“খালাত”: যারা গত হয়েছেন, তাঁরা কোথায় গেছেন?

“তাঁর আগে সব রসূল গত হয়েছেন।” বিতর্কটা এই “গত হওয়া” শব্দ নিয়েই। কুরআন নিজে শব্দটিকে কীভাবে ব্যবহার করে, চলুন দেখি।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

গ্রামের পুরোনো কবরস্থানের পাশ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে কোনো বয়স্ক মানুষ হয়তো বলেন, “আমাদের দাদা-পরদাদারা সবাই গত হয়েছেন।” কথাটা শুনে কেউ জিজ্ঞেস করে না, “গত হয়েছেন মানে কি অন্য কোনো দেশে চলে গেছেন?” সবাই বোঝে, তাঁরা মারা গেছেন।

আরবিতেও এমন একটি শব্দ আছে: খালা, অতীত কালে খালাত। মহানবী (সা.) সম্পর্কে কুরআন বলেছে, কাদ খালাত মিন কাবলিহির রুসুল, তাঁর আগের সব রসূল গত হয়েছেন (৩:১৪৫)। আর ঈসা (আ.) সম্পর্কেও হুবহু একই কথা বলেছে (৫:৭৬)। যাঁরা বিশ্বাস করেন ঈসা (আ.) জীবিত, তাঁরা বলেন, “খালাত” মানে কেবল “সময় পার হয়ে গেছে” বা “চলে গেছেন”, মৃত্যু নয়। তাই প্রশ্নটি জরুরি: কুরআনে এই শব্দ মানুষের জন্য কী অর্থে আসে?

কুরআনের ব্যবহার

হযরত ইবরাহীম (আ.), ইসমাঈল (আ.), ইসহাক (আ.) ও ইয়াকূব (আ.)-এর বংশধরদের কথা বলে আল্লাহ বলেন:

تِلۡکَ اُمَّۃٌ قَدۡ خَلَتۡ ۚ لَہَا مَا کَسَبَتۡ وَلَکُمۡ مَّا کَسَبۡتُمۡ
“ইহা সেই উম্মত, যাহারা মৃত্যু বরণ করিয়াছে, তাহাদের জন্য উহা, যাহা তাহারা অর্জন করিয়াছে এবং তোমাদের জন্য উহা, যাহা তোমরা অর্জন করিয়াছ…”
সূরা আল-বাকারা ২:১৩৫
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২:১৩৪।

এখানে কাদ খালাত-এর অনুবাদ সরাসরি “যাহারা মৃত্যু বরণ করিয়াছে।” সেই নবীরা ও তাঁদের প্রজন্ম যে মারা গেছেন, তা নিয়ে কারও দ্বিমত নেই। একই কথা আবার এসেছে সূরা আল-বাকারার ১৪২ আয়াতে।

মহানবী (সা.)-কে আল্লাহ বলেন, “এই ভাবে আমরা তোমাকে এমন এক জাতির নিকট প্রেরণ করিয়াছি যাহার পূর্বে অনেক জাতি বিগত হইয়াছে” (সূরা আর-রা’দ ১৩:৩১)। আগের জাতিগুলো কোথায়? তারা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছে।

সবচেয়ে স্পষ্ট দৃষ্টান্তটি সূরা আল-আহকাফে। পুনরুত্থান অস্বীকারকারী এক ব্যক্তি তার বাবা-মাকে বলে:

اَتَعِدٰنِنِیۡۤ اَنۡ اُخۡرَجَ وَقَدۡ خَلَتِ الۡقُرُوۡنُ مِنۡ قَبۡلِیۡ
“…তোমরা কি এই বলিয়া আমাকে ভয় প্রদর্শন করিতেছ যে আমাকে (কবর হইতে পুনঃ) বহির্গত করা হইবে অথচ আমার পূর্বে বংশের পর বংশ অতীত হইয়া গিয়াছে?…”
সূরা আল-আহকাফ ৪৬:১৮

লোকটির যুক্তি ছিল: আগের প্রজন্মগুলো মরে কবরে গেছে, কেউ তো ফিরে আসেনি। এখানে খালাত মানে মারা গিয়ে চলে যাওয়া, আর ফিরে না আসা।

✦

আয়াত নিজেই অর্থ বলে দিয়েছে

এবার সূরা আলে ইমরানের সেই আয়াতটি আবার পড়ুন, এবার পুরো বাক্যটি:

وَمَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ ۚ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِہِ الرُّسُلُ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مَّاتَ اَوۡ قُتِلَ
“এবং মুহাম্মদ কেবল একজন রসূল। তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে। অতএব, সে যদি মৃত্যু বরণ করে অথবা নিহত হয়…”
সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৫

“গত হওয়া”র কথা বলার পরপরই আল্লাহ দুটি পথের নাম বলছেন: মাতা, স্বাভাবিক মৃত্যু, অথবা কুতিলা, নিহত হওয়া। আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, আগের সব রসূলের গত হওয়া এই দুই পথেই হয়েছে। জীবিত অবস্থায় আকাশে চলে যাওয়ার মতো তৃতীয় কোনো পথ থাকলে আল্লাহ তা বলে দিতেন।

আরবি অভিধানও একই কথা বলে। বিখ্যাত অভিধান লিসানুল আরব-এ আছে: খালা ফুলানুন ইযা মাতা, “অমুক গত হয়েছে, অর্থাৎ যখন সে মারা গেছে।”

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

কুরআনে তো “খালাও” শব্দ একান্তে মিলিত হওয়ার অর্থেও এসেছে?

এখানে কেউ কেউ সূরা আল-বাকারার একটি আয়াত দেখান, যেখানে মুনাফিকদের সম্পর্কে বলা হয়েছে, ওয়া ইযা খালাও ইলা শায়াতীনিহিম, “যখন তাহারা নিজেদের দল-নেতাদের সহিত নিভৃতে মিলিত হয়” (২:১৫)। কথাটি ঠিক। কিন্তু লক্ষ করুন, সেখানে শব্দের পরে ইলা, অর্থাৎ “কারও দিকে/কাছে” আছে, আর কাদের কাছে যাচ্ছে, তা বলা আছে। ভাষায় একটি শব্দ প্রসঙ্গ অনুযায়ী ভিন্ন অর্থ পায়।

প্রশ্ন হলো, যখন কোনো মানুষ বা জাতি সম্পর্কে বলা হয় “তার আগে তারা গত হয়েছে”, তখন অর্থ কী? সেই প্রসঙ্গে কুরআন বারবার মৃত্যুর অর্থই দিয়েছে, যেমন ২:১৩৫, ১৩:৩১ ও ৪৬:১৮। আর ৩:১৪৫ আয়াতে তো “মৃত্যু অথবা নিহত হওয়া” নিজেই সঙ্গে বলে দেওয়া আছে।

গত হওয়া মানে তো পৃথিবী থেকে চলে যাওয়া; আকাশে জীবিত থাকলেও তো তা বলা যায়?

কেউ বলেন, ঈসা (আ.)-ও তো পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন, তাই তাঁকেও “গত” বলা যায়, মৃত না হয়েও। চলুন হযরত আবু বকর (রা.)-এর দিনটির কথা ভাবি। তিনি এই আয়াত পড়ে প্রমাণ করেছিলেন যে মহানবী (সা.) মারা গেছেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪৫৪)। “গত হওয়া” যদি জীবিত অবস্থায় চলে যাওয়াও বোঝাত, তাহলে হযরত উমর (রা.) সহজেই বলতে পারতেন, “তাহলে আমাদের নবী (সা.)-ও হয়তো জীবিত অবস্থায় চলে গেছেন!” কিন্তু আয়াত শুনে উমর (রা.) সহ সবাই মেনে নিলেন যে মহানবী (সা.) ইন্তেকাল করেছেন। সাহাবীদের এই বোঝাই সবচেয়ে বড় প্রমাণ।

ঈসা (আ.)-এর জন্য এই শব্দ কোথায় এসেছে?

আল্লাহ নিজেই ঈসা (আ.)-এর পরিচয় দিতে গিয়ে বলেছেন, “মরিয়মের পুত্র মসীহ্‌ ছিল কেবল এক রসূল, তাহার পূর্বে সকল রসূল মারা গিয়াছে” (সূরা আল-মায়েদা ৫:৭৬)। আর মহানবী (সা.)-এর বেলায় বলেছেন, তাঁর আগের সব রসূল গত হয়েছেন। ঈসা (আ.) মহানবী (সা.)-এর আগের রসূল। তাই তিনিও সেই “গত হওয়া” রসূলদের মধ্যে আছেন, যাঁরা মারা গেছেন।

“খালাত” তো ঘটনা বা রীতির জন্যও ব্যবহৃত হয়?

হ্যাঁ। যেমন আল্লাহ বলেছেন, “নিশ্চয় তোমাদের পূর্বে বহু বিধান অতীত হইয়া গিয়াছে” (সূরা আলে ইমরান ৩:১৩৮)। কোনো রীতি বা ঘটনা “অতীত হওয়া” মানে তার সময় শেষ হওয়া। কিন্তু একজন মানুষের সময় শেষ হওয়ার অর্থ কী? মানুষের জীবনের সময় শেষ হয় মৃত্যুতে। তাই শব্দটি যখন রসূল, জাতি বা প্রজন্মের জন্য আসে, তখন অর্থ দাঁড়ায় তাঁরা এই জগতের জীবন শেষ করে চলে গেছেন। একজন জীবিত মানুষের সম্পর্কে, যিনি আবার ফিরে আসবেন, কেউ বলে না “তাঁর সময় অতীত হয়ে গেছে।”

সংক্ষেপে

  1. কুরআনে মানুষ বা জাতির ক্ষেত্রে “খালাত” মানে মৃত্যুবরণ করে বিদায় নেওয়া, যেমন ২:১৩৫, ১৩:৩১ ও ৪৬:১৮ আয়াতে।
  2. ৩:১৪৫ আয়াত নিজেই গত হওয়ার দুটি পথ বলে দিয়েছে: স্বাভাবিক মৃত্যু অথবা নিহত হওয়া।
  3. যেখানে “একান্তে মিলিত হওয়া” অর্থ, সেখানে প্রসঙ্গ ও “ইলা” শব্দ তা স্পষ্ট করে; আমাদের আয়াতের প্রসঙ্গ আলাদা।
  4. সাহাবীরা এই আয়াত থেকেই মহানবী (সা.)-এর মৃত্যু বুঝেছিলেন; ঈসা (আ.)-ও সেই গত হওয়া রসূলদের একজন।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.