একদিন কয়েকজন সাহাবী বসে কিয়ামত নিয়ে আলোচনা করছিলেন। মহানবী (সা.) উপরের ঘর থেকে তাঁদের দিকে তাকালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, কী নিয়ে কথা বলছ? তাঁরা বললেন, কিয়ামতের কথা।
তখন তিনি একটি তালিকা দিলেন। হযরত হুযায়ফা ইবনে আসীদ আল-গিফারী (রা.) সেই কথাগুলো বর্ণনা করেছেন:
এই তালিকায় ঈসা ইবনে মরিয়মের অবতরণ, অর্থাৎ মসীহ্ মওউদের আগমনও একটি নিদর্শন। তাই প্রশ্ন জাগে, আমরা কীভাবে বুঝব যে সেই যুগ এসে গেছে?
কিয়ামত দেখার একটি জানালা
মহানবী (সা.) নিজেই এর একটি পথ দেখিয়ে গেছেন। হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেছেন:
চলুন, প্রথম সূরাটি খুলি। সূরা আত-তাকভীরের শুরুতে একের পর এক “যখন” দিয়ে কিছু ঘটনার কথা বলা হয়েছে:
গর্ভবতী উটনী কেন কিয়ামতের দিনে?
একটু থেমে ভাবুন। যদি এগুলো শুধু কিয়ামতের দিনের দৃশ্য হয়, যেদিন সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, তাহলে সেদিন গর্ভবতী উটনী বেকার পড়ে থাকার কথা আসে কীভাবে? বই-পুস্তক ছড়িয়ে দেওয়ার কথা কেন?
হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ঠিক এই প্রশ্নটিই তুলেছেন। তিনি বলেছেন, যারা মনে করে এসব আয়াত কিয়ামতের দিনের কথা বলছে, তারা ভেবে দেখে না যে তখন উটনী গর্ভবতী থাকবে কীভাবে। এই আয়াতগুলো বলছে, চারদিকে নদী-খাল বইয়ে দেওয়া হবে আর প্রচুর বই ছাপা হবে; তাই এসব নিদর্শন সেই যুগের, যার কথা হচ্ছে, অর্থাৎ মসীহের যুগের (মালফূযাত, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৯-৫০)।
দশ মাসের গর্ভবতী উটনী ছিল আরবের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ আর প্রধান বাহন। তা বেকার হয়ে যাবে, কারণ মানুষ এমন যানবাহন পাবে যার সামনে উট আর কাজে আসবে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) বলেছেন, এখানে রেলগাড়ির যুগের দিকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
হাদীসেও একই কথা, একই মানুষের সাথে
সবচেয়ে চমৎকার বিষয় হলো, মহানবী (সা.) উট বেকার হওয়ার কথা বলেছেন ঠিক ইবনে মরিয়মের আগমনের সাথে মিলিয়ে। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন:
কুরআন বলছে উটনী বেকার হবে; হাদীস বলছে সেটা হবে ইবনে মরিয়মের যুগে। দুটি কথা একে অপরকে ব্যাখ্যা করছে।
এবার বাকি আলামতগুলোর দিকে তাকান। খলীফাতুল মসীহ্ পঞ্চম হযরত মির্যা মসরূর আহমদ (আই.) এক খুতবায় এগুলোর ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন: বন্য প্রাণী একত্র করে চিড়িয়াখানা বানানো হয়েছে; সাগরে সাগরে খাল কেটে যুক্ত করা হয়েছে; যোগাযোগ এত সহজ হয়েছে যে মুহূর্তেই পৃথিবীর অন্য প্রান্তে কথা পৌঁছে যায়, যেন সব জাতি এক জায়গায় জড়ো হয়েছে; যে নারীদের একসময় নির্মমভাবে হত্যা করা হতো, তাদের অধিকারের প্রশ্ন আজ সারা বিশ্বে উঠেছে; আর বই, পত্রিকা ও জ্ঞান ছড়িয়ে পড়েছে পৃথিবীজুড়ে।
এগুলোর একটিও মহানবী (সা.)-এর যুগে ছিল না। প্রায় সবগুলোই শুরু হয়েছে উনিশ শতকে, রেল, ছাপাখানা আর খালের যুগে। ঠিক সেই সময়েই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) দাবি করলেন যে আল্লাহ্ তাঁকে মসীহ্ মওউদ ও ইমাম মাহদী করে পাঠিয়েছেন।
হুযায়ফা (রা.)-এর হাদীসে বাকি যে নিদর্শনগুলো আছে, যেমন দাজ্জাল, ইয়া’জুজ-মা’জুজ, ধোঁয়া, দাব্বাতুল আরদ ও পশ্চিমে সূর্যোদয়, সেগুলো নিয়ে আলাদা আলাদা লেখায় বিস্তারিত আলোচনা আছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
সূরা তাকভীর তো কিয়ামতের দিনের বর্ণনা, এখানে দুনিয়ার যুগ আসে কীভাবে?
সূরাটির শেষে অবশ্যই চূড়ান্ত হিসাবের কথা আছে: “তখন প্রত্যেক আত্মা যাহা সে হাযির করিয়াছে উহা জানিতে পারিবে” (সূরা আত-তাকভীর ৮১:১৫)। কিন্তু তার আগের আয়াতগুলোতে এমন সব ঘটনা আছে, যা দুনিয়ার স্বাভাবিক জীবন চলমান না থাকলে ঘটতেই পারে না: গর্ভবতী উটনী, বইপত্র ছাপা, মানুষের মেলামেশা, মেয়েশিশু হত্যার বিচার চাওয়া। মহানবী (সা.)-ও বলেছেন, এই সূরা পড়লে কিয়ামত যেন চোখের সামনে দেখা যায়। অর্থাৎ এর আগের নিদর্শনগুলো এত স্পষ্ট হবে যে কিয়ামত কাছে চলে এসেছে বলে মনে হবে।
উট তো এখনও আছে, মরুভূমিতে মানুষ চড়েও?
ভবিষ্যদ্বাণীর ভাষাটা লক্ষ্য করুন: “সেগুলোতে চড়ে কেউ যাতায়াত করবে না”। অর্থাৎ উট দূরযাত্রার বাহন থাকবে না। একসময় মক্কা থেকে সিরিয়া বা ইয়েমেনের বাণিজ্য কাফেলা, এমনকি হজ্জের কাফেলাও চলত উটের পিঠে। আজ হাজীরা আসেন বিমানে, বাসে, ট্রেনে। উট পৃথিবী থেকে হারায়নি, কিন্তু যাতায়াতের প্রধান বাহন হিসেবে তার যুগ শেষ।
এসব তো বিজ্ঞানের অগ্রগতি, এর সাথে মসীহের সম্পর্ক কী?
সম্পর্কটা আমরা জুড়ে দিইনি, মহানবী (সা.) নিজেই জুড়েছেন। সহীহ মুসলিমের যে হাদীস উপরে দেখলাম, সেখানে একই বাক্যে ইবনে মরিয়মের অবতরণ আর উটনী পরিত্যক্ত হওয়ার কথা আছে। চৌদ্দশো বছর আগে মরুভূমির মাঝে বসে কেউ নিজে থেকে বলতে পারত না যে উট একদিন বেকার হবে। নিদর্শন পূর্ণ হয়েছে, আর সেই সময়েই একজন দাবিকারক উপস্থিত। দুটি একসাথে মিলে যাওয়াই নিদর্শনের অর্থ।
সংক্ষেপে
- সহীহ মুসলিমে কিয়ামতের আগের দশটি নিদর্শনের একটি হলো ঈসা ইবনে মরিয়মের আগমন।
- মহানবী (সা.) কিয়ামতের ছবি দেখতে সূরা তাকভীর, ইনফিতার ও ইনশিকাক পড়তে বলেছেন (তিরমিযী ৩৩৩৩)।
- সূরা তাকভীরের গর্ভবতী উটনী বেকার হওয়া, বই ছড়ানো, মানুষ একত্র হওয়া কিয়ামতের দিনের নয়, এই দুনিয়ার এক যুগের নিদর্শন।
- সহীহ মুসলিমে উটনী পরিত্যক্ত হওয়ার কথা ইবনে মরিয়মের আগমনের সাথেই বলা হয়েছে; আর আমাদের যুগে তা অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছে।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.