একটি দৃশ্য কল্পনা করুন। কিয়ামতের দিন। সব মানুষ আল্লাহর সামনে একত্রিত। সেই বিশাল সমাবেশে আল্লাহ একজন নবীকে ডাকবেন, তিনি হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)।
প্রশ্নটি হবে খুব ভারী। পৃথিবীতে কোটি কোটি মানুষ তাঁকে আর তাঁর মাকে উপাস্য বানিয়েছে। আল্লাহ জানতে চাইবেন, এই শিক্ষা কি তিনিই দিয়েছিলেন?
এই দৃশ্যটি আমাদের বানানো নয়। পবিত্র কুরআন নিজেই এটি বর্ণনা করেছে, আর ঈসা (আ.)-এর উত্তরটিও শব্দে শব্দে জানিয়ে দিয়েছে।
ঈসা (আ.) কেঁপে উঠবেন। তিনি বলবেন, “তুমি পবিত্র! যা বলার অধিকার আমার নেই, তা আমি কীভাবে বলতে পারি?” তারপর তিনি যা বলবেন, সেটিই এই আলোচনার মূল কথা।
দুটি সময়, একটি সীমারেখা
উত্তরটি মন দিয়ে দেখুন। ঈসা (আ.) তাঁর জাতির ইতিহাসকে দুই ভাগে ভাগ করছেন।
প্রথম ভাগ: “যতদিন আমি তাদের মাঝে ছিলাম।” এই সময়ে তিনি নিজে সাক্ষী। তাঁর অনুসারীরা তখন এক আল্লাহরই ইবাদত করত।
দ্বিতীয় ভাগ শুরু হয় একটি ঘটনা দিয়ে: “যখন তুমি আমাকে মৃত্যু দিলে।” এরপর কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না। তখন একমাত্র আল্লাহই ছিলেন তাদের তত্ত্বাবধায়ক।
অর্থাৎ তাঁর জাতি বিপথে গেছে তাঁর মৃত্যুর পরে। দুটি সময়ের মাঝখানের সীমারেখা হলো তাঁর মৃত্যু।
এবার একটি সহজ প্রশ্ন
অনেকে বিশ্বাস করেন, ঈসা (আ.) আজও আকাশে জীবিত, আর শেষ যুগে তিনি পৃথিবীতে ফিরে আসবেন। ধরে নিই, তা-ই হলো। তিনি ফিরে এলেন, চারপাশে তাকালেন, আর দেখলেন কোটি কোটি মানুষ তাঁকে খোদা বলে পূজা করছে।
তাহলে কিয়ামতের দিন তিনি কীভাবে বলবেন, “তুমি আমাকে মৃত্যু দেওয়ার পর কী হয়েছে, আমি জানি না”? তিনি তো নিজের চোখে দেখে এসেছেন!
একজন নবী আল্লাহর সামনে এমন কথা বলতে পারেন না, যা তিনি জানেন সত্য নয়। তাই দুটির একটি মানতেই হবে।
হয় তিনি ফিরে আসবেন, আর কুরআনে বর্ণিত তাঁর এই উত্তর সত্য থাকবে না, নাউযুবিল্লাহ। নয়তো তাঁর উত্তর পুরোপুরি সত্য: তাঁর জাতি বিপথে যাওয়ার আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন, আর তিনি আর ফিরে আসবেন না।
কুরআনের কোনো কথা মিথ্যা হতে পারে না। তাই উত্তর একটাই।
মহানবী (সা.) নিজেও এই শব্দগুলো বলবেন
এই আয়াতের অর্থ নিয়ে সবচেয়ে বড় সাক্ষ্য দিয়েছেন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেই। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বর্ণনা করেছেন:
এখানে মহানবী (সা.) হুবহু একই শব্দ ব্যবহার করবেন: ফালাম্মা তাওয়াফফাইতানী। মহানবী (সা.)-এর ক্ষেত্রে এর অর্থ যে মৃত্যু, তা নিয়ে কোনো মুসলমানের দ্বিমত নেই। তিনি ইন্তেকাল করেছেন, মদিনায় তাঁর রওযা আছে।
একই বাক্য, একই শব্দ, একই প্রসঙ্গ। মহানবী (সা.)-এর বেলায় যদি এর অর্থ মৃত্যু হয়, তাহলে ঈসা (আ.)-এর বেলায় অন্য অর্থ করার কোনো সুযোগ থাকে না।
শব্দটির অর্থ নিয়ে আরেকটি সাক্ষ্যও সহীহ বুখারীতেই আছে। মহানবী (সা.)-এর চাচাতো ভাই, কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকার হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন:
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এত স্পষ্ট সাক্ষ্যের পরও কেউ কেউ কয়েকটি প্রশ্ন তোলেন। চলুন, একটি একটি করে দেখি।
“তাওয়াফফা” মানে কি ঘুম পাড়ানো বা পুরোপুরি তুলে নেওয়া নয়?
কেউ কেউ বলেন, এখানে “তাওয়াফফাইতানী” মানে “তুমি আমাকে তুলে নিলে”। কিন্তু কুরআন নিজেই দেখিয়ে দেয়, ঘুমের অর্থ কখন হয়। যেখানে ঘুম বোঝানো হয়েছে, সেখানে আল্লাহ স্পষ্ট করে “নিদ্রাকালে” শব্দটি যোগ করেছেন:
ঈসা (আ.)-এর উত্তরে ঘুমের কোনো ইঙ্গিত নেই। আর সবচেয়ে বড় কথা, মহানবী (সা.) নিজের বেলায় হুবহু এই বাক্যটি বলবেন। তাঁর বেলায় কেউ “ঘুম” বা “সশরীরে তুলে নেওয়া” অর্থ করেন না। আর ইবনে আব্বাস (রা.) তো সোজাসুজি বলেই দিয়েছেন: “মুতাওয়াফফীকা” মানে “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব”। অর্থ নিয়ে আর কোনো সংশয় থাকে না।
এই কথোপকথন কি অনেক আগেই, পৃথিবীতে থাকতে হয়ে যায়নি?
আরেকটি দাবি হলো, আয়াতে “ক্বালা” (বললেন) অতীত কালের ক্রিয়া, তাই এই প্রশ্নোত্তর হয়তো অনেক আগেই হয়ে গেছে। কিন্তু ঠিক পরের আয়াতেই আল্লাহ নিজে দিনটির পরিচয় দিয়েছেন:
যে দিনে সত্যবাদীরা তাদের সত্যবাদিতার পুরস্কার পাবে আর জান্নাতে প্রবেশ করবে, সেটি কিয়ামতের দিন। ভবিষ্যতের নিশ্চিত ঘটনাকে অতীত কালে বলা কুরআনের পরিচিত রীতি, কারণ তা ঘটবেই। আর মহানবী (সা.)-এর হাদীসও এই প্রশ্নোত্তরকে কিয়ামতের দিনেই রেখেছে, যেদিন তাঁর উম্মতের কিছু লোককে পাকড়াও করা হবে।
ফিরে এলেও কি তিনি বলতে পারেন না, “আমি জানি না”?
কেউ বলেন, হয়তো তিনি ফিরে আসবেন, তবু বিনয় করে বলবেন যে তিনি জানেন না। কিন্তু উত্তরটি বিনয়ের কথা নয়, এটি একটি সাক্ষ্য। তিনি স্পষ্ট দুটি সময় ভাগ করেছেন: “যতদিন তাদের মাঝে ছিলাম, আমি সাক্ষী ছিলাম” আর “তুমি আমাকে মৃত্যু দেওয়ার পর তুমিই ছিলে তত্ত্বাবধায়ক”। যিনি আবার এসে নিজের চোখে উম্মতের বিপথগামিতা দেখেছেন, তিনি আল্লাহর সামনে এমন সাক্ষ্য দিতে পারেন না। নবীরা আল্লাহর সামনে অসত্য বলেন না।
তাই প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর একই জায়গায় এসে থামে: কুরআনের সাক্ষ্য অনুযায়ী হযরত ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, আর তিনি নিজে ফিরে আসবেন না।
সংক্ষেপে
- কিয়ামতের দিন ঈসা (আ.) বলবেন, তাঁর জাতি বিপথে গেছে তাঁর মৃত্যুর পরে।
- তিনি যদি আবার ফিরে আসতেন, তাহলে তিনি তাদের বিপথগামিতা নিজের চোখে দেখতেন, আর এই উত্তর দিতে পারতেন না।
- মহানবী (সা.) নিজের জন্য হুবহু একই শব্দ ব্যবহার করবেন, যার অর্থ নিঃসন্দেহে মৃত্যু।
- তাই কুরআনের সাক্ষ্য স্পষ্ট: হযরত ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.