একদিন মহানবী (সা.) সাহাবীদের তাঁর নিজের কয়েকটি নামের কথা বললেন। প্রতিটি নাম যেন তাঁর দায়িত্বের এক একটি দিক। হযরত জুবায়ের বিন মুতইম (রা.) সেই কথাগুলো মনে রেখেছিলেন:
সহীহ বুখারীর দুই জায়গাতেই হাদীসটি শেষ হয়েছে “আমি আল-আকিব” কথাটিতে। এর পরে আর কিছু নেই।
তিরমিযীর বর্ণনায় একটি বাড়তি অংশ
জামে তিরমিযীতে একই সাহাবীর বর্ণনায় শেষ বাক্যটি এরকম: ওয়া আনাল আকিবুল্লাযী লাইসা বা’দী নাবিয়্যুন, “আর আমি আল-আকিব, যার পরে কোনো নবী নেই” (জামে তিরমিযী, আবওয়াবুল আদাব, হাদীস ২৮৪০)।
বিরোধী আলেমরা এই বাড়তি অংশটি দেখিয়ে বলেন, মহানবী (সা.) নিজেই বলে দিয়েছেন, তাঁর পরে কোনো ধরনের নবী নেই।
কিন্তু প্রশ্ন জাগে: বুখারীর সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দুটি বর্ণনায় এই অংশ নেই কেন? আর আকিব শব্দটি আরবি, শ্রোতারাও ছিলেন আরব। নিজের ভাষার একটি শব্দের ব্যাখ্যা আলাদা করে দেওয়ার প্রয়োজন কেন পড়বে?
মোল্লা আলী কারী (রহ.)-এর পর্যবেক্ষণ
হাদীস-সমালোচনায় স্বীকৃত আলেম মোল্লা আলী কারী (রহ.) এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। আলইসলাম ডট অর্গে উদ্ধৃত তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, এই শেষ অংশটি কোনো বর্ণনাকারীর পক্ষ থেকে “আকিব” শব্দের ব্যাখ্যা বলে প্রতীয়মান হয়; এটি মহানবী (সা.)-এর মূল বাক্যের অংশ নয় (মিরকাতুল মাফাতীহ, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ৩৬৭)।
হাদীস-শাস্ত্রে এমন ঘটনা পরিচিত। কোনো বর্ণনাকারী একটি কঠিন শব্দ বোঝাতে নিজের ব্যাখ্যা যোগ করেন, আর পরে সেই ব্যাখ্যা মূল কথার সঙ্গে মিশে যায়। তাই বুখারীর দুই বর্ণনা আর তিরমিযীর বর্ণনা পাশাপাশি রাখলে বোঝা যায়, মহানবী (সা.)-এর নিজের কথা ছিল “আমি আল-আকিব”, ব্যাখ্যাটি পরের।
আকিব শব্দটির অর্থ মেনে নিলেও
“আকিব” শব্দটির মূল আরবি আকব, অর্থাৎ পায়ের গোড়ালি। যে আগের জনের পেছনে পেছনে আসে, সে আকিব। মহানবী (সা.) সব নবীর পরে এসেছেন, তাঁদের সবার উত্তরসূরি হয়ে। এ কথা আহমদী মুসলমানরা পুরোপুরি মানেন।
আহমদী মুসলমানদের বিশ্বাসে তিনি শরীয়তবাহী নবীদের মধ্যে শেষ, আর স্বাধীন নবীদের সারিতেও শেষ। তাঁর পরে যিনি আসবেন, তিনি তাঁর পেছনে আরেকটি সারি শুরু করবেন না; তিনি আসবেন তাঁরই উম্মতের ভেতর থেকে, তাঁর অনুসারী হয়ে।
হাদীসের বাকি নামগুলোও লক্ষ করার মতো। “আল-মাহী”, যাঁর মাধ্যমে আল্লাহ কুফর মুছে দেন। “আল-হাশির”, যাঁর পদচিহ্ন অনুসরণ করে মানুষকে একত্র করা হবে। প্রতিটি নাম তাঁর কাজের বিশালতার কথা বলে, তাঁর পরে সব কিছু থেমে যাওয়ার কথা নয়। মানুষ তাঁর পদচিহ্নে চলবে, তাঁর পেছনে সমবেত হবে।
“আল-আকিব” নামটিও এই সুরেই বাঁধা। তিনি সব নবীর পরে এসে তাঁদের সবার কাজকে পূর্ণ করেছেন। তাঁর পরে আর কেউ তাঁর জায়গা নেবে না, তাঁর শরীয়ত বদলাবে না। যে আসবে, সে আসবে তাঁরই পদচিহ্নে হেঁটে। আহমদী মুসলমানরা ঠিক এই বিশ্বাসই রাখেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
ইমাম তিরমিযী তো হাদীসটিকে “হাসান সহীহ” বলেছেন; তাহলে বাড়তি অংশও কি সহীহ নয়?
ইমাম তিরমিযী পুরো বর্ণনাটিকে হাসান সহীহ বলেছেন, এটা ঠিক। কিন্তু একটি বর্ণনার সনদ শক্ত হওয়া আর তার প্রতিটি শব্দ নবী (সা.)-এর মুখের হওয়া আলাদা প্রশ্ন। ইমাম বুখারী একই সাহাবীর হাদীস দুই জায়গায় এনেছেন, কোথাও এই অংশ নেই। সেই কারণেই মোল্লা আলী কারী (রহ.) এটিকে বর্ণনাকারীর ব্যাখ্যা বলেছেন। আর যদি ধরেও নিই কথাটি নবী (সা.)-এর, তবু অর্থ সেটাই দাঁড়ায় যা উম্মতের বড় আলেমরা “লা নাবিয়্যা বা’দী”-র ক্ষেত্রে বলেছেন।
সেই অর্থটি কী?
ইমাম আব্দুল ওয়াহহাব শারানী (রহ.) লিখেছেন: মহানবী (সা.)-এর কথা যে তাঁর পরে কোনো নবী বা রসূল নেই, এর অর্থ শুধু এই যে তাঁর পরে কোনো শরীয়তবাহী নবী নেই (আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল জাওয়াহির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫)। নওয়াব নূরুল হাসান খান লিখেছেন, জ্ঞানীদের মতে “লা নাবিয়্যা বা’দী” মানে তাঁর পরে এমন নবী নেই যিনি তাঁর শরীয়ত রহিত করবেন (ইকতিরাবুস সাআ, পৃষ্ঠা ১৬২)। আকিব-বিষয়ক বাড়তি অংশও এই অর্থের বাইরে নয়।
বিরোধী আলেমদের বিশ্বাসেই কি তিনি “যার পরে কোনো নবী নেই”?
তাঁরা বিশ্বাস করেন, ঈসা (আ.) নবী হিসেবে শেষ যুগে নামবেন। তাহলে তাঁদের বিশ্বাসেও আক্ষরিক অর্থে “তাঁর পরে কোনো নবী নেই” কথাটি সত্য থাকে না। দুই পক্ষই কোনো না কোনো ব্যাখ্যা মানেন। পার্থক্য শুধু এই, আহমদী মুসলমানদের ব্যাখ্যা উম্মতের বড় আলেমদের লেখার সঙ্গে মেলে, আর মহানবী (সা.)-এর মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখে: আগমনকারী আসবেন তাঁরই অনুসারী হয়ে।
শেষ কথা হলো, একটি হাদীসের একটি বাড়তি বাক্যাংশের উপর এত বড় বিশ্বাস দাঁড় করানো ঠিক নয়, বিশেষ করে যখন সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বর্ণনায় সেটি নেই। কুরআন, সহীহ হাদীস আর উম্মতের বুযুর্গদের ব্যাখ্যা একসঙ্গে পড়লে ছবিটি পরিষ্কার: মহানবী (সা.) আল-আকিব, সব নবীর পরে আগত, সবার পূর্ণতাদানকারী; আর তাঁর পরে যা আসবে, তা আসবে তাঁরই অধীনে।
সংক্ষেপে
- সহীহ বুখারীর দুই বর্ণনায় (৩৫৩২, ৪৮৯৬) হাদীসটি শুধু “আমি আল-আকিব” পর্যন্ত।
- তিরমিযীর (২৮৪০) বাড়তি অংশ “যার পরে কোনো নবী নেই”-কে মোল্লা আলী কারী (রহ.) বর্ণনাকারীর ব্যাখ্যা বলে মনে করেছেন।
- আকিব মানে যিনি সবার পরে এসেছেন; আহমদী মুসলমানরা মানেন, তিনি শরীয়তবাহী ও স্বাধীন নবীদের শেষ।
- অংশটি নবী (সা.)-এর কথা হলেও, আলেমদের ব্যাখ্যায় এর অর্থ: তাঁর পরে শরীয়ত রহিতকারী কোনো নবী নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Ahmadis believe in Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
- The Real Significance of Hadith La Nabiyya Ba‘di · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.