নদীর তীরে এক মা দাঁড়িয়ে আছেন। কোলে তাঁর দুধের শিশু। চারদিকে ফেরাউনের সৈন্যরা ইসরাঈলী ছেলেশিশুদের খুঁজে বেড়াচ্ছে। এমন সময় এই মা তাঁর কলিজার টুকরাকে একটি সিন্দুকে রেখে নদীর স্রোতে ভাসিয়ে দিলেন।
কোনো মা কি এমন কাজ করতে পারেন, যদি না তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত হন যে নির্দেশটি আল্লাহর কাছ থেকেই এসেছে? পবিত্র কুরআন বলছে, তিনি নিশ্চিত ছিলেন, কারণ আল্লাহ তাঁকে ওহী করেছিলেন।
মূসা (আ.)-এর মা নবী ছিলেন না। তবু আল্লাহর কথার ওপর তাঁর আস্থা ছিল এতটাই পাকা যে, সন্তানকে নদীতে ভাসাতেও তিনি দ্বিধা করেননি। এই ছবিটি মনে রেখে আমরা একটি আপত্তির দিকে তাকাই।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, তিনি নিজের প্রতি অবতীর্ণ ওহীর ওপর সেভাবেই ঈমান রাখেন, যেভাবে কুরআনের ওপর ঈমান রাখেন। বিরোধীরা বলেন, এভাবে তিনি নিজের ইলহামকে কুরআনের সমান করে ফেলেছেন।
প্রথমে মূল কথাটি পুরো প্রসঙ্গসহ দেখা দরকার। তাঁর “এক গলতী কা ইযালা” (একটি ভুলের অপনোদন) পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন:
“যিনি আমাকে পাঠিয়েছেন সেই খোদার কসম, আর অভিশপ্ত তারা যারা তাঁর নামে মিথ্যা রচনা করে, তিনি আমাকে প্রতিশ্রুত মসীহরূপে পাঠিয়েছেন। আমি যেমন পবিত্র কুরআনের আয়াতসমূহের ওপর ঈমান রাখি, ঠিক তেমনি বিন্দুমাত্র পার্থক্য ছাড়াই সেই সুস্পষ্ট ওহীর ওপরও ঈমান রাখি যা আমার ওপর নাযিল হয়েছে, এবং যার সত্যতা খোদা বারবার নিদর্শন দিয়ে আমাকে দেখিয়েছেন।” (এক গলতী কা ইযালা, ইংরেজি অনুবাদ A Misconception Removed, পৃ. ৯)
ঠিক পরের অনুচ্ছেদেই তিনি বলেছেন, এই অনুগ্রহ তাঁর ওপর সরাসরি আসেনি। আকাশে এক পবিত্র সত্তা আছেন, যাঁর আধ্যাত্মিক কল্যাণ তাঁর সঙ্গে আছে, তিনি হলেন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.)। তাঁর মধ্যে বিলীন হয়েই তিনি যা পেয়েছেন, পেয়েছেন। (একই পুস্তক, পৃ. ১০-১১)
অন্য এক জায়গায় তিনি একই কথা বলেছেন: “এটি খোদার পক্ষ থেকে আমার কাছে এসেছে, এবং আমি এর ওপর সেভাবে ঈমান রাখি যেভাবে আল্লাহর কিতাবের ওপর ঈমান রাখি।” (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়া, পৃ. ২৫)
ঈমান উৎসের ওপর, মর্যাদা আলাদা বিষয়
এখানে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু সহজ পার্থক্য বুঝতে হবে। “কতটা নিশ্চিত” আর “কতটা উঁচু মর্যাদার”, এ দুটি এক প্রশ্ন নয়।
একটি উদাহরণ নিই। আপনার বাবা আপনাকে একটি চিঠি লিখলেন, আর একটি দীর্ঘ উইলও লিখে গেলেন। উইলটি অনেক বড়, পরিবারের সবার জন্য, চিরকালের নিয়ম। চিঠিটি ছোট, শুধু আপনার জন্য। কিন্তু দুটিই যে বাবার হাতের লেখা, এ বিষয়ে আপনার নিশ্চয়তা একই রকম।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ঠিক এ কথাই বলেছেন। কুরআন আল্লাহর বাণী, তাতে সন্দেহ নেই। তাঁর ওপর যে ওহী এসেছে, সেটিও একই আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে বলে তিনি নিশ্চিত। উৎস যেহেতু এক, তাই নিশ্চয়তাও এক। কিন্তু তিনি কোথাও বলেননি যে তাঁর ইলহাম নতুন শরীয়ত, বা কুরআনের কোনো বিধান বদলাতে পারে।
পবিত্র কুরআন নিজেই জানায়, আল্লাহ মানুষের সঙ্গে কয়েকটি উপায়ে কথা বলেন:
আর যাঁরা আল্লাহকে প্রতিপালক মেনে অবিচল থাকেন, তাঁদের ওপর ফিরিশতা নাযিল হওয়ার কথাও কুরআনে আছে:
এখন ভাবুন, আল্লাহ যদি কারও সঙ্গে সত্যিই কথা বলেন, তাহলে সেই ব্যক্তির কী করা উচিত? সন্দেহ করা? মূসা (আ.)-এর মা যদি সন্দেহ করতেন, তাহলে শিশুটিকে নদীতে ভাসাতেন না। ঈসা (আ.)-এর হাওয়ারীদের প্রতিও আল্লাহ ওহী করেছিলেন, আর তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে বলেছিলেন, “আমরা ঈমান আনলাম” (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১২)।
যে ব্যক্তি জানেন আল্লাহ তাঁর সঙ্গে কথা বলছেন, তিনি সেই কথাকে অবিশ্বাস করলে আসলে আল্লাহকেই অবিশ্বাস করা হয়। তাই এই ঘোষণা অহংকার নয়, বরং আল্লাহর প্রতি আনুগত্যের স্বাভাবিক প্রকাশ।
কুরআনই সবার ওপরে
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কুরআনকে কোন স্থানে রাখতেন, তা তাঁর “কিশতিয়ে নূহ” (নূহের নৌকা) পুস্তকে স্পষ্ট। তিনি তাঁর জামাতকে লিখেছেন, আকাশের নিচে কুরআন ছাড়া আর কোনো কিতাব নেই যা সরাসরি তোমাদের পথ দেখাতে পারে। কিয়ামতের দিন কুরআনই তোমাদের ঈমানের সত্যতা বা মিথ্যা প্রমাণ করবে।
তিনি আরও লিখেছেন, যারা প্রতিটি হাদীস ও প্রতিটি কথার ওপর কুরআনকে অগ্রাধিকার দেবে, আকাশে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। যিনি নিজের অনুসারীদের এভাবে শেখান, তিনি নিজের ইলহামকে কুরআনের প্রতিদ্বন্দ্বী বানাতে পারেন না।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“তাহলে কি তিনি নিজের ইলহামকে কুরআনের সমান মর্যাদা দিলেন?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, “একই রকম ঈমান” মানেই “একই রকম মর্যাদা”। চলুন দেখি তিনি নিজে কী বলেছেন। একই পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন, যেখানেই তিনি নবী বা রসূল হওয়া অস্বীকার করেছেন, তা এই অর্থে যে তিনি কোনো নতুন শরীয়ত আনেননি। আর “কিশতিয়ে নূহ”-এ তিনি কুরআনকে পথনির্দেশের প্রথম ও প্রধান উৎস বলেছেন। তাঁর দাবি ছিল আনুগত্যের, প্রতিদ্বন্দ্বিতার নয়। ঈমানের নিশ্চয়তা এক, কিন্তু কুরআন শরীয়তের চিরস্থায়ী কিতাব, আর তাঁর ওহী সেই কিতাবের সেবক।
“কুরআনের পর কি ওহীর দরজা বন্ধ নয়?”
শরীয়তবাহী ওহীর দরজা বন্ধ, এ বিষয়ে আহমদীয়া মুসলিম জামাত পুরোপুরি একমত। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে বাক্যালাপের দরজা বন্ধ হয়নি। ওপরের সূরা হা-মীম আস-সাজদার আয়াতে ফিরিশতা নাযিলের কথা কোনো নবীর জন্য নয়, অবিচল মু'মিনদের জন্য বলা হয়েছে। “কিশতিয়ে নূহ”-এ হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, আল্লাহ এই উম্মতকে ওহী, ইলহাম ও বাক্যালাপের নেয়ামত থেকে কখনো বঞ্চিত করবেন না। ইসলামের ইতিহাসে বহু ওলী-আল্লাহ ইলহামের কথা লিখে গেছেন; এমন ত্রিশজন বুযুর্গের নাম পাওয়া যায়। তাই শরীয়তবিহীন ওহী কুরআনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক নয়।
“কেউ যদি ভুল করে নিজের কল্পনাকে ওহী ভাবেন?”
এই প্রশ্নটি ন্যায্য, আর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেও এর উত্তর দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, সাধারণ ওলীদের ইলহাম বারবার আসার মাধ্যমে নির্ভরযোগ্য হয়, কিন্তু নবীদের ওহী সূর্যের আলোর মতো সন্দেহের অন্ধকার দূর করে (বারাহীনে আহমদীয়া, পৃ. ২৩৪ টীকা)। নিজের বেলায় তিনি পরীক্ষার মানদণ্ডও দিয়েছেন: প্রায় দেড়শো ভবিষ্যদ্বাণী তিনি পূর্ণ হতে দেখেছেন (এক গলতী কা ইযালা, ইংরেজি অনুবাদ A Misconception Removed, পৃ. ৯)।
আর যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে, কুরআন তার পরিণতিও জানিয়ে দিয়েছে:
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজের ইলহাম প্রকাশ্যে ঘোষণা করার পর বহু বছর বেঁচে ছিলেন, তাঁর জামাত দিনে দিনে বেড়েছে। “কিশতিয়ে নূহ”-এ তিনি নিজেই সতর্ক করেছেন, যে আল্লাহর নামে মিথ্যা ওহীর দাবি করে, সে ধ্বংস হবে। যিনি এ কথা লেখেন, তিনি জেনেশুনে নিজের ধ্বংস ডেকে আনবেন, এটা বিশ্বাসযোগ্য নয়।
সিদ্ধান্ত পরিষ্কার: আল্লাহর কথাকে আল্লাহর কথা বলে পূর্ণ বিশ্বাস করাই ঈমান। এতে কুরআনের অবমাননা নেই, বরং কুরআনেরই শিক্ষার প্রতিফলন আছে।
সংক্ষেপে
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) বলেছেন, তাঁর ওহী যে আল্লাহর কাছ থেকে এসেছে, এতে তাঁর কোনো সন্দেহ নেই, যেমন কুরআন আল্লাহর বাণী হওয়াতে সন্দেহ নেই।
- এটি উৎস নিয়ে নিশ্চয়তার কথা; মর্যাদায় কুরআন শরীয়তের চিরস্থায়ী কিতাব, আর তাঁর ওহী মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের ফল।
- কুরআন নিজেই মূসা (আ.)-এর মা ও হাওয়ারীদের প্রতি ওহীর কথা বলে, আর তাঁরা সেই ওহীতে পূর্ণ আস্থা রেখেছিলেন।
- তিনি কুরআনকে প্রতিটি হাদীস ও প্রতিটি কথার ওপর স্থান দিতে শিখিয়েছেন; তাই এই আপত্তি টেকে না।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Concept of Revelation in Islam · alislam.org
- A Misconception Removed (Eik Ghalati Ka Izala) · alislam.org
- Noah's Ark: Our Teaching · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.