১৮৩৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি, শুক্রবার। পাঞ্জাবের গুরুদাসপুর জেলার ছোট্ট গ্রাম কাদিয়ান। এক সম্ভ্রান্ত জমিদার পরিবারে একসাথে দুটি শিশুর জন্ম হলো: আগে একটি মেয়ে, তারপর একটি ছেলে। মেয়েটি কয়েক দিন পরেই মারা গেল। ছেলেটির নাম রাখা হলো গোলাম আহমদ।
তাঁর পূর্বপুরুষরা এসেছিলেন মধ্য এশিয়ার সমরকন্দ থেকে। মোগল আমলে তাঁরা পাঞ্জাবে বসতি গড়েন, আর সেই বসতিই পরে কাদিয়ান নামে পরিচিত হয়।
নির্জন যৌবন
তাঁর লেখাপড়া হয়েছিল বাড়িতে, কয়েকজন গৃহশিক্ষকের কাছে। alislam.org-এর জীবনীতে বলা হয়েছে, তাঁরা বড় কোনো পণ্ডিত ছিলেন না; তিনি ফারসি ও আরবি পড়তে শিখেছিলেন, আর বাবার কাছে, যিনি একজন দক্ষ চিকিৎসক ছিলেন, চিকিৎসাশাস্ত্রের কিছু বই পড়েছিলেন। এর বেশি প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাঁর ছিল না।
কিন্তু তাঁর মন পড়ে থাকত অন্য জায়গায়। দুনিয়াবি কাজের চেয়ে তিনি ভালোবাসতেন মসজিদের নির্জনতা, কুরআন পাঠ আর দোয়া। অল্প বয়স থেকেই তিনি সত্য স্বপ্ন দেখতেন, কাশফ ও ইলহাম লাভ করতেন।
১৮৬৮ বা ১৮৬৯ সালের একটি ঘটনা। বাটালার লোকেরা তাঁকে মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভীর সাথে একটি বিষয়ে বিতর্ক করতে নিয়ে গেল। কিন্তু মৌলভী সাহেবের বক্তব্য শুনে তিনি তাতে আপত্তিকর কিছু পেলেন না, তাই বিতর্ক করতে অস্বীকার করলেন। লোকে তাঁকে ছোট করল। তিনি মানুষের প্রশংসার চেয়ে সত্যকে বেছে নিয়েছিলেন। এর পরেই তাঁর ওপর ইলহাম হলো: “তোমার খোদা তোমার এই কাজে সন্তুষ্ট হয়েছেন। তিনি তোমাকে অনেক বরকত দেবেন, এমনকি বাদশাহরা তোমার কাপড় থেকে বরকত খুঁজবে।”
ঘোষণা আর জামাত
১৮৮০ সালে প্রকাশিত হলো তাঁর প্রথম বড় গ্রন্থ বারাহীনে আহমদীয়া, যেখানে তিনি কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব আর মহানবী (সা.)-এর সত্যতার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। বইটি আলেম-সমাজে সাড়া ফেলে দিল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ কাদিয়ানে আসতে শুরু করল।
১৮৮২ সালে তাঁর ওপর সেই ইলহাম হয়, যাতে প্রকাশ পেল যে আল্লাহ তাঁকে নিজের কাজের জন্য নিযুক্ত করেছেন। ১৮৮৬ সালে তিনি এক মহান পুত্রের জন্মের ভবিষ্যদ্বাণী করেন; ১৮৮৯ সালের ১২ জানুয়ারি জন্ম নেন হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.), যিনি পরে জামাতের দ্বিতীয় খলীফা হন।
১৮৮৯ সালের ২৩ মার্চ, লুধিয়ানায়, আল্লাহর নির্দেশে তিনি প্রথম বয়আত গ্রহণ করেন। প্রথম বয়আতকারী ছিলেন হযরত মৌলভী নূরুদ্দীন (রা.)। এভাবেই আহমদীয়া মুসলিম জামাতের সূচনা।
১৮৯১ সালে তিনি ঘোষণা করেন, হযরত ঈসা (আ.) স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, আর যে মসীহ ও মাহদীর আগমনের প্রতিশ্রুতি মহানবী (সা.) দিয়েছিলেন, তিনিই সেই ব্যক্তি।
একটি কলম, একটি জীবন
জীবনের বাকি সময় তিনি কাটিয়েছেন লিখে, বলে আর দোয়া করে। alislam.org অনুযায়ী তিনি আশিটিরও বেশি বই লিখেছেন, হাজার হাজার চিঠি লিখেছেন, শত শত বক্তৃতা দিয়েছেন, অসংখ্য প্রকাশ্য বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। উর্দু, আরবি আর ফারসি তিন ভাষাতেই তাঁর রচনা আছে।
১৯০৮ সালের ২৬ মে লাহোরে তিনি ইন্তেকাল করেন। কাদিয়ানে তাঁকে দাফন করা হয়। তাঁর ইন্তেকালের পর মহানবী (সা.)-এর ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী জামাতে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়; প্রথম খলীফা হন হযরত মৌলভী নূরুদ্দীন (রা.)। আজ জামাতের পঞ্চম খলীফা হযরত মির্যা মাসরূর আহমদ (আই.)।
যে মানুষটি একদিন একা ছিলেন, যাঁর গ্রামে সপ্তাহে একবার ডাক আসত, তাঁর প্রতিষ্ঠিত জামাত আজ পৃথিবীর বহু দেশে ছড়িয়ে আছে এবং ইসলামের বাণী প্রচার করে চলেছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“যাঁর মাদ্রাসার ডিগ্রি নেই, তিনি কীভাবে এত বড় আলেম হলেন?”
এখানে কেউ কেউ প্রশ্ন তোলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছাড়া এত গ্রন্থ কীভাবে সম্ভব? আসলে প্রশ্নটিই উত্তর। alislam.org-এর জীবনী নিজেই স্বীকার করে, তাঁর শিক্ষা ছিল সাধারণ। তবু তিনি কুরআনের এমন ব্যাখ্যা দিয়েছেন আর আরবিতে এমন বই লিখেছেন, যার মোকাবেলায় তাঁর সময়ের বড় বড় আলেমদের তিনি চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলেন। আল্লাহর প্রেরিতদের জ্ঞানের উৎস মাদ্রাসা নয়, আল্লাহ নিজে। মহানবী (সা.) নিজেই ছিলেন উম্মী, অথচ তাঁর মাধ্যমে এসেছে কুরআন।
“আহমদীয়া কি আলাদা কোনো ধর্ম?”
না। হযরত মির্যা তাহের আহমদ (রহ.) এক সাক্ষাৎকারে ব্যাখ্যা করেছেন, ইসলামের মধ্যে যেমন বিভিন্ন মাযহাব ও ধারার নাম আছে, “আহমদীয়া” নামটিও তেমনি একটি পরিচয়, কোনো নতুন ধর্ম নয়। আর নামটি এসেছে মহানবী (সা.)-এরই নাম “আহমদ” থেকে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, মহানবী (সা.)-এর দুটি নাম, মুহাম্মদ ও আহমদ; শেষ যুগে, শান্তি আর ধৈর্যের মাধ্যমে প্রচারের যুগে, “আহমদ” নামের গুণাবলি প্রকাশের সময়।
“তিনি কি নতুন শরীয়ত বা নতুন কালেমা এনেছেন?”
না। তিনি নিজে লিখেছেন, তিনি কোনো স্বাধীন শরীয়ত আনেননি এবং তিনি স্বাধীন নবী নন (এক গলতী কা ইযালা)। আহমদীদের কালেমা, কুরআন, নামায, রোযা, হজ, যাকাত সবই মহানবী (সা.)-এর আনা ইসলামের। তাঁর পুরো জীবনের কাজ ছিল মানুষকে কুরআন আর মহানবী (সা.)-এর দিকে ফিরিয়ে আনা।
সংক্ষেপে
- হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ১৮৩৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারি কাদিয়ানে যমজ হয়ে জন্মগ্রহণ করেন।
- ১৮৮২ সালে আল্লাহর পক্ষ থেকে নিযুক্তির ইলহাম, ১৮৮৯ সালে লুধিয়ানায় প্রথম বয়আত, ১৮৯১ সালে মসীহ ও মাহদী হওয়ার ঘোষণা।
- তিনি আশিটিরও বেশি বই আর হাজার হাজার চিঠি লিখেছেন; ১৯০৮ সালের ২৬ মে ইন্তেকাল করেন।
- তাঁর পর জামাতে খিলাফত প্রতিষ্ঠিত হয়; আহমদীয়াত নতুন ধর্ম নয়, মহানবী (সা.)-এর ইসলামেরই সেবক।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Promised Messiah – Hazrat Mirza Ghulam Ahmad · alislam.org
- A Life Sketch of the Promised Messiah · alislam.org
- Claims of the Promised Messiah · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.