কোন খোঁটার জবাবে নাযিল হয়েছিল ‘খাতামান নাবিয়্যীন’?

মক্কার শত্রুরা মহানবী (সা.)-কে বলত ‘নির্বংশ’। আল্লাহ সেই খোঁটার জবাব দিলেন এমন এক উপাধি দিয়ে, যা কিয়ামত পর্যন্ত তাঁর মর্যাদার ঘোষণা।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

মক্কার একটি বিষণ্ণ দিন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ছোট্ট ছেলে কাসেম মারা গেছেন। বাবার বুক তখনো শোকে ভারী। ঠিক তখনই মক্কার এক নেতা, আস ইবনে ওয়ায়েল, ঠাট্টা করে বলে বসল, “এ তো আবতার!” অর্থাৎ নির্বংশ, যার কোনো উত্তরসূরি থাকবে না।

আরবদের কাছে এটি ছিল বড় অপমান। তারা ভাবত, ছেলে না থাকলে মানুষের নাম আর কাজ তার মৃত্যুর সঙ্গেই মুছে যায়। শত্রুরা আশায় বুক বাঁধল, এই মানুষটি চলে গেলে তাঁর দাওয়াতও শেষ হয়ে যাবে।

প্রথম জবাব: সূরা কাওসার

আল্লাহ তাঁর রসূলকে একা ছেড়ে দেননি। সূরা কাওসার নাযিল হলো। আলইসলাম ডট অর্গে উদ্ধৃত তফসীরে জালালাইনের বর্ণনা অনুযায়ী এই সূরা আস ইবনে ওয়ায়েলের ওই খোঁটার প্রেক্ষিতেই এসেছিল।

اِنَّاۤ اَعۡطَیۡنٰکَ الۡکَوۡثَرَ ؕ فَصَلِّ لِرَبِّکَ وَانۡحَرۡ ؕ اِنَّ شَانِئَکَ ہُوَ الۡاَبۡتَرُ
“নিশ্চয় আমরা তোমাকে ‘কাওসার’ দান করিয়াছি। সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে নামায পড় এবং কুরবানী কর। নিশ্চয় তোমার যে শত্রু, সে-ই নিঃসন্তান থাকিবে।”
সূরা আল-কাওসার ১০৮:২–৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ১০৮:১–৩।

অর্থাৎ নির্বংশ হবে শত্রুরাই, মুহাম্মদ (সা.) নন। তাঁকে দেওয়া হয়েছে “কাওসার”, অফুরন্ত কল্যাণের ধারা।

মদীনায় আরেকটি খোঁটা

বছর গড়াল। মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করলেন। তাঁর পালকপুত্র ছিলেন হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা.)। লোকে তাঁকে “মুহাম্মদের ছেলে যায়েদ” বলেই ডাকত।

তারপর কুরআন জানিয়ে দিল, পালকপুত্র আসল পুত্র নয়। তাদেরকে তাদের নিজের বাবার নামেই ডাকতে হবে।

وَمَا جَعَلَ اَدۡعِیَآءَکُمۡ اَبۡنَآءَکُمۡ
“…এবং তিনি তোমাদের পোষ্য-পুত্রকে তোমাদের (ঔরসজাত) পুত্র বানান নাই…”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৫

শত্রুদের হাতে যেন নতুন অস্ত্র উঠল। তারা বলতে লাগল, নিজের ছেলেরা তো আগেই মারা গেছে, এখন পালকপুত্রের সম্পর্কও শেষ। এবার সত্যিই এই মানুষটির কোনো উত্তরসূরি রইল না।

ঠিক এই পটভূমিতে, হিজরতের পঞ্চম বছরে, নাযিল হলো সেই বিখ্যাত আয়াত:

مَا کَانَ مُحَمَّدٌ اَبَاۤ اَحَدٍ مِّنۡ رِّجَالِکُمۡ وَلٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَخَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا
“মুহাম্মদ তোমাদের পুরুষদের মধ্যে কাহারও পিতা নহে, কিন্তু সে আল্লাহ্‌র রসূল এবং নবীগণের মোহর; এবং আল্লাহ্ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞানী।”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১
✦

“কিন্তু” শব্দটির ভেতরের কথা

আয়াতটি মন দিয়ে পড়ুন। প্রথম অংশে আল্লাহ শত্রুদের একটি কথা মেনে নিচ্ছেন: হ্যাঁ, মুহাম্মদ (সা.) তোমাদের কোনো পুরুষের দৈহিক পিতা নন।

তারপর আসে আরবি শব্দ লাকিন, অর্থাৎ “কিন্তু”। এই শব্দ বলে দেয়, এখন খোঁটার জবাব আসছে। জবাবটি হলো: তিনি আল্লাহর রসূল, আর তিনি “খাতামান নাবিয়্যীন”, নবীগণের মোহর।

এবার ভাবুন। শত্রুরা বলছিল, তাঁর কোনো উত্তরসূরি নেই। জবাবে যদি শুধু বলা হয়, “তিনি শেষ নবী, তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই”, তাহলে তো খোঁটাটা আরও পোক্ত হয়। শত্রুরা বলতে পারত, দৈহিক সন্তানও নেই, আধ্যাত্মিক উত্তরসূরিও নেই।

আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত আহমদী মুসলমানদের ব্যাখ্যা ঠিক এই কথাই বলে। প্রসঙ্গ অনুযায়ী “নবীগণের মোহর” মানে, মুহাম্মদ (সা.)-এর আধ্যাত্মিক সন্তানরা হবেন অতি উঁচু মর্যাদার। একজন নবীর অনুসারীদের তাঁর আধ্যাত্মিক সন্তান বলা হয়। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁদের কেউ কেউ এত উঁচুতে উঠবেন যে নবুয়্যতের মর্যাদাও পাবেন, তবে তাঁর মোহরের সত্যায়ন নিয়ে।

অর্থাৎ দৈহিক বংশধারা না থাকলেও, তিনি এক অফুরন্ত আধ্যাত্মিক বংশধারার পিতা। এই জবাব সূরা কাওসারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও পুরোপুরি মিলে যায়।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ও খলীফাদের ব্যাখ্যা

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ, মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মহানবী (সা.) নবীগণের মোহর এই কারণে নন যে তাঁর পরে কেউ আধ্যাত্মিক কল্যাণ পাবে না। বরং এই কারণে যে তাঁর মোহরের সত্যায়ন ছাড়া কেউ কোনো কল্যাণ পেতে পারবে না, আর তাঁর উম্মতের জন্য আল্লাহর সঙ্গে বাক্যালাপের দরজা কখনো বন্ধ হবে না (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২৯–৩০)।

হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ, খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.) তফসীরে সগীরে এই আয়াতের টীকায় লিখেছেন: এর অর্থ, তাঁর সত্যায়ন আর তাঁর শিক্ষার সাক্ষ্য ছাড়া কেউ নবুয়্যত বা বেলায়েতের মর্যাদা পেতে পারে না (তফসীরে সগীর, পৃষ্ঠা ৫৫১)।

তাই এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর প্রশংসার আয়াত। এটি তাঁর অপমানের জবাব, তাঁর মর্যাদার ঘোষণা। নির্বংশ বলে যারা খোঁটা দিয়েছিল, ইতিহাসে তাদের নাম মুছে গেছে। আর মুহাম্মদ (সা.)-এর আধ্যাত্মিক সন্তানরা আজও পৃথিবীর কোণে কোণে তাঁর নাম উঁচু করে চলেছেন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

এই আয়াত তো শুধু যায়েদ (রা.)-এর বিষয়ে, আধ্যাত্মিক পিতৃত্বের কথা এল কোথা থেকে?

এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতের উদ্দেশ্য শুধু এটুকু জানানো যে যায়েদ (রা.) মহানবী (সা.)-এর ছেলে নন। চলুন দেখি, একই সূরা নিজে কী বলে। এই আয়াতের কিছু আগেই আল্লাহ জানিয়েছেন:

اَلنَّبِیُّ اَوۡلٰی بِالۡمُؤۡمِنِیۡنَ مِنۡ اَنۡفُسِہِمۡ وَاَزۡوَاجُہٗۤ اُمَّہٰتُہُمۡ
“এই নবী মো’মেনগণের জন্য তাহাদের প্রাণাপেক্ষা নিকটতর এবং তাহার পত্নীগণ তাহাদের মাতা।…”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৭

নবী (সা.)-এর পত্নীরা যদি সব মু’মিনের মা হন, তাহলে আধ্যাত্মিক অর্থে নবী (সা.) কী? উত্তর নিজেই স্পষ্ট। তাই “কারো পিতা নন” বলার পর “কিন্তু” দিয়ে যে জবাব আসে, তা এই আধ্যাত্মিক পিতৃত্বেরই ঘোষণা। দৈহিক পিতৃত্ব অস্বীকার করা হয়েছে, আধ্যাত্মিক পিতৃত্ব নয়।

অনেক তফসীরে তো লেখা, খাতামান নাবিয়্যীন মানে শেষ নবী?

আহমদী মুসলমানরাও মানেন, মহানবী (সা.) শরীয়তবাহী নবীদের মধ্যে শেষ। প্রশ্ন হলো, এর অর্থ কি সব ধরনের নবুয়্যতের পুরোপুরি সমাপ্তি? উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষদের কয়েকজন তা মনে করেননি।

উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেছেন: “তোমরা বলো, তিনি খাতামান নাবিয়্যীন; কিন্তু এ কথা বলো না যে তাঁর পরে কোনো নবী নেই” (আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৬১৮)। আর বিখ্যাত হানাফী আলেম মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেছেন, খাতামান নাবিয়্যীনের অর্থ শুধু এই যে, তাঁর পরে এমন কোনো নবী আসবেন না যিনি নতুন শরীয়ত আনবেন এবং তাঁর উম্মতের অনুসারী হবেন না (আল-আসরারুল মারফূআ, পৃষ্ঠা ১৯২)। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্বাস ঠিক এটাই।

তাহলে কি যে কেউ নবী দাবি করতে পারে?

একদমই না। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) স্পষ্ট লিখেছেন: শরীয়তবাহী কোনো নবী তাঁর পরে আসতে পারেন না; শরীয়তবিহীন নবী আসতে পারেন, কিন্তু তাঁকে প্রথমে মহানবী (সা.)-এর উম্মতী হতে হবে; এই অর্থে তিনি নিজে উম্মতীও, নবীও (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়্যা, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৪১১–৪১২)। অর্থাৎ দরজা খোলা শুধু মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের পথে, তাঁর মোহরের অনুমোদন নিয়ে। এই দরজা তাঁর মর্যাদা কমায় না, বরং তাঁর আধ্যাত্মিক বংশধারার জীবন্ত প্রমাণ।

সংক্ষেপে

  1. ছেলে কাসেমের মৃত্যুর পর শত্রুরা মহানবী (সা.)-কে “আবতার” বা নির্বংশ বলে খোঁটা দিত; সূরা কাওসার তার জবাব।
  2. পালকপুত্র যায়েদ (রা.)-এর বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর খোঁটা আরও বাড়ে; তখন সূরা আহযাবের ৪১ নম্বর আয়াত নাযিল হয়।
  3. “লাকিন” (কিন্তু) শব্দ দেখায়, “খাতামান নাবিয়্যীন” ওই খোঁটার জবাব, তাই এটি প্রশংসা ও মর্যাদার উপাধি।
  4. প্রসঙ্গ অনুযায়ী অর্থ: দৈহিক পুত্র না থাকলেও তিনি এক মহান আধ্যাত্মিক বংশধারার পিতা, যাঁর মোহর ছাড়া কেউ আল্লাহর কল্যাণ পায় না।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.