“জিহাদ” শব্দটি শুনলে আজ অনেকের চোখে ভেসে ওঠে অস্ত্র, যুদ্ধ আর রক্তের ছবি। খবরের কাগজ আর টেলিভিশন এই ছবিটাকেই বারবার দেখায়। কিন্তু একবার থেমে জিজ্ঞেস করুন: কুরআন নিজে এই শব্দটিকে কোন কোন অর্থে ব্যবহার করেছে?
আরবিতে জিহাদ শব্দের মূল অর্থ হলো প্রাণপণ চেষ্টা করা, সর্বশক্তি দিয়ে খাটা। এই চেষ্টা নানা রকমের হতে পারে। কুরআন খুললে আমরা অন্তত চারটি ক্ষেত্র দেখতে পাই।
কুরআনে জিহাদের চারটি ক্ষেত্র
প্রথম, নিজের নফসের সঙ্গে জিহাদ। আল্লাহ তাআলা বলেছেন:
আল্লাহর নৈকট্য পেতে নিজের মন্দ ঝোঁকের বিরুদ্ধে লড়াই, এটাই সবচেয়ে কঠিন জিহাদ। মহানবী (সা.) নিজে বলেছেন, “আল-মুজাহিদু মান জাহাদা নাফসাহ”, অর্থাৎ প্রকৃত মুজাহিদ সে-ই, যে নিজের নফসের সঙ্গে জিহাদ করে (জামে তিরমিযী, কিতাবু ফাযাইলিল জিহাদ, হাদীস ১৬২১)।
দ্বিতীয়, কুরআন দিয়ে জিহাদ। মক্কায় যখন মুসলমানদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, তখনই আল্লাহ তাঁর রসূলকে বললেন:
লক্ষ করুন, কুরআনের সাহায্যে করা জিহাদকে আল্লাহ নিজেই বলেছেন “বৃহত্তর জিহাদ”। যুক্তি, প্রমাণ আর কুরআনের বাণী দিয়ে মানুষের হৃদয় জয় করা।
তৃতীয়, সম্পদ ও প্রাণ দিয়ে জিহাদ। আল্লাহ বলেছেন: “আল্লাহ্র পথে জিহাদ কর তোমাদের ধন-সম্পদ দিয়া এবং তোমাদের প্রাণ দিয়া” (সূরা আত-তাওবা ৯:৪১)। ধর্মের জন্য সময়, অর্থ আর শ্রম কুরবানি করা এর অন্তর্ভুক্ত।
চতুর্থ, অস্ত্রের জিহাদ। এটিও কুরআনে আছে, কিন্তু কঠোর শর্তসহ। প্রথম যখন যুদ্ধের অনুমতি এল, তার ভাষা ছিল এমন:
শর্তগুলো আয়াতেই আছে: যাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছে, আর যাদের ওপর যুলুম হচ্ছে। অর্থাৎ অস্ত্রের জিহাদ আত্মরক্ষার জন্য, ধর্মের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। কাউকে জোর করে মুসলমান বানানোর জন্য নয়, কারণ কুরআন স্পষ্ট বলে দিয়েছে: “ধর্মের ব্যাপারে কোন বল প্রয়োগ নাই” (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৭)।
প্রতিশ্রুত মসীহর যুগে কী হবে?
এবার শেষ যুগের দিকে তাকাই। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:
জিযিয়া ছিল যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত একটি কর। যুদ্ধে পরাজিত অমুসলিম প্রজারা সামরিক দায়িত্বের বদলে এই কর দিত। প্রতিশ্রুত মসীহ জিযিয়াই তুলে দেবেন, অর্থাৎ ধর্মের নামে যুদ্ধের অধ্যায়টাই তাঁর যুগে বন্ধ হবে। আলইসলাম ডট অর্গের “Exposition of Jihad” প্রবন্ধে এই ভবিষ্যদ্বাণীটি “ইয়াযাউল হারব” শব্দে উদ্ধৃত হয়েছে, অর্থাৎ “তিনি যুদ্ধ রহিত করবেন”। বুখারীর প্রচলিত সংস্করণে (হাদীস ৩৪৪৮) শব্দটি “জিযিয়া”; দুটির বক্তব্য একই দিকে যায়।
কেন এমন হবে? কারণ সে যুগে ইসলামের ওপর আক্রমণ আসবে তলোয়ার দিয়ে নয়, কলম আর যুক্তি দিয়ে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর যুগে ঠিক তা-ই ঘটেছিল। খ্রিষ্টান মিশনারি আর অন্যান্য সমালোচকেরা বই, পত্রিকা আর বিতর্কসভায় মহানবী (সা.) ও কুরআনের ওপর আক্রমণ চালাচ্ছিল, কিন্তু কেউ ইসলাম পালনের জন্য অস্ত্র নিয়ে মুসলমানদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছিল না।
তাই তিনি ঘোষণা করলেন, এ যুগের জিহাদ হলো ইসলামের বাণী উঁচু করে ধরা, বিরোধীদের আপত্তির জবাব দেওয়া, ইসলামের সৌন্দর্য প্রচার করা আর মহানবী (সা.)-এর সত্যতা ঘোষণা করা। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত The Truth about Ahmadiyyat গ্রন্থে মীর নাসির নওয়াব সাহেবের কাছে লেখা তাঁর একটি চিঠি থেকে এই কথাগুলো উদ্ধৃত হয়েছে। তিনি নিজে অসংখ্য বই লিখে এই জিহাদের নমুনা রেখে গেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“কুরআনে তো বলা আছে ‘তোমাদের ওপর যুদ্ধ ফরজ করা হয়েছে’, তাহলে জিহাদ রহিত হয় কীভাবে?”
একটি আপত্তি হলো, কুরআন যুদ্ধকে ফরজ বলেছে, আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তা বন্ধ করে দিয়েছেন। চলুন দেখি। কুরআনে রোযাও ফরজ, কিন্তু অসুস্থ আর মুসাফিরের জন্য ছাড় আছে। নামায ফরজ, কিন্তু নিষিদ্ধ সময়ে পড়া যায় না। যাকাত ফরজ, কিন্তু নিঃস্ব মানুষের ওপর নয়।
প্রতিটি ফরজের সঙ্গে তার শর্ত জুড়ে থাকে। অস্ত্রের জিহাদের শর্ত কুরআন নিজেই দিয়েছে: যখন তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হয়, যখন তোমাদের ওপর যুলুম হয় (২২:৪০)। এই শর্ত যেখানে নেই, সেখানে অস্ত্রের জিহাদও নেই। আহমদীয়া জামাত কুরআনের হুকুম বাতিল করেনি, বরং কুরআনের শর্ত মেনে চলছে। আর মহানবী (সা.) নিজেই বলে গেছেন, মসীহর যুগে ধর্মের নামে যুদ্ধ থেমে যাবে।
“তাহলে কি আহমদীরা কখনো আত্মরক্ষাও করবে না?”
এমন নয়। জিহাদ স্থগিত হওয়ার অর্থ হলো ধর্ম প্রচারের নামে তলোয়ার তোলা বন্ধ। কেউ যদি ধর্ম পালনের কারণে মুসলমানদের ওপর অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ করে, তাহলে কুরআনের শর্ত পূর্ণ হয় এবং আত্মরক্ষার অধিকার ফিরে আসে। আলইসলাম ডট অর্গের ব্যাখ্যা অনুযায়ী মসীহর যুগে তলোয়ারের জিহাদ বন্ধ হওয়ার কারণ হলো, এটি ধর্মীয় স্বাধীনতার যুগ।
“অস্ত্রের জিহাদ বাদ দিলে ইসলাম কি দুর্বল হয়ে যাবে না?”
ইতিহাস উল্টো কথা বলে। মক্কার তেরো বছরে মুসলমানদের হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, তবু সেই সময়েই আল্লাহ কুরআন দিয়ে জিহাদকে “বৃহত্তর জিহাদ” বলেছেন। ইসলামের সবচেয়ে বড় বিজয় এসেছে হৃদয় জয় করে। আজ আহমদীয়া জামাত বিশ্বের বহু দেশে কুরআনের অনুবাদ, মসজিদ, স্কুল আর হাসপাতালের মাধ্যমে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিচ্ছে। তলোয়ার মানুষের শরীর দখল করতে পারে, কিন্তু হৃদয় জয় করে কুরআনের আলো।
সংক্ষেপে
- কুরআনে জিহাদ মানে নফসের সঙ্গে লড়াই (২৯:৭০), কুরআন দিয়ে প্রচার (২৫:৫৩), সম্পদ ও প্রাণের কুরবানি (৯:৪১), আর শর্তসাপেক্ষে আত্মরক্ষার যুদ্ধ (২২:৪০)।
- কুরআন দিয়ে করা জিহাদকে আল্লাহ নিজে “বৃহত্তর জিহাদ” বলেছেন।
- মহানবী (সা.) বলেছেন, প্রতিশ্রুত মসীহ জিযিয়া রহিত করবেন (বুখারী ৩৪৪৮), অর্থাৎ তাঁর যুগে ধর্মের নামে যুদ্ধ থেমে যাবে।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কলম ও যুক্তির জিহাদকে এ যুগের জিহাদ বলে ঘোষণা করেছেন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.