একটি বিনীত আহ্বান: নিজে যাচাই করে দেখুন

আপনাকে কারো কথায় বিশ্বাস করতে বলা হচ্ছে না। কুরআন যেভাবে সত্য যাচাই করতে শিখিয়েছে, আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে যে পথ দেখিয়েছেন, সেভাবে একবার নিজে দেখুন।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

প্রিয় পাঠক, এই লেখাটি কোনো বিতর্ক নয়। এটি একটি চিঠির মতো, একজন মুসলমান ভাইয়ের পক্ষ থেকে আরেকজন ভাই বা বোনের কাছে।

আমরা সবাই একই কালেমা পড়ি: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই, মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহর রসূল। আমরা সবাই মহানবী (সা.)-এর একটি প্রতিশ্রুতির অপেক্ষায় ছিলাম: শেষ যুগে ইসলামের দুর্দিনে আল্লাহ মসীহ ও মাহদীকে পাঠাবেন। প্রশ্ন শুধু একটি: তিনি কি এসে গেছেন?

সেই দুঃসময়ের কথা

উনিশ শতকের ভারতবর্ষের কথা ভাবুন। মুসলমানদের রাজনৈতিক শক্তি ভেঙে পড়েছে। খ্রিষ্টান মিশনারিরা গ্রামে গ্রামে প্রচার করছেন, আর ইসলামকে মিটিয়ে দেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন। অন্যদিকে আর্য সমাজের পণ্ডিতরা কুরআন ও মহানবী (সা.)-কে আক্রমণ করে বই লিখছেন। মুসলমানরা নিজেরা বিভক্ত, একে অপরকে কাফির বলছেন।

উম্মতের বুযুর্গরা বহু আগেই এই সময়ের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (রহ.) লিখেছিলেন, চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে মাহদী ও ঈসার আবির্ভাব হলে তিনিই হবেন সেই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ। তাঁর ছেলে লিখেছিলেন, হয়তো আর কয়েক বছরের মধ্যেই মাহদী এসে যাবেন।

ঠিক সেই সময়ে পাঞ্জাবের অখ্যাত গ্রাম কাদিয়ান থেকে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে ঘোষণা করলেন, আল্লাহ তাঁকেই এই যুগের মসীহ ও মাহদী করে পাঠিয়েছেন। হাতে কোনো তলোয়ার নেই, কোনো রাজশক্তি নেই, আছে শুধু একটি কলম, কুরআনের যুক্তি আর দোয়া।

কুরআনের একটি সতর্কবাণী

আল্লাহ তাআলা আদম সন্তানদের সম্বোধন করে বলেছেন:

یٰبَنِیۡۤ اٰدَمَ اِمَّا یَاۡتِیَنَّکُمۡ رُسُلٌ مِّنۡکُمۡ یَقُصُّوۡنَ عَلَیۡکُمۡ اٰیٰتِیۡ ۙ فَمَنِ اتَّقٰی وَاَصۡلَحَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ
“হে আদম সন্তানগণ! যদি তোমাদের নিকট তোমাদের মধ্য হইতে রসূলগণ আসিয়া তোমাদিগকে আমার আয়াতসমূহ পাঠ করিয়া শুনায়, তখন যাহারা তাক্‌ওয়া অবলম্বন করিবে এবং সংশোধন করিবে সেক্ষেত্রে তাহাদের জন্য না কোন ভয় থাকিবে এবং না তাহারা দুঃখিত হইবে।”
সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৩৬
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৭:৩৫।

আর ফেরাউনের বংশের এক মুমিন ব্যক্তির কথা কুরআন আমাদের জন্য সংরক্ষণ করেছে। মূসা (আ.)-কে নিয়ে যখন সবাই উত্তেজিত, তিনি শান্তভাবে বলেছিলেন:

وَاِنۡ یَّکُ کَاذِبًا فَعَلَیۡہِ کَذِبُہٗ ۚ وَاِنۡ یَّکُ صَادِقًا یُّصِبۡکُمۡ بَعۡضُ الَّذِیۡ یَعِدُکُمۡ
“…এবং যদি সে মিথ্যাবাদী হয় তাহা হইলে তাহার মিথ্যার প্রতিফল তাহারই উপর বর্তিবে; আর যদি সে সত্যবাদী হয় তাহা হইলে সে তোমাদিগকে যে (সমস্ত আযাব সম্বন্ধে) ভয় প্রদর্শন করিতেছে, উহার কিয়দংশ অবশ্যই তোমাদের উপর বর্তিবে।…”
সূরা আল-মু’মিন ৪০:২৯

এটিই সবচেয়ে ন্যায্য অবস্থান। তাড়াহুড়ো করে প্রত্যাখ্যান নয়, অন্ধভাবে গ্রহণও নয়; বরং শান্ত মনে যাচাই।

✦

কীভাবে যাচাই করবেন

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই সত্যসন্ধানীদের একটি পথ দেখিয়ে গেছেন। তিনি মানুষকে আহ্বান করেছিলেন, যুগের মৌলভীদের অন্ধ অনুসরণ না করে নিজে খোঁজ নিতে, আর মনের সব পূর্বধারণা সরিয়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে। তিনি একটি পদ্ধতিও বলেছেন: দুই রাকাত নফল নামায, প্রথম রাকাতে সূরা ইয়াসীন, দ্বিতীয় রাকাতে একুশবার সূরা ইখলাস; তারপর তিনশবার দরূদ শরীফ আর তিনশবার ইস্তিগফার; আর আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি যেন তাঁর দাবির সত্যতা জানিয়ে দেন।

আল্লাহ নিজেই প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন: “এবং যাহারা আমাদের (সাক্ষাতের) উদ্দেশ্যে চেষ্টা-সাধনা করে, নিশ্চয় আমরা তাহাদিগকে আমাদের (নিকটে আসার) পথসমূহ প্রদর্শন করিব।” (সূরা আল-আনকাবূত ২৯:৭০)

দোয়ার পাশাপাশি পড়ুন। তাঁর বই, তাঁর জীবনী আর জামাতের পরিচিতি বিনামূল্যে পাওয়া যায়। বিরোধীদের মুখে শোনা কথার বদলে মূল লেখাটি নিজে পড়ুন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“বাপ-দাদার বিশ্বাসেই থাকলে ক্ষতি কী?”

বাপ-দাদার প্রতি ভালোবাসা সুন্দর গুণ। কিন্তু কুরআন সতর্ক করেছে, সত্যের প্রশ্নে শুধু পূর্বপুরুষের দোহাই যথেষ্ট নয়:

وَاِذَا قِیۡلَ لَہُمُ اتَّبِعُوۡا مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ قَالُوۡا بَلۡ نَتَّبِعُ مَاۤ اَلۡفَیۡنَا عَلَیۡہِ اٰبَآءَنَا
“এবং যখন তাহাদিগকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্‌ যাহা নাযেল করিয়াছেন, তোমরা উহার অনুসরণ কর’, তখন তাহারা বলে, ‘না বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষগণকে যাহার উপর পাইয়াছি, উহারই অনুসরণ করিব।…”
সূরা আল-বাকারা ২:১৭১

আর মনে রাখুন, আমাদের পূর্বপুরুষরাও মসীহ ও মাহদীর অপেক্ষায় ছিলেন। তাঁদের অপেক্ষার উত্তর খোঁজাই আসলে তাঁদের প্রতি সত্যিকারের বিশ্বস্ততা।

“এত আলেম বিরোধিতা করেন, তাঁরা কি সবাই ভুল?”

সংখ্যা দিয়ে সত্য মাপা যায় না। কুরআন বলে, যখনই কোনো রসূল এসেছেন, মানুষ তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা করেছে (সূরা ইয়াসীন ৩৬:৩১)। আর হযরত ইবনে আরাবী (রহ.)-এর মতো বুযুর্গ লিখে গেছেন, ইমাম মাহদীর সবচেয়ে কঠোর বিরোধী হবেন সেই যুগের প্রথাগত আলেমরা। তাই বিরোধিতা দেখে থেমে না গিয়ে প্রমাণ দেখুন। ঈসা (আ.)-এর যুগেও ধর্মীয় নেতারা বিরোধিতা করেছিলেন, মহানবী (সা.)-এর যুগেও।

“মাহদীকে মানা কি এত জরুরি?”

মহানবী (সা.) মাহদী সম্পর্কে বলেছেন: “যখন তোমরা তাঁকে দেখবে, তাঁর হাতে বয়আত করবে, বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হলেও; কেননা তিনি আল্লাহর খলীফা মাহদী।” (সুনানে ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৮৪)। যাঁর জন্য বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে বলা হয়েছে, তাঁর দাবি অন্তত একবার মন দিয়ে যাচাই করা কি আমাদের কর্তব্য নয়?

সংক্ষেপে

  1. উম্মত চতুর্দশ শতাব্দীতে মসীহ ও মাহদীর অপেক্ষায় ছিল; ঠিক সেই সময়ে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) দাবি করেছেন।
  2. কুরআন শেখায়: তাড়াহুড়ো করে প্রত্যাখ্যান নয়, ন্যায্যভাবে যাচাই (৪০:২৯)।
  3. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই সত্য জানার জন্য দোয়ার একটি পথ দেখিয়েছেন; আল্লাহ সন্ধানীদের পথ দেখানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন (২৯:৭০)।
  4. মূল বই আর তথ্য বিনামূল্যে পাওয়া যায়; নিজে পড়ুন, নিজে সিদ্ধান্ত নিন।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.