ইমাম মাহদীর মর্যাদা কত উঁচু?

অনেকে তাঁকে শুধু একজন ন্যায়পরায়ণ শাসক ভাবেন। অথচ কুরআন তাঁর আগমনকে মহানবী (সা.)-এরই আরেক আবির্ভাব বলেছে, আর সহীহ মুসলিমে মহানবী (সা.) তাঁকে চারবার ‘আল্লাহর নবী’ বলেছেন।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

বৃষ্টির দিনে আকাশের দিকে তাকিয়ে কেউ কি বলতে পারে, প্রথম ফোঁটাগুলো বেশি উপকারী নাকি শেষের ফোঁটাগুলো? মাটি তো দুটিতেই প্রাণ পায়।

মহানবী (সা.) তাঁর উম্মতকে ঠিক এই বৃষ্টির সঙ্গে তুলনা করেছেন। হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, তিনি বলেছেন:

مَثَلُ أُمَّتِي مَثَلُ الْمَطَرِ لاَ يُدْرَى أَوَّلُهُ خَيْرٌ أَمْ آخِرُهُ
“আমার উম্মতের দৃষ্টান্ত বৃষ্টির মতো; জানা যায় না, এর প্রথম ভাগ উত্তম নাকি শেষ ভাগ।”
জামে তিরমিযী, কিতাবুল আমসাল, হাদীস ২৮৬৯

উম্মতের প্রথম ভাগে ছিলেন মহানবী (সা.) আর তাঁর সাহাবীরা। শেষ ভাগ এত মূল্যবান হবে কেন যে তাকে প্রথম ভাগের পাশে দাঁড় করানো যায়? কারণ শেষ ভাগে আসবেন এমন একজন, যাঁর মর্যাদা অসাধারণ।

কুরআনের সাক্ষ্য: মহানবী (সা.)-এর আরেক আবির্ভাব

সূরা আল-জুমুআয় আল্লাহ বলছেন, তিনি উম্মী আরবদের মধ্যে রসূল পাঠিয়েছেন:

ہُوَ الَّذِیۡ بَعَثَ فِی الۡاُمِّیّٖنَ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ ... وَّاٰخَرِیۡنَ مِنۡہُمۡ لَمَّا یَلۡحَقُوۡا بِہِمۡ
“তিনিই উম্মীদের মধ্যে তাহাদেরই মধ্য হইতে এক রসূল আবির্ভূত করিয়াছেন…” “এবং (তিনি তাহাকে আবির্ভূত করিবেন) তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও যাহারা এখন পর্যন্ত তাহাদের সঙ্গে মিলিত হয় নাই।…”
সূরা আল-জুমুআ ৬২:৩–৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৬২:২–৩।

অর্থাৎ একই রসূল আরেক যুগের মানুষের মধ্যেও “আবির্ভূত” হবেন। সাহাবীরা জানতে চাইলে মহানবী (সা.) হযরত সালমান ফারসী (রা.)-এর কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রে চলে গেলেও এদের মধ্য থেকে কেউ তা ফিরিয়ে আনবে (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, হাদীস ৪৮৯৭)।

মহানবী (সা.) নিজে সশরীরে ফিরবেন না। তাই এই আবির্ভাব হবে তাঁর এক পূর্ণ অনুসারীর মাধ্যমে, যাঁর মধ্যে তাঁরই আলো প্রতিফলিত হবে। হুযূর আনোয়ার (আই.) ২০২৩ সালের ২৪ মার্চের জুমুআর খুতবায় এই আয়াতগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরে বলেছেন, সেই মানুষ হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। যাঁর আগমনকে আল্লাহ তাঁর প্রিয় রসূলের আগমন বলে বর্ণনা করেছেন, তাঁর মর্যাদা বোঝাতে এর চেয়ে বড় কথা আর কী হতে পারে?

হাদীসের সাক্ষ্য: “আল্লাহর নবী”, চারবার

সহীহ মুসলিমে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর দীর্ঘ বর্ণনায় আগমনকারী ঈসার কথা আছে। সেখানে মহানবী (সা.) তাঁকে একবার নয়, চারবার বলেছেন “নবীউল্লাহ ঈসা”, অর্থাৎ আল্লাহর নবী ঈসা। যেমন:

وَيُحْصَرُ نَبِيُّ اللَّهُ عِيسَى وَأَصْحَابُهُ ... فَيَرْغَبُ نَبِيُّ اللَّهِ عِيسَى وَأَصْحَابُهُ
“আর আল্লাহর নবী ঈসা ও তাঁর সঙ্গীরা অবরুদ্ধ হয়ে পড়বেন… তখন আল্লাহর নবী ঈসা ও তাঁর সঙ্গীরা (আল্লাহর কাছে) মিনতি করবেন…”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান ওয়া আশরাতিস সাআহ, হাদীস ২৯৩৭

আর সুনান ইবনে মাজাহতে হযরত সাওবান (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.) মাহদীকে বলেছেন “খলীফাতুল্লাহ”, অর্থাৎ আল্লাহর খলীফা, এবং বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাঁর হাতে বয়আত করতে বলেছেন (কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৮৪)।

আল্লাহর খলীফা, আল্লাহর নবী, মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছবি। এগুলো কোনো সাধারণ শাসকের উপাধি নয়।

✦

পূর্ববর্তী বুযুর্গদের দৃষ্টিতে

উম্মতের বড় বড় আলেমও এই মর্যাদা বুঝেছিলেন। দ্বাদশ হিজরী শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হিসেবে পরিচিত হযরত শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.)-এর একটি বক্তব্য উৎস-প্রবন্ধে উদ্ধৃত হয়েছে। তার মর্ম হলো: সাধারণ মানুষ মনে করে, প্রতিশ্রুত মসীহ এলে তিনি শুধু একজন সাধারণ উম্মতি হবেন; তা নয়, বরং তাঁর মধ্যে মহানবী (সা.)-এর নামের পূর্ণ ব্যাখ্যা প্রকাশিত হবে, তিনি তাঁরই প্রতিচ্ছায়া হবেন, তাই তাঁর আর একজন সাধারণ উম্মতির মধ্যে বিরাট পার্থক্য (আল-খায়রুল কাসীর, পৃষ্ঠা ৭২)।

দেখুন, শত শত বছর আগে একজন বুযুর্গ যে কথা লিখেছেন, তা সূরা আল-জুমুআর ব্যাখ্যার সঙ্গে হুবহু মিলে যায়: প্রতিশ্রুত মসীহ মহানবী (সা.)-এর প্রতিচ্ছায়া।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“মাহদী তো একজন ন্যায়পরায়ণ খলীফা মাত্র, তাঁকে এত বড় করা কেন?”

এখানে কেউ কেউ বলেন, মাহদী হবেন আবু বকর (রা.) বা উমর (রা.)-এর মতো একজন খলীফা। চলুন হাদীসের শব্দ দেখি। হযরত আবু বকর (রা.) ও হযরত উমর (রা.)-এর মর্যাদা অনেক উঁচু, তবু মহানবী (সা.) তাঁদের “আল্লাহর নবী” বলেননি; অথচ আগমনকারী মসীহকে চারবার বলেছেন। মাহদীর হাতে বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও বয়আত করতে বলেছেন, আর আগমনকারী মসীহর কাছে নিজের সালাম পৌঁছে দিতে বলেছেন (আল-মুস্তাদরাক আলাস সহীহাইন)। শব্দগুলো নিজেরাই মর্যাদার মাপ বলে দেয়।

“নবী বললে তো খাতামান নাবিয়্যীনের বিশ্বাস ভেঙে যায়।”

এটি একটি গুরুতর প্রশ্ন, আর এর উত্তরও গুরুত্ব দিয়ে দেওয়া দরকার। প্রথম কথা, “নবীউল্লাহ” শব্দটি আমাদের বানানো নয়; সহীহ মুসলিমে মহানবী (সা.) নিজে বলেছেন। যিনি খাতামান নাবিয়্যীন, তিনিই আগমনকারীকে নবী বলছেন। তাহলে দুটির মধ্যে বিরোধ থাকতে পারে না।

দ্বিতীয় কথা, এই নবুওয়ত কোন ধরনের? আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত The Truth about Ahmadiyyat গ্রন্থে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কোনো নতুন শরীয়ত আনেননি, তিনি স্বাধীন নবীও নন; তাঁর নবুওয়ত সম্পূর্ণভাবে মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের ফল, তাঁরই প্রতিফলন। আয়নায় সূর্যের আলো পড়লে আয়না উজ্জ্বল হয়, কিন্তু আলো সূর্যেরই থাকে। মহানবী (সা.)-এর মোহর এখানে ভাঙে না, বরং তাঁর মোহর লেগেই এই মর্যাদা তৈরি হয়।

“শেষ যুগের মানুষ কি সাহাবীদের সমান হতে পারে?”

বৃষ্টির হাদীসটি আবার মনে করুন: প্রথম ভাগ উত্তম নাকি শেষ ভাগ, জানা যায় না। এটি মহানবী (সা.)-এর নিজের কথা। শেষ ভাগের এই মর্যাদা নিজস্ব কৃতিত্বে নয়, এসেছে মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক দ্বিতীয় আবির্ভাবের কারণে। সূরা আল-জুমুআ বলেছে, শেষ যুগের এই মানুষেরা “তাহাদের সঙ্গে মিলিত” হবে, অর্থাৎ সাহাবীদের সঙ্গে যুক্ত হবে। যে সম্মান কুরআন দিয়েছে, তা অস্বীকার করার অধিকার কারো নেই।

সংক্ষেপে

  1. সূরা আল-জুমুআ (৬২:৩–৪) ও বুখারী ৪৮৯৭ অনুযায়ী প্রতিশ্রুত মসীহর আগমন মহানবী (সা.)-এরই আধ্যাত্মিক দ্বিতীয় আবির্ভাব।
  2. সহীহ মুসলিমে (২৯৩৭) মহানবী (সা.) আগমনকারী মসীহকে চারবার “আল্লাহর নবী” বলেছেন; ইবনে মাজাহতে (৪০৮৪) মাহদীকে “আল্লাহর খলীফা” বলেছেন।
  3. তিরমিযীর হাদীস (২৮৬৯) উম্মতের শেষ ভাগকে প্রথম ভাগের সঙ্গে তুলনা করেছে।
  4. এই নবুওয়ত শরীয়তবিহীন ও মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের প্রতিফলন, তাই খাতামান নাবিয়্যীনের সঙ্গে এর কোনো বিরোধ নেই।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.