“তাওয়াফ্‌ফা” শব্দটির আসল মানে কী?

একটি ছোট আরবি শব্দ। এর অর্থ নিয়েই ঈসা (আ.)-এর জীবন-মৃত্যুর পুরো বিতর্ক। কুরআন, হাদীস আর অভিধান, তিন সাক্ষীকে একে একে জিজ্ঞেস করে দেখা যাক।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

কোনো মুসলমান মারা গেলে আমরা বলি, তিনি “ওফাত” পেয়েছেন। মৃত্যুসংবাদে লেখা হয় “ইন্তেকাল” বা “ওফাত”। এই “ওফাত” শব্দটি এসেছে যে আরবি মূল থেকে, সেখান থেকেই এসেছে আরেকটি শব্দ: তাওয়াফ্‌ফা।

কুরআনে ঈসা (আ.) সম্পর্কে দুটি জায়গায় এই শব্দ আছে। একবার আল্লাহর প্রতিশ্রুতিতে: “ইন্নী মুতাওয়াফ্‌ফীকা” (৩:৫৬)। আরেকবার কিয়ামতের দিনে ঈসা (আ.)-এর নিজের কথায়: “ফালাম্মা তাওয়াফ্‌ফাইতানী” (৫:১১৮)। যাঁরা বলেন ঈসা (আ.) জীবিত, তাঁরা এখানে শব্দটির অর্থ করেন “পুরোপুরি তুলে নেওয়া”। প্রশ্ন হলো, আরবি ভাষা আর কুরআন নিজে এই শব্দকে কোন অর্থে ব্যবহার করে?

প্রথম সাক্ষী: কুরআন নিজে

আলইসলাম.অর্গে ব্যাখ্যা করা নিয়মটি খুব সহজ। যখন বাক্যে কর্তা আল্লাহ বা তাঁর ফিরিশতা, আর কর্ম একজন মানুষ, তখন তাওয়াফ্‌ফা মানে রূহ কবজ করা, শরীর রেখে প্রাণ নিয়ে যাওয়া, অর্থাৎ মৃত্যু। কুরআনে এই শব্দ ও এর বিভিন্ন রূপ বিশটিরও বেশি জায়গায় এসেছে। কয়েকটি দেখুন:

قُلۡ یَتَوَفّٰٮکُمۡ مَّلَکُ الۡمَوۡتِ الَّذِیۡ وُکِّلَ بِکُمۡ ثُمَّ اِلٰی رَبِّکُمۡ تُرۡجَعُوۡنَ
“তুমি বল, ‘মৃত্যুর ফিরিশ্‌তা, যাহাকে তোমাদের উপর নিযুক্ত করা হইয়াছে, নিশ্চয় তোমাদের জান কবয করিবে; অতঃপর তোমাদিগকে তোমাদের প্রভুর নিকট প্রত্যাবর্তিত করা হইবে।”
সূরা আস-সাজদা ৩২:১২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩২:১১।

হযরত ইউসুফ (আ.) দোয়া করেছিলেন: “তুমি আমাকে পূর্ণ আত্মসমর্পণকারী অবস্থায় মৃত্যু দান করিও” (সূরা ইউসুফ ১২:১০২)। মুমিনরা দোয়া করেন: “আমাদিগকে পূণ্যবানদের সহিত (শামিল করিয়া) মৃত্যু দাও” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৯৪)। দুই জায়গাতেই শব্দটি তাওয়াফ্‌ফা। কেউ কি এখানে অর্থ করবেন “আমাদের সশরীরে আকাশে তুলে নাও”?

সবচেয়ে চমৎকার উদাহরণ মহানবী (সা.) নিজে। কুরআনে তিনবার আল্লাহ তাঁকে বলেছেন, “অথবা যদি আমরা তোমাকে মৃত্যু দিই” (১০:৪৭, ১৩:৪১, ৪০:৭৮)। সেখানেও শব্দটি নাতাওয়াফ্‌ফাইয়ান্নাকা। মহানবী (সা.)-এর বেলায় সবাই অর্থ করেন “মৃত্যু”। তাহলে একই শব্দ ঈসা (আ.)-এর বেলায় এসে অন্য অর্থ পাবে কেন?

ঘুমের কথা তাহলে কোথা থেকে এল?

কুরআনে দুটি জায়গায় এই শব্দ ঘুমের সঙ্গে এসেছে। কিন্তু সেখানে ঘুম বা রাতের কথা স্পষ্ট করে বলা আছে। যেমন:

اَللّٰہُ یَتَوَفَّی الۡاَنۡفُسَ حِیۡنَ مَوۡتِہَا وَالَّتِیۡ لَمۡ تَمُتۡ فِیۡ مَنَامِہَا
“আল্লাহ্‌ মানুষের রূহকে তাহাদের মৃত্যুর সময় কবয করিয়া থাকেন, এবং যাহাদের (এখনও) মৃত্যু হয় নাই (তাহাদের রূহকেও) তাহাদের নিদ্রাকালে (কবয করিয়া থাকেন)…”
সূরা আয-যুমার ৩৯:৪৩

এখানেও কিন্তু শরীর তুলে নেওয়ার কথা নেই, আছে রূহ কবজের কথা। ঘুমকে এক রকম ছোট মৃত্যু বলা হয়েছে, আর তা বোঝাতে আল্লাহ নিজেই “নিদ্রাকালে” শব্দটি যোগ করে দিয়েছেন। মহানবী (সা.) ঘুমানোর সময় বলতেন, বিসমিকা আমূতু ওয়া আহইয়া, “তোমার নামেই আমি মরি ও জীবিত হই” (সহীহ বুখারী, কিতাবুদ দাওয়াত, হাদীস ৬৩১২)। ঈসা (আ.)-এর দুটি আয়াতে ঘুম বা রাতের কোনো উল্লেখ নেই। তাই সেখানে অর্থ একটাই: মৃত্যু।

✦

দ্বিতীয় সাক্ষী: হাদীস

সাহাবীরা (রা.) মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের কথা বলতে বারবার এই শব্দই ব্যবহার করেছেন। হযরত আয়েশা (রা.) বলেন, মহানবী (সা.) রমজানের শেষ দশকে ইতিকাফ করতেন, হাত্তা তাওয়াফ্‌ফাহুল্লাহ, “যতদিন না আল্লাহ তাঁকে মৃত্যু দিলেন” (সহীহ বুখারী, হাদীস ২০২৬)। তিনি আরও বলেন, মহানবী (সা.) তুউফ্‌ফিয়া, অর্থাৎ ইন্তেকাল করেন তেষট্টি বছর বয়সে (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৫৩৬)।

আর কিয়ামতের দিনের সেই বিখ্যাত হাদীস, যেখানে মহানবী (সা.) নিজের জন্য ঈসা (আ.)-এর হুবহু কথা বলবেন: “ফালাম্মা তাওয়াফ্‌ফাইতানী” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৬২৫)। মহানবী (সা.)-এর বেলায় এর অর্থ যে মৃত্যু, তাতে কারও সন্দেহ নেই।

তৃতীয় সাক্ষী: আরবি অভিধান

আরবি ভাষার প্রামাণ্য অভিধানগুলোও একই কথা বলে। যামাখশারী (রহ.)-এর আসাসুল বালাগায় আছে, “আল্লাহ তার তাওয়াফ্‌ফা করেছেন” মানে তার মৃত্যু হয়েছে। তাজুল উরূস অভিধানে লেখা:

وتُوُفِّيَ فلانٌ: إِذا ماتَ، وتَوَفَّاهُ اللهُ عزَّ وجلَّ: إِذا قَبَضَ نَفْسَه
“অমুকের তাওয়াফ্‌ফা হয়েছে” মানে সে মারা গেছে; আর “মহাপরাক্রমশালী আল্লাহ তার তাওয়াফ্‌ফা করেছেন” মানে আল্লাহ তার প্রাণ কবজ করেছেন।
তাজুল উরূস, “ওয়াফা” শব্দমূলের অধীনে

এক হাজার টাকার চ্যালেঞ্জ

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই বিষয়ে এতটাই নিশ্চিত ছিলেন যে তিনি প্রকাশ্য পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। তিনি লিখেছেন, আরব উপদ্বীপে আরবি ভাষা চালু হওয়ার পর থেকে কোনো পুরোনো বা নতুন লেখায় দেখানো যাবে না যে, আল্লাহ কর্তা আর মানুষ কর্ম হলে তাওয়াফ্‌ফা শব্দটি কখনো শরীর তুলে নেওয়ার অর্থে এসেছে। কেউ যদি কুরআন, হাদীস বা প্রাচীন ও আধুনিক আরবি কবিতা-গদ্য থেকে এমন একটি দৃষ্টান্তও দেখাতে পারেন, তিনি নিজের সম্পত্তির অংশ বিক্রি করে তাঁকে এক হাজার টাকা নগদ দেবেন (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ৬০২-৬০৩)।

সেই চ্যালেঞ্জের পর এক শতাব্দীরও বেশি পার হয়েছে। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বক্তব্য, এমন একটি দৃষ্টান্তও আজ পর্যন্ত কেউ হাজির করতে পারেননি। কুরআন, হাদীস আর অভিধান, তিন সাক্ষী একই কথা বলছে: ঈসা (আ.)-এর তাওয়াফ্‌ফা মানে তাঁর মৃত্যু।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“ওয়াফা” মানে পূর্ণ করা, তাই “তাওয়াফ্‌ফা” মানে কি পুরোপুরি নিয়ে নেওয়া নয়?

এখানে কেউ কেউ বলেন, শব্দমূলের অর্থ “পূর্ণ করা”, তাই আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে রূহ ও শরীর মিলিয়ে “পুরোপুরি” নিয়ে গেছেন। চলুন কুরআনকেই জিজ্ঞেস করি। সূরা আয-যুমারের আয়াতে আল্লাহ বলছেন, তিনি মৃত্যুর সময় আর ঘুমের সময় আনফুস অর্থাৎ রূহ কবজ করেন। মৃত্যুতেও শরীর পৃথিবীতে থেকে যায়, ঘুমেও শরীর বিছানায় পড়ে থাকে। “পুরোপুরি নেওয়া” যদি শরীরসহ নেওয়া হতো, তাহলে প্রতিটি মৃত মানুষের শরীরও আকাশে চলে যেত। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যায় তাই বলা হয়েছে, “পুরোপুরি তুলে নেওয়া” অনুবাদটি আরবি ভাষা বা কুরআনের রীতি থেকে আসেনি, এসেছে একটি পূর্বধারণা রক্ষার চেষ্টা থেকে।

৫:১১৮ আয়াতের মৃত্যু কি শেষ যুগে নেমে আসার পরের মৃত্যু হতে পারে না?

কেউ বলেন, ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নেমে এসে পরে মারা যাবেন; কিয়ামতে তিনি সেই মৃত্যুর কথাই বলবেন। আল-আযহারের রেক্টর শায়খ মাহমুদ শালতুত (রহ.) এই ব্যাখ্যাকে অযৌক্তিক বলেছেন। কারণ আয়াতে ঈসা (আ.) কথা বলছেন নিজের জাতির বিষয়ে, যাদের মধ্যে তিনি ছিলেন। শেষ যুগের মানুষ তো মহানবী (সা.)-এর উম্মত, ঈসা (আ.)-এর জাতি নয়। তা ছাড়া তিনি যদি আবার আসতেন, তাহলে খ্রিষ্টানদের বিপথগামিতা নিজের চোখে দেখে যেতেন, আর কিয়ামতে “আমি জানি না” বলতে পারতেন না।

সংক্ষেপে

  1. আল্লাহ বা ফিরিশতা কর্তা আর মানুষ কর্ম হলে “তাওয়াফ্‌ফা” মানে রূহ কবজ করা, অর্থাৎ মৃত্যু।
  2. মহানবী (সা.), হযরত ইউসুফ (আ.) ও মুমিনদের ক্ষেত্রে কুরআনে এই শব্দের অর্থ মৃত্যু; ঈসা (আ.)-এর বেলায় আলাদা হওয়ার কারণ নেই।
  3. ঘুমের অর্থ কেবল সেখানে, যেখানে আয়াতেই ঘুমের কথা স্পষ্ট বলা আছে।
  4. হাদীস ও আরবি অভিধানও একই অর্থ দেয়; হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর এক হাজার টাকার চ্যালেঞ্জের জবাবে আজও কোনো দৃষ্টান্ত আসেনি।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.