি মূল বর্ণনায় আসলে কী আছে।
মূল বর্ণনা: একটি ফিতা
বর্ণনাটি আছে সীরাতুল মাহদী গ্রন্থে, যা হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর পুত্র হযরত মির্যা বশীর আহমদ (রা.) সংকলন করেছেন। তিনি তাঁর মা, হযরত আম্মাজান (রা.)-এর কাছ থেকে শুনে লিখেছেন:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সাধারণত রেশমের ইযারবন্দ ব্যবহার করতেন। কারণ তাঁকে খুব ঘন ঘন প্রস্রাবের জন্য যেতে হতো। রেশমের ফিতা সহজে খোলা যেত, আর গিঁট পড়ে গেলেও খুলতে দেরি হতো না। সুতির ফিতায় কখনো কখনো গিঁট পড়ে যেত, তখন তাঁর খুব কষ্ট হতো। (সীরাতুল মাহদী, ১ম খণ্ড, বর্ণনা ৬৪)
লক্ষ করুন, “ইযারবন্দ” মানে পায়জামা বা সালোয়ার কোমরে বাঁধার সরু ফিতা। এটি কোনো লুঙ্গি বা জামা নয়, শরীর ঢাকার পোশাকও নয়। বাংলায় “রেশমী লুঙ্গি” কথাটি মূল শব্দের ভুল অনুবাদ থেকে এসেছে।
আর বর্ণনাটি নিজেই কারণ বলে দিচ্ছে: সাজসজ্জা নয়, অসুখ।
অসুখটি কী ছিল?
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) হাকীকাতুল ওহী গ্রন্থে লিখেছেন, তিনি দীর্ঘদিন দুটি রোগে ভুগেছেন। একটি মাইগ্রেন ও মাথা ঘোরা। অন্যটি ডায়াবেটিস, যাতে তিনি প্রায় বিশ বছর ভুগেছেন। তিনি লিখেছেন, এখনো তাঁকে দিনে প্রায় বিশবার প্রস্রাব করতে হয়, আর পরীক্ষায় প্রস্রাবে শর্করা পাওয়া গেছে। (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৬–৩৭৭)
এবার ছবিটা পরিষ্কার। দিনে বিশবার যাঁকে কাপড় খুলতে ও বাঁধতে হয়, তাঁর জন্য সুতির ফিতার গিঁট শুধু বিরক্তি নয়, রীতিমতো কষ্ট। মসৃণ রেশমের ফিতা সেই কষ্ট কমাত। এটি ছিল চিকিৎসার প্রয়োজন।
মহানবী (সা.) কি অসুখে রেশমের অনুমতি দিয়েছেন?
হ্যাঁ। এ বিষয়ে সহীহ বুখারীতে স্পষ্ট হাদীস আছে। হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন:
ভেবে দেখুন: এখানে অনুমতি দেওয়া হয়েছে পুরো একটি জামার, যা সারা গা ঢেকে রাখে। শুধু চুলকানির কষ্ট কমানোর জন্য। তাহলে যিনি বিশ বছর ধরে ডায়াবেটিসে ভুগছেন, তাঁর জন্য কোমরের একটি সরু ফিতা কীভাবে নিষিদ্ধ হতে পারে?
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
অনুমতি তো চুলকানির জন্য ছিল, অন্য অসুখে কি তা চলে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, হাদীসে তো শুধু চুলকানির কথা আছে। চলুন দেখি। হাদীসের মূল শিক্ষা হলো, রোগের কষ্ট দূর করার প্রয়োজনে মহানবী (সা.) নিষিদ্ধ জিনিসেও ছাড় দিয়েছেন। ইসলামী শরীয়ত বারবার এই নীতি দেখিয়েছে যে প্রয়োজন ও কষ্টের সময় আল্লাহ সহজ করেন।
চুলকানি যেমন একটি শারীরিক কষ্ট, দিনে বিশবার কাপড়ের গিঁট নিয়ে লড়াইও তেমনি একটি বাস্তব কষ্ট। যে কারণে রাসূল (সা.) জামার অনুমতি দিয়েছেন, সেই একই কারণে একটি ফিতা ব্যবহার করা তাঁর শিক্ষার বাইরে নয়।
এটা কি দুনিয়াবি বিলাসিতা ছিল না?
বর্ণনাটি নিজেই এর উত্তর দেয়। হযরত আম্মাজান (রা.) বিলাসিতার কথা বলেননি; বলেছেন গিঁট আর কষ্টের কথা। আর রেশমের জামা নয়, শুধু ফিতা, যা পোশাকের ভেতরে থাকে, কারো চোখেও পড়ে না। লোক দেখানো সাজসজ্জার জন্য কেউ এমন জিনিস বেছে নেয় না।
মহানবী (সা.) নিজেও রেশমের ব্যাপারে সামান্য পরিমাণের ব্যতিক্রম দেখিয়েছেন। হযরত উমর (রা.)-এর চিঠিতে আছে, মহানবী (সা.) রেশম নিষেধ করেছেন, তবে দুই আঙুল দেখিয়ে বলেছেন “এতটুকু ছাড়া”। (সহীহ বুখারী, কিতাবুল লিবাস, হাদীস ৫৮২৮) অর্থাৎ নিষেধাজ্ঞার উদ্দেশ্য অহংকার ও বিলাসের পোশাক, প্রয়োজন বা সামান্য ব্যবহার নয়।
একজন নবীর এত অসুখ কেন?
কেউ কেউ এই প্রশ্নও তোলেন। নবীরাও মানুষ; তাঁরাও অসুস্থ হন। মহানবী (সা.)-ও শেষ অসুস্থতায় প্রবল জ্বরে কষ্ট পেয়েছিলেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, প্রতিশ্রুত মসীহ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে তিনি “দুটি হলুদ চাদর” পরে আসবেন, আর তাঁর কাছে এর অর্থ দুটি রোগ; তাঁর মাথা ঘোরা ও ডায়াবেটিস সেই ভবিষ্যদ্বাণীরই পূর্ণতা। তিনি আরও লিখেছেন, ডায়াবেটিসের ভয়ংকর পরিণতি থেকে আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করার সুসংবাদ দিয়েছিলেন, আর সারা জীবন তিনি সেসব থেকে রক্ষা পেয়েছেন। (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৬–৩৭৭)
শেষে আরেকবার পুরো ছবিটি সামনে রাখি। একজন মানুষ বছরের পর বছর ডায়াবেটিসে ভুগছেন, দিনে বিশবার উঠতে হয়, সুতির ফিতার গিঁট তাঁকে কষ্ট দেয়। তাঁর স্ত্রী সেই কষ্টের কথা বর্ণনা করেছেন, আর পুত্র তা লিখে রেখেছেন। সেই ঘরোয়া, সরল বর্ণনা থেকে একটি ফিতাকে “রেশমী লুঙ্গি” বানিয়ে আপত্তি তোলা হয়েছে। মূল কথাটি খুঁজে পড়লেই বোঝা যায়, এখানে শরীয়ত ভাঙার কোনো ঘটনা নেই; আছে একজন অসুস্থ মানুষের প্রয়োজন, আর মহানবী (সা.)-এর দেওয়া ছাড়।
সংক্ষেপে
- মূল বর্ণনায় আছে রেশমের “ইযারবন্দ”, অর্থাৎ পায়জামার সরু ফিতা; “রেশমী লুঙ্গি” কথাটি ভুল অনুবাদ।
- কারণ ছিল ডায়াবেটিস: তাঁকে দিনে প্রায় বিশবার প্রস্রাবে যেতে হতো, আর সুতির ফিতার গিঁট খুলতে কষ্ট হতো।
- মহানবী (সা.) চুলকানির কারণে দুই সাহাবীকে পুরো রেশমের জামার অনুমতি দিয়েছিলেন (বুখারী ২৯১৯, ৫৮৩৯)।
- তাই অসুখের প্রয়োজনে একটি ফিতা ব্যবহার করা হারাম কাজ নয়; আপত্তিটি টেকে না।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Blessings of Prayers (Friday Sermon, 21 November 2014) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.