ধোঁয়া, পশ্চিমে সূর্যোদয়, মাটির কীট: শেষ যুগের আরও কিছু নিদর্শন

কিয়ামতের আগের নিদর্শনগুলো শুনলে মনে হয় সব একসাথে এক ভয়ংকর দিনে ঘটবে। কিন্তু কুরআনের শব্দ আর মহানবী (সা.)-এর ভাষা খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যায়, এগুলোর অনেকটাই আমাদের চোখের সামনে ঘটে গেছে।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

সহীহ মুসলিমের একটি হাদীসে মহানবী (সা.) কিয়ামতের আগের দশটি নিদর্শন গুনে দিয়েছেন: ধোঁয়া, দাজ্জাল, দাব্বাহ, পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়, ঈসা ইবনে মরিয়মের অবতরণ, ইয়া’জুজ-মা’জুজ, তিনটি ভূমিধস, আর শেষে ইয়েমেন থেকে বের হওয়া আগুন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ২৯০১)।

দাজ্জাল, ইয়া’জুজ-মা’জুজ আর ইবনে মরিয়মের কথা আলাদা লেখায় এসেছে। এখানে বাকি কয়েকটি নিদর্শন একে একে দেখি। আর দেখি, মহানবী (সা.) উম্মতের ভেতরের কোন অবস্থাকে সেই যুগের চিহ্ন বলেছিলেন।

উম্মতের ভেতরের অবস্থা: ধোঁয়াটে কল্যাণ আর দলাদলি

“ধোঁয়া” শব্দটি মহানবী (সা.) নিজেই রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন। হযরত হুযায়ফা ইবনুল ইয়ামান (রা.) বলেন, লোকেরা মহানবী (সা.)-কে কল্যাণের কথা জিজ্ঞেস করত, আর তিনি জিজ্ঞেস করতেন অকল্যাণের কথা, যাতে তা তাঁকে পেয়ে না বসে:

قُلْتُ وَهَلْ بَعْدَ ذَلِكَ الشَّرِّ مِنْ خَيْرٍ قَالَ: نَعَمْ، وَفِيهِ دَخَنٌ. قُلْتُ وَمَا دَخَنُهُ قَالَ: قَوْمٌ يَهْدُونَ بِغَيْرِ هَدْيِي، تَعْرِفُ مِنْهُمْ وَتُنْكِرُ
আমি বললাম, সেই অকল্যাণের পর কি আবার কল্যাণ আসবে? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, তবে তাতে ধোঁয়া থাকবে।” আমি বললাম, তার ধোঁয়া কী? তিনি বললেন, “এমন এক দল, যারা আমার পথ ছাড়া অন্য পথে মানুষকে চালাবে; তাদের কিছু কাজ তুমি ভালো দেখবে, কিছু মন্দ।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৭০৮৪; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ইমারাহ, হাদীস ১৮৪৭

এই একই হাদীসের শেষে হুযায়ফা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, তখন কী করব? মহানবী (সা.) বললেন, “মুসলমানদের জামাত আর তাদের ইমামকে আঁকড়ে থাকবে।” আর যদি জামাত বা ইমাম না থাকে? তাহলে সব দল থেকে দূরে থাকবে।

কুরআনও এই দলাদলির ছবি এঁকেছে:

فَتَقَطَّعُوا أَمْرَهُمْ بَيْنَهُمْ زُبُرًا ۖ كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ
“কিন্তু লোকেরা তাহাদের (ধর্মীয়) বিষয়কে নিজেদের মধ্যে খণ্ড-বিখণ্ড করিয়া ফেলিয়াছে (অর্থাৎ তাহারা দলে দলে বিভক্ত হইয়া গিয়াছে); যাহা তাহাদের নিকট আছে উহা লইয়া প্রত্যেক দল গর্ব করিতেছে।”
সূরা আল-মু’মিনূন ২৩:৫৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২৩:৫৩।

মহানবী (সা.) বলেছেন, বনী ইসরাঈল বাহাত্তর দলে ভাগ হয়েছিল, আর তাঁর উম্মত ভাগ হবে তিয়াত্তর দলে; এক দল ছাড়া সবাই আগুনে। সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, সেই দল কোনটি? তিনি বললেন, “যে পথে আমি আর আমার সাহাবীরা আছি” (জামে তিরমিযী, কিতাবুল ঈমান, হাদীস ২৬৪১)।

আর একটি বর্ণনায় এসেছে, মানুষের উপর এমন সময় আসবে যখন ইসলামের শুধু নাম আর কুরআনের শুধু অক্ষর বাকি থাকবে; মসজিদ জাঁকজমকপূর্ণ হবে কিন্তু হেদায়াতশূন্য। মাওলানা এ. ইউ. কালীম এই বর্ণনাটি উদ্ধৃত করে দেখিয়েছেন, আজকের মুসলমানদের অবস্থা ঠিক এই ছবির সাথে মেলে। আজ মুসলিম বিশ্বের বিভক্তি, দলে দলে কাফির ফতোয়া আর এক ইমামের অভাব, সবই চোখের সামনে।

পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়

সহীহ বুখারীতে আছে, পশ্চিম দিক থেকে সূর্য না ওঠা পর্যন্ত কিয়ামত হবে না (সহীহ বুখারী, কিতাবুর রিকাক, হাদীস ৬৫০৬)। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, আমরা এর উপর ঈমান রাখি; তবে কাশফে তাঁকে এর একটি অর্থ জানানো হয়েছে: যে পশ্চিমা দেশগুলো দীর্ঘকাল কুফর আর ভ্রান্তির অন্ধকারে ঢাকা ছিল, সেগুলো সত্যের সূর্যে আলোকিত হবে এবং ইসলামের অংশ পাবে। তিনি নিজেকে স্বপ্নে লন্ডনে এক মঞ্চে দাঁড়িয়ে ইংরেজিতে যুক্তি দিয়ে ইসলামের সত্য তুলে ধরতে দেখেছিলেন (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৭৬-৩৭৭)।

আজ ইউরোপ, আমেরিকা আর আফ্রিকার বহু দেশে আহমদীয়া মুসলিম জামাতের মসজিদ থেকে আযান ওঠে। খলীফাতুল মসীহ্ আজ লন্ডন থেকেই সারা বিশ্বে ইসলামের বাণী পৌঁছে দিচ্ছেন।

✦

দাব্বাতুল আরদ: মাটির কীট

কুরআনে আছে:

وَإِذَا وَقَعَ الْقَوْلُ عَلَيْهِمْ أَخْرَجْنَا لَهُمْ دَابَّةً مِنَ الْأَرْضِ تُكَلِّمُهُمْ أَنَّ النَّاسَ كَانُوا بِآيَاتِنَا لَا يُوقِنُونَ
“এবং যখন তাহাদের বিরুদ্ধে (পূর্ববর্ণিত) কথা পূর্ণ হইয়া যাইবে, তখন আমরা তাহাদের জন্য ভূমি হইতে এক প্রকার কীট বাহির করিব, যাহা তাহাদিগকে জখম করিবে এই কারণে যে, মানুষ আমাদের নিদর্শনসমূহের উপর বিশ্বাস করিত না।”
সূরা আন-নামল ২৭:৮৩

“দাব্বাতুল আরদ” কী, তা কুরআন নিজেই আরেক জায়গায় বুঝিয়ে দিয়েছে। হযরত সুলায়মান (আ.)-এর মৃত্যুর খবর মানুষকে জানিয়েছিল “মাটির একটি পোকা, যাহা তাহার (রাজ-) দণ্ডটি খাইতেছিল” (সূরা সাবা ৩৪:১৫)। সেখানেও একই শব্দ: দাব্বাতুল আরদ। আর তুকাল্লিমুহুম শব্দের এক অর্থ “তাদের জখম করবে”, আহমদীয়া অনুবাদে ঠিক এই অর্থই নেওয়া হয়েছে।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আল্লাহর কাছ থেকে খবর পেয়ে আগেই প্লেগের সতর্কবাণী প্রকাশ করেছিলেন। তারপর ভারতবর্ষে প্লেগ ভয়াবহভাবে ছড়িয়ে পড়ে, লক্ষ লক্ষ মানুষ মারা যায়। ১৯০৭ সালে তিনি বলেছিলেন, এই দাব্বাতুল আরদ, অর্থাৎ মাটি থেকে বের হওয়া জীবাণু, হলো প্লেগবাহী এই মাছি-পোকা; তাকলীম মানে কামড়ানো, আর সেই কামড়ই মানুষকে মারছে (আল-বদর, ২৫ এপ্রিল ১৯০৭; মালফূযাত, ৯ম খণ্ড)।

তিনি আরও বলেছেন, কুরআন আগেই জানিয়েছিল এই যুগে প্লেগ ব্যাপকভাবে ছড়াবে: “এবং কোন জনপদ নাই যাহাকে আমরা কিয়ামত দিবসের পূর্বেই ধ্বংস করিব না অথবা উহাকে কঠোর আযাব দিব না” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:৫৯)।

ভূমিকম্প আর অন্যান্য নিদর্শন

মহানবী (সা.) বলেছেন, কিয়ামত হবে না যতক্ষণ না জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হয়, ভূমিকম্প বেড়ে যায়, সময় কাছাকাছি হয়ে আসে, ফিতনা প্রকাশ পায় আর হত্যা বেড়ে যায় (সহীহ বুখারী, কিতাবুল ইস্তিসকা, হাদীস ১০৩৬)।

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) নিজের যুগে পূর্ণ হওয়া নিদর্শনগুলো এক জায়গায় গুনে দিয়েছেন: রমযানে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ হয়েছে, ধূমকেতু দেখা দিয়েছে, ভূমিকম্প হয়েছে, মহামারী ছড়িয়েছে, খ্রিষ্টধর্ম জোরেশোরে পৃথিবীতে ছড়িয়েছে, আর যেমন লেখা ছিল, তাঁর বিরোধিতাও হয়েছে তীব্র (কিতাবুল বারিয়্যাহ, পৃষ্ঠা ২৫৯-২৬০)।

তিনটি ভূমিধসের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা নিয়ে তাড়াহুড়ো করার দরকার নেই। মূল কথা হলো, মহানবী (সা.) যে নিদর্শনগুলোর কথা বলেছিলেন, তার বড় একটি অংশ একই যুগে, একই সময়ে, একজন দাবিকারকের উপস্থিতিতে প্রকাশ পেয়েছে। নিদর্শন তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা কারও সত্যতার পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

পশ্চিমে সূর্যোদয় তো আক্ষরিক ঘটনা, তখন তওবার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে?

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আক্ষরিক ঘটনাকে অস্বীকার করেননি; তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, “আমরা এর উপর ঈমান রাখি।” তিনি শুধু এর আধ্যাত্মিক দিকটি তুলে ধরেছেন, যা তাঁকে কাশফে দেখানো হয়েছিল। মহানবী (সা.) নিজে সূর্য, চাঁদ, নক্ষত্র রূপক অর্থে বহুবার ব্যবহার করেছেন। একটি নিদর্শনের আধ্যাত্মিক পূর্ণতা চোখের সামনে ঘটছে: পশ্চিমের মানুষ ইসলাম গ্রহণ করছে, আর সেখান থেকে ইসলামের বাণী সারা পৃথিবীতে ছড়াচ্ছে।

দাব্বাতুল আরদ তো এক বিশাল অদ্ভুত প্রাণী, যার সাথে মূসা (আ.)-এর লাঠি আর সুলায়মান (আ.)-এর আংটি থাকবে?

এই বর্ণনাটি সুনান ইবনে মাজাহতে আছে (কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৬৬), তবে হাদীস বিশারদরা এর সনদকে দুর্বল বলেছেন। কুরআনের শব্দ কিন্তু স্পষ্ট: “ভূমি হইতে এক প্রকার কীট”। আর একই শব্দ সূরা সাবায় এসেছে কাঠ খাওয়া পোকার অর্থে। দুর্বল বর্ণনার কল্পিত ছবির চেয়ে কুরআনের নিজের ব্যাখ্যাই অগ্রাধিকার পাবে। প্লেগ ঠিক তা-ই করেছে, যা আয়াতে বলা হয়েছে: মাটি থেকে বের হয়ে মানুষকে কামড়েছে, আর মানুষকে আল্লাহর নিদর্শনের দিকে মনোযোগ দিতে বাধ্য করেছে।

ভূমিকম্প তো সব যুগেই হয়েছে, এটা আবার নিদর্শন হয় কীভাবে?

হাদীসের শব্দ “ওয়া তাকছুরায যালাযিল”, ভূমিকম্প বেড়ে যাবে। একটি ভূমিকম্প নিদর্শন নয়; নিদর্শন হলো বহু নিদর্শনের একসাথে, একটি নির্দিষ্ট যুগে, একজন দাবিকারকের সময়ে প্রকাশ পাওয়া। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ভূমিকম্পের ভবিষ্যদ্বাণী আগে থেকেই প্রকাশ করেছিলেন। আগে বলা কথা পরে মিলে গেলে সেটিই নিদর্শন।

সংক্ষেপে

  1. মহানবী (সা.) “ধোঁয়া” শব্দটি নিজেই রূপক অর্থে ব্যবহার করেছেন: কল্যাণের সাথে মেশানো বিভ্রান্তি আর দলাদলি; প্রতিকার জামাত ও ইমামকে আঁকড়ে থাকা।
  2. পশ্চিম থেকে সূর্যোদয়ের আধ্যাত্মিক অর্থ, পশ্চিমা দেশগুলোতে ইসলামের আলো ছড়ানো, আজ বাস্তবে দেখা যাচ্ছে।
  3. কুরআন দাব্বাতুল আরদকে “ভূমি থেকে বের হওয়া কীট” বলেছে; হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) প্লেগের মাধ্যমে এর পূর্ণতা দেখিয়েছেন।
  4. ভূমিকম্প, মহামারী, গ্রহণ আর ধূমকেতু একই যুগে, একজন দাবিকারকের সময়ে প্রকাশ পেয়েছে।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.