বিংশ শতাব্দীর একেবারে শুরুর দিক। পাঞ্জাবের ছোট্ট জনপদ কাদিয়ান। চারপাশে প্রবল বিরোধিতা, আলেমদের ফতোয়া, মামলা-মোকদ্দমা। এর মধ্যেই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কলম হাতে নিলেন আর এমন একটি কথা লিখলেন, যা পরীক্ষা করার জন্য পৃথিবীকে কয়েক প্রজন্ম অপেক্ষা করতে হবে।
তিন প্রজন্মের ভবিষ্যদ্বাণী
তিনি লিখেছিলেন:
এরপর তিনি লিখেছেন, তিনি এসেছেন শুধু বীজ বপন করতে। সেই বীজ তাঁর হাতে বোনা হয়েছে, এখন তা অঙ্কুরিত হবে, বড় হবে, ফুলে-ফলে ভরে উঠবে, আর কেউ তা থামাতে পারবে না (আলইসলাম.অর্গে উদ্ধৃত ইংরেজি অনুবাদ অনুযায়ী)।
একটু ভাবুন, কী সাহসী কথা! যদি সত্যিই ঈসা (আ.) সশরীরে আকাশে থাকতেন আর শিগগিরই নেমে আসতেন, এই একটি ঘটনাই তাঁর পুরো দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করে দিত। তিনি জেনেশুনেই নিজের সত্যতাকে এই মানদণ্ডে দাঁড় করিয়েছেন।
তাঁর বিরোধীদের প্রথম প্রজন্ম চলে গেছে। তাদের সন্তানদের প্রজন্মও প্রায় শেষ। কেউ আকাশ থেকে কাউকে নামতে দেখেননি। আর আলইসলাম.অর্গের একটি প্রবন্ধে উল্লেখ আছে, মুসলিম বিশ্বের অনেক আলেম, এমনকি আল-আযহার-সমর্থিত কিছু তফসীরও, এখন ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু সংক্রান্ত আয়াতগুলোর এমন ব্যাখ্যা করছে, যা আহমদীদের ব্যাখ্যার সঙ্গে মেলে।
সাহাবীদের ইজমা ও হাসসান (রা.)-এর শোকগাথা
“হাকীকাতুল ওহী” গ্রন্থে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবীদের প্রথম ইজমা ছিল সব নবীর মৃত্যুর ওপর, আর সেই কারণে সব সাহাবী ঈসা (আ.)-এর মৃত্যুর সত্যায়নকারী ছিলেন। এ প্রসঙ্গে তিনি মহানবী (সা.)-এর কবি হযরত হাসসান ইবনে সাবিত (রা.)-এর শোকগাথার কথা উল্লেখ করেছেন, যার অর্থ তিনি এভাবে করেছেন: “তুমি ছিলে আমার চোখের মণি, তোমার মৃত্যুতে আমি অন্ধ হয়ে গেছি। এখন তোমার পরে যে চায় মরুক, মূসা হোক বা ঈসা; আমি তো শুধু তোমার মৃত্যুরই ভয় করতাম।” (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ৩৫, সূত্র-প্রবন্ধের উল্লেখ অনুযায়ী)
যে কবি মহানবী (সা.)-কে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন, তাঁর কাছে মহানবী (সা.) ইহজগৎ ছেড়ে যাওয়ার পর অন্য কারও বেঁচে থাকার কোনো মূল্য ছিল না।
আপত্তি: “তিনি নিজেই তো ঈসা (আ.)-কে জীবিত মনে করতেন”
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর প্রথম দিকের বই বারাহীনে আহমদীয়ায় লিখেছিলেন যে ঈসা (আ.) আবার পৃথিবীতে আসবেন। পরে তিনি বললেন ঈসা (আ.) মারা গেছেন, আর প্রতিশ্রুত মসীহ তিনি নিজে। তাহলে কোনটি সত্য?
তিনি নিজেই এর জবাব দিয়েছেন। “ইযালায়ে আওহাম” গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, বারাহীনে আহমদীয়ায় ঈসা (আ.)-এর দ্বিতীয় আগমন সম্পর্কে তিনি কোনো ইলহামী সিদ্ধান্ত দেননি। সেখানে যা লিখেছিলেন, তা ছিল মুসলমানদের মধ্যে প্রচলিত সাধারণ ধারণা অনুযায়ী। যাঁরা আল্লাহর কাছ থেকে ইলহাম পান, তাঁরা নির্দেশ না পাওয়া পর্যন্ত নিজে থেকে কোনো দাবি করেন না। এখন আল্লাহ যেহেতু প্রকৃত বিষয়টি স্পষ্ট করে দিয়েছেন, তাই তা ঘোষণা করা তাঁর কর্তব্য (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১৯৬-১৯৭, সূত্র-প্রবন্ধের উল্লেখ অনুযায়ী)।
“হাকীকাতুল ওহী”-তে তিনি আরও লিখেছেন, বারাহীনে আহমদীয়াতেই আল্লাহ তাঁকে “ঈসা” নামে ডেকেছিলেন। কিন্তু তিনি নিজেও সাধারণ মুসলমানদের মতো বিশ্বাস করতেন যে ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নামবেন, তাই ইলহামের বাহ্যিক অর্থ নিয়ে সেই পুরোনো মতেই থেকেছিলেন। পরে বৃষ্টির মতো ওহী এল যে প্রতিশ্রুত মসীহ তিনিই, আর আকাশ-পৃথিবী নিদর্শন নিয়ে তাঁর সমর্থনে দাঁড়াল (আলইসলাম.অর্গে উদ্ধৃত “ট্রুথ প্রিভেইলস” গ্রন্থের তৃতীয় অধ্যায় অনুযায়ী)।
মহানবী (সা.)-এর জীবনেও এর দৃষ্টান্ত আছে। যে বিষয়ে আল্লাহর নির্দেশ আসেনি, সে বিষয়ে তিনি আহলে কিতাবের প্রচলিত রীতি মানতেন, পরে নির্দেশ এলে তা বদলে দিতেন:
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
মত বদলানো কি দুর্বলতার লক্ষণ নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, একজন সত্য দাবিকারী শুরু থেকেই সব জানবেন। চলুন দেখি হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে কী বলেছেন। “ইজাযে আহমদী” গ্রন্থে তিনি লিখেছেন, প্রায় বারো বছর তিনি বুঝতেই পারেননি যে বারাহীনে আহমদীয়ার ইলহামগুলো তাঁকে প্রতিশ্রুত মসীহ ঘোষণা করছে। এটি যদি মানুষের বানানো পরিকল্পনা হতো, তাহলে তিনি শুরু থেকেই দাবি করে বসতেন। আল্লাহ তাঁর দৃষ্টি অন্য দিকে ফিরিয়ে রেখেছিলেন, আর এটিই তাঁর সরলতা ও সত্যবাদিতার বড় প্রমাণ। একজন প্রতারক পুরোনো লেখা লুকাতেন; তিনি তা প্রকাশ্যে মেনে নিয়ে ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
তিন শতাব্দীর ভবিষ্যদ্বাণী এখন যাচাই করা যাবে কীভাবে?
কেউ বলেন, তিনশো বছর তো এখনো পার হয়নি, তাহলে এটি এখনই প্রমাণ হিসেবে আনা কেন? প্রশ্নটি ন্যায্য। পূর্ণ পরিণতি দেখার সময় এখনো আসেনি। কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণীর প্রথম অংশগুলো ইতিমধ্যে যাচাইযোগ্য: তখনকার জীবিত বিরোধীরা সবাই চলে গেছেন, তাদের পরের প্রজন্মও প্রায় গত হয়েছে, আর কেউ ঈসা (আ.)-কে আকাশ থেকে নামতে দেখেননি। যা আসছে, তা সময়ই দেখাবে; যা চলে গেছে, তা ইতিমধ্যেই সাক্ষ্য দিচ্ছে।
সংক্ষেপে
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ঘোষণা করেছিলেন, তিন প্রজন্ম পেরিয়ে যাবে, কেউ ঈসা (আ.)-কে আকাশ থেকে নামতে দেখবে না।
- তিনি বলেছেন, সাহাবীদের প্রথম ইজমা ছিল সব নবীর মৃত্যুর পক্ষে।
- বারাহীনে আহমদীয়ায় তিনি প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী লিখেছিলেন; স্পষ্ট ওহী আসার পর সত্য ঘোষণা করেন।
- নির্দেশ আসার আগে প্রচলিত পথে চলা আর পরে তা বদলানো মহানবী (সা.)-এর সুন্নতেও দেখা যায়।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Promised Messiah · alislam.org
- Truth Prevails, Chapter III · alislam.org
- Conclusion of the 14th Century and A Moment of Reflection for the Muslims · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.