ইমাম মাহদী কোন বংশ থেকে আসবেন?

কোনো হাদীস বলে ফাতেমা (রা.)-এর বংশ, কোনোটা বলে আহলে বাইত, আর বুখারী বলে পারস্যের মানুষ। এই আপাত-জট খুলে দেয় কুরআনের একটি সহজ নীতি: আসল আত্মীয়তা রক্তের নয়, অনুসরণের।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

মদীনায় একদিন সাহাবীরা মহানবী (সা.)-কে ঘিরে বসে আছেন। এমন সময় সূরা আল-জুমুআ নাযিল হলো। একটি আয়াতে বলা হলো, ভবিষ্যতের “অন্য লোকেদের” মধ্যেও তিনি আবির্ভূত হবেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, “হে আল্লাহর রসূল, এরা কারা?”

মহানবী (সা.) চুপ রইলেন। আবু হুরায়রা (রা.) আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর আবার। তৃতীয়বারে মহানবী (সা.) পাশে বসা এক অনারব সাহাবীর কাঁধে হাত রাখলেন। তিনি পারস্যের মানুষ, হযরত সালমান ফারসী (রা.)।

সালমানের কাঁধে রাখা হাত

তারপর মহানবী (সা.) যে কথা বললেন, তা সহীহ বুখারীতে সংরক্ষিত আছে:

لَوْ كَانَ الإِيمَانُ عِنْدَ الثُّرَيَّا لَنَالَهُ رِجَالٌ ـ أَوْ رَجُلٌ ـ مِنْ هَؤُلاَءِ
“ঈমান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রপুঞ্জের কাছেও চলে যায়, তবুও এদের মধ্য থেকে কিছু মানুষ, অথবা একজন মানুষ, তা পেয়ে যাবে।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, সূরা আল-জুমুআ, হাদীস ৪৮৯৭

আর যে আয়াতের ব্যাখ্যায় এ কথা বলা হলো, সেটি এই:

وَّاٰخَرِیۡنَ مِنۡہُمۡ لَمَّا یَلۡحَقُوۡا بِہِمۡ
“এবং (তিনি তাহাকে আবির্ভূত করিবেন) তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও যাহারা এখন পর্যন্ত তাহাদের সঙ্গে মিলিত হয় নাই।…”
সূরা আল-জুমুআ ৬২:৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬২:৩।

অর্থাৎ শেষ যুগে, যখন ঈমান পৃথিবী থেকে যেন আকাশে উঠে যাবে, তখন তা ফিরিয়ে আনবেন পারস্য বংশের একজন মানুষ। হুযূর আনোয়ার (আই.) ২০২৩ সালের ২৪ মার্চের জুমুআর খুতবায় এই আয়াত ও হাদীস ব্যাখ্যা করে বলেছেন, সেই মানুষ হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.), যিনি সত্যিই পারস্য বংশোদ্ভূত ছিলেন।

“আমার মধ্য থেকে”, “আহলে বাইত থেকে”, “ফাতেমার বংশ থেকে”

এবার অন্য হাদীসগুলো দেখা যাক। সুনান আবু দাউদে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.)-এর বর্ণনায় মহানবী (সা.) বলেছেন: “আল-মাহদী মিন্নী”, অর্থাৎ মাহদী আমার মধ্য থেকে হবেন (কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮৫)।

সুনান ইবনে মাজাহতে হযরত আলী (রা.)-এর বর্ণনায় আছে:

الْمَهْدِيُّ مِنَّا أَهْلَ الْبَيْتِ يُصْلِحُهُ اللَّهُ فِي لَيْلَةٍ
“মাহদী আমাদের মধ্য থেকে, আহলে বাইতের একজন। আল্লাহ এক রাতের মধ্যে তাঁকে (দায়িত্বের) যোগ্য করে তুলবেন।”
সুনান ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৮৫

আর হযরত উম্মে সালামা (রা.)-এর বর্ণনায় আছে: “মাহদী আমার পরিবার থেকে, ফাতেমার সন্তানদের মধ্য থেকে” (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল মাহদী, হাদীস ৪২৮৪; সুনান ইবনে মাজাহ, হাদীস ৪০৮৬)।

প্রথম দেখায় মনে হতে পারে, এগুলো পারস্যের হাদীসের সঙ্গে মেলে না। একজন মানুষ একসঙ্গে পারসিক আর ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর হন কীভাবে? এই জট খোলে কুরআনের একটি নীতি।

✦

কুরআনের নীতি: আত্মীয়তা অনুসরণে

হযরত নূহ (আ.)-এর নিজের ছেলে যখন ডুবে যাচ্ছিল, তিনি আল্লাহকে বললেন, সে তো আমার পরিবারের। আল্লাহ উত্তর দিলেন:

قَالَ یٰنُوۡحُ اِنَّہٗ لَیۡسَ مِنۡ اَہۡلِکَ ۚ اِنَّہٗ عَمَلٌ غَیۡرُ صَالِحٍ
“তিনি বলিলেন, ‘হে নূহ! সে নিশ্চয় তোমার পরিবারভুক্ত নহে, নিশ্চয় সে অতি অসৎকর্মপরায়ণ।…’”
সূরা হূদ ১১:৪৭

রক্তের সন্তান, তবু আল্লাহর দৃষ্টিতে “পরিবারভুক্ত নয়”। উল্টো দিকটি বলেছেন হযরত ইবরাহীম (আ.):

فَمَنۡ تَبِعَنِیۡ فَاِنَّہٗ مِنِّیۡ
“…অতএব যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করে সে নিশ্চয় আমার সহিত সম্পৃক্ত…”
সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৭

আরবি শব্দটি “মিন্নী”, ঠিক সেই শব্দ যা মাহদীর হাদীসে এসেছে: “আল-মাহদী মিন্নী”। কুরআন নিজেই শিখিয়ে দিচ্ছে, “আমার মধ্য থেকে” মানে যে আমার পথে চলে। আর পবিত্র কুরআন বলেছে, মহানবী (সা.)-এর পত্নীগণ মুমিনদের মা (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৭)। অর্থাৎ আধ্যাত্মিক অর্থে প্রত্যেক সত্যিকারের মুমিন সেই পরিবারেরই সন্তান।

এবার সব হাদীস এক সুতোয় গাঁথা যায়। প্রতিশ্রুত মাহদী রক্তে পারস্যের মানুষ, যেমন বুখারী বলেছে। আর আধ্যাত্মিকভাবে তিনি মহানবী (সা.)-এর সবচেয়ে কাছের সন্তান, আহলে বাইতেরই একজন, কারণ তিনি তাঁর পূর্ণ অনুসারী।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“ফাতেমা (রা.)-এর বংশের হাদীস তো সনদের দিক থেকে মজবুত, একে রূপক বলবেন কেন?”

এখানে কেউ কেউ বলেন, আবু দাউদের এই হাদীসকে শায়খ আলবানীসহ অনেকে সহীহ বলেছেন। কথাটি সত্য, আর আমরা হাদীসটি অস্বীকার করছি না। প্রশ্ন হলো এর অর্থ নিয়ে।

লক্ষ করুন, মাহদীর বংশ নিয়ে বর্ণনাগুলো এক রকম নয়। কোথাও “আমার মধ্য থেকে”, কোথাও “আহলে বাইত থেকে”, কোথাও “ফাতেমার সন্তান থেকে”, আর বুখারীতে “পারস্যের মানুষ”। কোনো কোনো বর্ণনায় মহানবী (সা.)-এর চাচা হযরত আব্বাস (রা.)-এর বংশের কথাও এসেছে (কানযুল উম্মাল, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৪১)। সবগুলো আক্ষরিক অর্থে নিলে একজন মানুষকে একসঙ্গে কয়েকটি আলাদা বংশে জন্ম নিতে হবে। আর আধ্যাত্মিক অর্থে নিলে সব বর্ণনা একসঙ্গে সত্য হয়, কোনোটিকে বাদ দিতে হয় না।

“পারস্যের মানুষ আহলে বাইত হন কীভাবে?”

আহলে বাইত মানে “ঘরের মানুষ”। কুরআন দেখিয়েছে, নূহ (আ.)-এর নিজের ছেলে এই ঘর থেকে বাদ পড়েছে তার কাজের কারণে। তাহলে উল্টোটাও সম্ভব: রক্তে বাইরের মানুষ তাঁর ঈমান আর আনুগত্যের কারণে ঘরের মানুষ হয়ে যেতে পারেন।

আর মহানবী (সা.) নিজেই এই দরজা খুলে দিয়েছেন। এত সাহাবীর মধ্যে তিনি বেছে নিলেন একজন পারসিককে, তাঁর কাঁধে হাত রেখে বললেন, শেষ যুগে ঈমান ফিরিয়ে আনবে “এদের মধ্য থেকে” কেউ। যে কাজ তিনি ভবিষ্যতের এক পারসিককে দিলেন, সেই কাজ তো আহলে বাইতের সবচেয়ে বড় সম্মান।

“বংশই যদি গুরুত্বহীন হয়, তবে হাদীসে বংশের কথা এল কেন?”

বংশের কথা এসেছে সম্পর্ক বোঝাতে। যিনি আসবেন, তিনি বাইরের কোনো নতুন নবী নন, বরং মহানবী (সা.)-এর ঘরের মানুষ, তাঁরই উম্মতের সন্তান। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত হাকীকাতুল মাহদী গ্রন্থের অনুবাদে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) মাহদী সম্পর্কে প্রচলিত বিভিন্ন ধারণা, যেমন তিনি ফাতেমা (রা.)-এর বংশধর হবেন, আলোচনা করে স্পষ্ট করেছেন যে প্রতিশ্রুত মাহদী তিনিই। বংশ পরিচয়ের চেয়ে বড় পরিচয় হলো, তিনি মহানবী (সা.)-এর আধ্যাত্মিক উত্তরাধিকারী।

সংক্ষেপে

  1. সহীহ বুখারী (৪৮৯৭) অনুযায়ী শেষ যুগে ঈমান ফিরিয়ে আনবেন পারস্যের একজন মানুষ; হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) পারস্য বংশোদ্ভূত।
  2. অন্য হাদীসে মাহদীকে “আমার মধ্য থেকে”, “আহলে বাইত থেকে”, “ফাতেমার সন্তান থেকে” বলা হয়েছে।
  3. কুরআন শেখায়, আসল সম্পর্ক অনুসরণের: “যে আমার অনুসরণ করে সে আমার সহিত সম্পৃক্ত” (১৪:৩৭), আর অবাধ্য সন্তান “পরিবারভুক্ত নহে” (১১:৪৭)।
  4. এই নীতিতে সব বর্ণনা একসঙ্গে সত্য: রক্তে পারসিক, আত্মায় আহলে বাইত।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.