একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। শেষ যুগের প্রতিশ্রুত মসীহ পৃথিবীতে এসেছেন। তিনি হাতুড়ি নিয়ে এক গির্জা থেকে আরেক গির্জায় ছুটছেন, ক্রুশ ভাঙছেন। ওদিকে কারখানায় নতুন নতুন ক্রুশ তৈরি হচ্ছে। তিনি জঙ্গলে জঙ্গলে শূকর শিকার করে বেড়াচ্ছেন।
এই ছবি কি আল্লাহর একজন নবীর মর্যাদার সঙ্গে মানায়? অথচ হাদীসের শব্দগুলোকে আক্ষরিক অর্থে নিলে ছবিটা এমনই দাঁড়ায়। চলুন হাদীসটি আবার পড়ি, আর দেখি এর ভেতরে কোন বার্তা লুকিয়ে আছে।
হাদীসটি: পাঁচটি কাজ
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) কসম খেয়ে বলেছেন:
প্রতিটি কাজের ভেতরের অর্থ
১. ন্যায়পরায়ণ বিচারক (হাকাম ও আদল)। শেষ যুগে উম্মত বহু দলে বিভক্ত, প্রতিটি দল নিজের ব্যাখ্যাকে একমাত্র সত্য মনে করে। আল্লাহ এমন একজনকে পাঠাবেন, যিনি এসব মতভেদে আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা দেবেন। হুযূর আনোয়ার (আই.) ২০২০ সালের ২৮ আগস্টের জুমুআর খুতবায় বলেছেন, প্রতিশ্রুত মসীহ (আ.)-কে হাকাম ও আদল হিসেবে পাঠানো হয়েছে, যেন তিনি বিভিন্ন দলের ভুল ব্যাখ্যা আর শাখাগত বিরোধ দূর করে উম্মতকে ঐক্যবদ্ধ করেন।
২. ক্রুশ ভাঙা। ক্রুশ এখানে একটি বিশ্বাসের প্রতীক: ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা গিয়ে মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্ত করেছেন, এই মতবাদ। কাঠের ক্রুশ ভেঙে এই বিশ্বাস ভাঙা যায় না; ভাঙা যায় যুক্তি আর প্রমাণ দিয়ে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কুরআন, হাদীস আর ইতিহাস দিয়ে দেখিয়েছেন, ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা যাননি, বরং আল্লাহ তাঁকে রক্ষা করেছেন এবং তিনি পরে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন। ক্রুশ-মতবাদের ভিত এখানেই ভেঙে পড়ে।
৩. শূকর হত্যা। শূকর কুরআনে অপবিত্রতার প্রতীক। অপবিত্র স্বভাব আর নোংরামিকে যুক্তি, দোয়া আর পবিত্র শিক্ষার মাধ্যমে পরাজিত করাই এর অর্থ। সারা দুনিয়ার শূকর মেরে ফেলা কোনো নবীর মিশন হতে পারে না।
৪. জিযিয়া রহিত করা। জিযিয়া ছিল যুদ্ধের সঙ্গে যুক্ত কর। তা রহিত হওয়ার অর্থ, ধর্মের নামে যুদ্ধের অধ্যায় তাঁর যুগে বন্ধ হবে। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত হাকীকাতুল মাহদী-র অনুবাদে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) স্পষ্ট বলেছেন, যে মাহদী খ্রিষ্টানদের হত্যা করবেন আর ধর্মযুদ্ধ চালাবেন, এমন “গাযী মাহদী”র আগমন তিনি অস্বীকার করেন; সত্যিকারের মাহদী ধর্মযুদ্ধের অবসান ঘটাবেন।
৫. সম্পদ বিলানো, যা কেউ নেবে না। হাদীসের শেষ বাক্যটি পড়ুন: “একটি সিজদা দুনিয়া ও তার সবকিছুর চেয়ে উত্তম হবে।” এই প্রসঙ্গে বোঝা যায়, এখানে আসল সম্পদ হলো আধ্যাত্মিক সম্পদ: কুরআনের জ্ঞান, ঈমানের দৌলত। তিনি তা দুই হাতে বিলাবেন, কিন্তু দুনিয়ার মোহে ডুবে থাকা বেশিরভাগ মানুষ তা নিতে চাইবে না।
তিনি হবেন এই উম্মতেরই একজন
আরেকটি হাদীসে মহানবী (সা.) জিজ্ঞেস করেছেন: “তোমাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন ইবনে মারইয়াম তোমাদের মধ্যে অবতীর্ণ হবেন, আর তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদেরই মধ্য থেকে?” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪৯)।
সহীহ মুসলিমে এই হাদীসের একটি বর্ণনায় শব্দটি আরও স্পষ্ট:
অর্থাৎ আগমনকারী মসীহ নতুন শরীয়ত আনবেন না। তিনি কুরআন আর মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহর অনুসারী হয়ে, এই উম্মতেরই একজন হয়ে নেতৃত্ব দেবেন।
একটি হাদীসে আরও আছে, তিনি বিয়ে করবেন এবং তাঁর সন্তান হবে। বিয়ে করা বা সন্তান হওয়া তো সাধারণ ঘটনা, এটি আলাদা করে চিহ্ন হিসেবে বলার কারণ কী? হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, এর অর্থ আল্লাহ তাঁকে এমন এক পুত্র দেবেন যিনি পুণ্যে পিতার মতো হবেন (আয়না-এ কামালাতে ইসলাম, পৃষ্ঠা ৫৭৮)।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“এত রূপক অর্থ করলে তো হাদীসের যেকোনো অর্থ করা যায়।”
এখানে কেউ কেউ বলেন, হাদীসের সরল অর্থ ছেড়ে দেওয়া বিপজ্জনক। কথাটি ঠিক, বিনা কারণে রূপক অর্থ করা যায় না। কিন্তু এখানে কারণ হাদীসের ভেতরেই আছে। সম্পদ যদি সত্যিই সোনা-রুপা হয়, তাহলে কেউ তা নেবে না কেন? মানুষ তো সোনা পেলে ফেরায় না। আর হাদীস নিজেই বলছে, তখন একটি সিজদা দুনিয়ার চেয়ে দামি হবে। বোঝা যায়, এখানে কথা হচ্ছে আধ্যাত্মিক সম্পদ নিয়ে।
তা ছাড়া একজন নবীর কাজ সম্পর্কে কুরআন বলে, তিনি আয়াত পাঠ করেন, মানুষকে পবিত্র করেন, কিতাব ও হিকমত শেখান (সূরা আল-জুমুআ ৬২:৩)। কাঠ ভাঙা আর পশু শিকার নবুওয়তের এই সংজ্ঞায় পড়ে না। কুরআনের নীতিই আমাদের রূপক অর্থের দিকে নিয়ে যায়।
“মাহদী তো তলোয়ার দিয়ে সবাইকে মুসলমান বানাবেন বলে শুনেছি।”
এমন কিছু বর্ণনা প্রচলিত আছে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) হাকীকাতুল মাহদী-তে এগুলো যাচাই করে দেখিয়েছেন, এ ধরনের বর্ণনা হয় বানোয়াট, নয়তো দুর্বল ও পরস্পরবিরোধী, আর যেগুলো নির্ভরযোগ্য সেগুলোর ঘটনা হয় অতীতে ঘটে গেছে, নয়তো সেগুলোতে বাহ্যিক যুদ্ধের কথাই নেই।
আর কুরআনের ঘোষণা তো চূড়ান্ত: “ধর্মের ব্যাপারে কোন বল প্রয়োগ নাই” (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৭)। কুরআনের বিরুদ্ধে যায় এমন কোনো বর্ণনা মহানবী (সা.)-এর কথা হতে পারে না। যে মাহদী জোর করে মানুষকে মুসলমান বানাবেন, তিনি কুরআনের এই আয়াতই অমান্য করবেন। এমন মাহদী মহানবী (সা.)-এর প্রতিশ্রুত মাহদী নন।
“ক্রুশ তো এখনো আছে, তাহলে ক্রুশ ভাঙা হলো কোথায়?”
ক্রুশ ভাঙা মানে পৃথিবী থেকে সব খ্রিষ্টানকে মুছে ফেলা নয়। এর অর্থ ক্রুশ-মতবাদের যুক্তিগত ভিত ভেঙে দেওয়া। যে যুক্তি একবার ভেঙে যায়, তা আর কখনো আগের মতো দাঁড়াতে পারে না, যদিও কিছু মানুষ অভ্যাসবশত তা ধরে রাখে। মহানবী (সা.)-এর যুগে মূর্তিপূজার যুক্তি ভেঙে গিয়েছিল, তবু আজও পৃথিবীতে মূর্তিপূজা আছে। বিজয় হলো যুক্তির, আর সেই বিজয় শুরু হয়ে গেছে।
সংক্ষেপে
- বুখারী ৩৪৪৮ অনুযায়ী প্রতিশ্রুত মসীহ হবেন ন্যায়পরায়ণ বিচারক; তিনি ক্রুশ ভাঙবেন, শূকর হত্যা করবেন, জিযিয়া রহিত করবেন, সম্পদ বিলাবেন।
- এগুলোর অর্থ: উম্মতের মতভেদের ফয়সালা, ক্রুশ-মতবাদ যুক্তিতে খণ্ডন, অপবিত্রতার পরাজয়, ধর্মযুদ্ধের অবসান আর আধ্যাত্মিক সম্পদ বিতরণ।
- তিনি এই উম্মতেরই একজন, কুরআন ও সুন্নাহ দিয়ে নেতৃত্ব দেবেন (মুসলিম, হাদীস ১৫৫)।
- তলোয়ারধারী মাহদীর ধারণা কুরআনের “ধর্মে বল প্রয়োগ নেই” নীতির বিরোধী।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Beliefs Concerning the Mahdi (The True Nature of the Mahdi) · alislam.org
- The Promised Messiah and Mahdi: Hakam and Adl (Friday Sermon, 28 August 2020) · alislam.org
- Hadith on Marriage and Children of Promised Messiah · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.