১৯০৮ সালের মে মাস। লাহোর শহর। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তখন সেখানে অবস্থান করছেন। ২০ মে তাঁর ওপর একটি ইলহাম হলো:
“আর-রাহীলু সুম্মার রাহীল, ওয়াল মাওতু কারীব”, অর্থাৎ যাত্রার সময়, আবারও যাত্রার সময়, আর মৃত্যু নিকটে।
ছয় দিন পর, ২৬ মে ১৯০৮ সকাল আনুমানিক সাড়ে দশটায়, পরিবার আর সাহাবীদের মাঝে তিনি আল্লাহর কাছে ফিরে গেলেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এই ঘটনা দিয়েই আজকের আলোচনা শুরু, কারণ মহানবী (সা.)-এর হাদীসে প্রতিশ্রুত মসীহর মৃত্যু আর অবস্থানকাল নিয়েও কথা আছে।
প্রথম শিক্ষা: আগমনকারী মসীহও মারা যাবেন
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) আগমনকারী ঈসার কথা বলতে গিয়ে বলেছেন:
খেয়াল করুন, এখানে “ইউতাওয়াফফা” শব্দটি এসেছে, যার অর্থ মৃত্যু হবে, আর এরপরই জানাযার কথা। আগমনকারী মসীহ কোনো অমর সত্তা নন। অন্য সব মানুষের মতো তিনিও নির্ধারিত সময় কাজ করে আল্লাহর কাছে ফিরে যাবেন। কুরআনের সাধারণ নিয়মও তা-ই: “অতঃপর তিনি তাহাকে মৃত্যু দান করেন এবং তাহাকে কবর দেন” (সূরা আবাসা ৮০:২২)।
সাত, নয়, চল্লিশ না পঁয়তাল্লিশ?
এবার অবস্থানকালের সংখ্যাগুলো পাশাপাশি রাখি।
সুনান ইবনে মাজাহতে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর বর্ণনা: মাহদী আমার উম্মতে থাকবেন, কম হলে সাত, নইলে নয় (কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৮৩)। জামে তিরমিযীতে একই সাহাবীর বর্ণনায় আছে পাঁচ, সাত বা নয়, আর বর্ণনাকারী যায়েদ নিজেই বলেছেন সংখ্যা নিয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল (হাদীস ২২৩২)। আবু দাউদের যে বর্ণনায় সাত বছরের কথা আছে, তার শেষে ইমাম আবু দাউদ (রহ.) নিজেই লিখেছেন, কেউ কেউ নয় বছর বলেছেন, কেউ সাত (হাদীস ৪২৮৬)।
অন্যদিকে আগমনকারী ঈসা সম্পর্কে আবু দাউদে চল্লিশ বছর (হাদীস ৪৩২৪), আর মিশকাতুল মাসাবীহের একটি বর্ণনায় পঁয়তাল্লিশ বছর।
এতগুলো ভিন্ন সংখ্যা দেখে একটি কথা পরিষ্কার: বর্ণনাকারীরা নিজেরাই নিশ্চিত ছিলেন না, আর এই সংখ্যাগুলোকে ঘড়ি ধরে মাপার হিসাব হিসেবে নেওয়া যায় না। হাদীসের আসল বার্তা হলো, তিনি একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পাবেন, সেই মেয়াদে তাঁর কাজ সম্পন্ন হবে, তারপর তিনি মৃত্যুবরণ করবেন।
চল্লিশ বছরের মিশন
আলইসলাম ডট অর্গে প্রতিশ্রুত মসীহর চিহ্নগুলোর তালিকায় একটি চিহ্ন হলো, তাঁর মিশনের মেয়াদ হবে চল্লিশ বছর। একই প্রবন্ধে উল্লেখ আছে, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ১৮৩৫ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৯০৮ সালে ইন্তেকাল করেন।
আলইসলাম ডট অর্গের সংক্ষিপ্ত জীবনীতে ১৮৬৮/৬৯ সালে তাঁর ওপর হওয়া একটি ইলহামের কথা আছে। সেখান থেকে ১৯০৮ সাল পর্যন্ত হিসাব করলে প্রায় চল্লিশ বছর দাঁড়ায়। অর্থাৎ আল্লাহর সঙ্গে কথোপকথনের এই দীর্ঘ যাত্রা প্রায় চল্লিশ বছর ধরে চলেছে, আর তারপর আল্লাহ নিজেই ইলহামের মাধ্যমে জানিয়ে দিয়েছেন যে যাত্রার সময় হয়েছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“হাদীসে আছে তিনি মহানবী (সা.)-এর কবরে দাফন হবেন। মির্যা সাহেব তো সেখানে দাফন হননি।”
এখানে কেউ কেউ মিশকাতের একটি বর্ণনা পেশ করেন। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.)-এর সূত্রে তাতে আছে, ঈসা ইবনে মারইয়াম পৃথিবীতে আসবেন, বিয়ে করবেন, তাঁর সন্তান হবে, পঁয়তাল্লিশ বছর থাকবেন, তারপর মারা যাবেন এবং “আমার সঙ্গে আমার কবরে” দাফন হবেন (মিরকাতুল মাফাতীহ শরহে মিশকাতুল মাসাবীহ, কিতাবুল ফিতান, বাব নুযূলে ঈসা, হাদীস ৫৫০৮)।
চলুন শব্দটি মন দিয়ে পড়ি: “আমার কবরের পাশে” নয়, “আমার সঙ্গে আমার কবরে”। মহানবী (সা.)-এর পবিত্র কবর খুঁড়ে সেখানে অন্য কাউকে দাফন করার কথা কোনো মুসলমান কল্পনাও করতে পারেন না। তাই আক্ষরিক অর্থ এখানে অসম্ভব। আলইসলাম ডট অর্গের ব্যাখ্যা অনুযায়ী এটি ইঙ্গিত করে যে তাঁর মৃত্যু মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর সঙ্গে গভীরভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে, আর পরকালে তিনি তাঁরই সঙ্গে থাকবেন।
আর বাস্তবেও তা-ই হয়েছে। দুজনেরই শেষ অসুস্থতায় পুরোনো রোগ বেড়ে গিয়েছিল, দুজনেই দুর্বলতার কারণে ঘরেই প্রয়োজন সারতেন, দুজনেরই শেষ মুহূর্ত কেটেছে আল্লাহর যিকরে, আর দুজনেই পরিবার ও সাহাবীদের মাঝে ইন্তেকাল করেছেন।
“মাহদী তো সাত বছর রাজত্ব করবেন, পুরো দুনিয়ায় ইসলাম প্রতিষ্ঠা করবেন; তা তো হয়নি।”
একটু ভাবুন। মহানবী (সা.), যিনি সর্বশ্রেষ্ঠ নবী, তেইশ বছরের নবুওয়তে আরব উপদ্বীপে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছেন; সারা পৃথিবীতে ইসলাম ছড়িয়েছে তাঁর পরে, তাঁর খলীফা আর অনুসারীদের মাধ্যমে। কোনো মুসলমান কি বিশ্বাস করতে পারেন যে মহানবী (সা.)-এর একজন অনুসারী সাত বছরে তা করে ফেলবেন, যা মহানবী (সা.) নিজের জীবনে করেননি?
আল্লাহর নিয়ম হলো, নবীর মাধ্যমে বীজ বোনা হয়, আর তাঁর পরে তাঁর খিলাফতের মাধ্যমে সেই বীজ বড় গাছে পরিণত হয়। প্রতিশ্রুত মসীহর বেলাতেও তা-ই ঘটছে।
“তাঁর মৃত্যু নিয়ে নানা অপমানজনক কথা শোনা যায়।”
বিরোধীদের পক্ষ থেকে তাঁর মৃত্যু নিয়ে কিছু অভিযোগ প্রচারিত হয়, যেমন তিনি কলেরায় মারা গেছেন। আলইসলাম ডট অর্গের প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, তাঁর মৃত্যু হয়েছিল আমাশয়ে, যা চিকিৎসকের সনদেও লেখা আছে, কলেরায় নয়। তিনি লাহোরে ডা. সৈয়দ মুহাম্মদ হুসাইন শাহ সাহেবের বাড়িতে ইন্তেকাল করেন। আর মৃত্যুর ছয় দিন আগেই আল্লাহ তাঁকে ইলহামে জানিয়ে দিয়েছিলেন যে মৃত্যু নিকটে। যিনি নিজের মৃত্যুর খবর আগেই আল্লাহর কাছ থেকে পান, তাঁর মৃত্যু অপমানের নয়, বরং আল্লাহর ভালোবাসার নিদর্শন।
সংক্ষেপে
- আবু দাউদের হাদীস (৪৩২৪) অনুযায়ী আগমনকারী মসীহ নির্দিষ্ট সময় পৃথিবীতে থেকে মৃত্যুবরণ করবেন, আর মুসলমানরা তাঁর জানাযা পড়বে।
- অবস্থানকাল নিয়ে বর্ণনাগুলোতে সাত, নয়, চল্লিশ, পঁয়তাল্লিশ, নানা সংখ্যা আছে; বর্ণনাকারীরা নিজেরাই সন্দেহ প্রকাশ করেছেন।
- হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ইলহামের যাত্রা প্রায় চল্লিশ বছর চলেছে; তিনি ২৬ মে ১৯০৮ লাহোরে ইন্তেকাল করেন।
- “মহানবী (সা.)-এর কবরে দাফন” আক্ষরিক অর্থে অসম্ভব; এর অর্থ মৃত্যুতে ও পরকালে তাঁর সঙ্গে গভীর সাদৃশ্য ও নৈকট্য।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Did Hazrat Mirza Ghulam Ahmad die an objectionable death? · alislam.org
- The Promised Messiah · alislam.org
- A Life Sketch of the Promised Messiah · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.