ধরুন, কেউ একটি বইয়ের এক পৃষ্ঠা থেকে একটি বাক্য তুলে প্রশ্ন করলেন, “এ কথার প্রমাণ কোথায়?” অথচ সেই পৃষ্ঠারই নিচে, টীকায়, লেখক প্রমাণের নাম লিখে দিয়েছেন। তখন প্রশ্নটি আর লেখকের দুর্বলতা দেখায় না, দেখায় পাঠের অসম্পূর্ণতা।
আজকের আপত্তিটির গল্প অনেকটা এমনই।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর একটি পুস্তকে লিখেছেন, হাদীসে আছে, আদম থেকে শেষ পর্যন্ত দুনিয়ার বয়স সাত হাজার বছর (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ২৪৫)। একটি আপত্তিমূলক বইয়ে এই বাক্যটি তুলে প্রশ্ন করা হয়েছে, এ কথা কোথায় আছে? দাবি করা হয়েছে, এটি কুরআন-সুন্নাহর নামে মনগড়া কথা।
উৎস সেখানেই লেখা আছে
আমাদের সূত্র-প্রবন্ধে দেখানো হয়েছে, যে পৃষ্ঠা থেকে বাক্যটি তোলা হয়েছে, সেখানেই হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এর উৎস উল্লেখ করেছেন: হাকীম তিরমিযী (রহ.)-এর নাওয়াদিরুল উসূল গ্রন্থে হযরত আবু হুরায়রা (রা.)-এর বর্ণনা, এবং তারীখে ইবনে আসাকির-এ হযরত আনাস ইবনে মালেক (রা.)-এর বর্ণনা। শুধু তাই নয়, বিভিন্ন বর্ণনা নিয়ে তিনি দীর্ঘ টীকায় আলোচনাও করেছেন।
অর্থাৎ যিনি বলছেন “কোথায় আছে?”, তার উত্তর সেই পৃষ্ঠাতেই ছিল। এখানে মনগড়া কিছু নেই; আছে উৎসসহ একটি বক্তব্য।
কুরআনের ভিত্তি
এই সাত হাজার বছরের হিসাবের পেছনে আছে কুরআনের সেই আয়াত, যেখানে আল্লাহর “দিন”-কে আমাদের হাজার বছরের সাথে তুলনা করা হয়েছে:
লক্ষ করুন, এই আয়াত আল্লাহর বিধান নাযিল হওয়া আর আবার উঠে যাওয়ার কথা বলছে, অর্থাৎ ধর্মের উত্থান আর পতনের কথা। তার পরিমাপ এক হাজার বছর। সপ্তাহের সাত দিনের মতো, মানবজাতির এই ধর্মীয় চক্রকেও সাত “দিন”, অর্থাৎ সাত হাজার বছরে ভাগ করে দেখা হয়েছে।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কুরআনের বিভিন্ন আয়াত, মহানবী (সা.)-এর হাদীস এবং অন্যান্য ধর্মের ইতিহাস থেকে যুক্তি দিয়েছেন যে এই মানবচক্রের আয়ু সাত হাজার বছর; মহানবী (সা.) এসেছিলেন পঞ্চম সহস্রাব্দে, আর আমরা এখন সপ্তম সহস্রাব্দে আছি। লাহোরের বক্তৃতায় তিনি বলেছিলেন, “আমরা এখন সপ্তম সহস্রাব্দের শিরোভাগে আছি… কেননা সহস্রাব্দ কেবল সাতটি, আর সবগুলোকে ভালো ও মন্দে ভাগ করা হয়েছে।” (লেকচার লাহোর, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ১৮৬)
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“নাওয়াদিরুল উসূল বা ইবনে আসাকির তো বুখারী-মুসলিম নয়”
ঠিক। কিন্তু হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এখানে বুখারী-মুসলিমের দাবিও করেননি; তিনি নিজেই কিতাবের নাম বলে দিয়েছেন। একটি হাদীস ছয় কিতাবের বাইরে হলেই বানানো হয়ে যায় না। উম্মতের আলেমরা শত শত বছর ধরে এসব গ্রন্থ থেকে বর্ণনা উদ্ধৃত করে আসছেন। তাই প্রশ্নটি বড়জোর বর্ণনার মান নিয়ে আলোচনা হতে পারে; “মনগড়া” বলার সুযোগ নেই। আর তাঁর মূল ভিত্তি তো কুরআনের হাজার বছরের “দিন”।
“বিজ্ঞান বলে মানুষ লাখো বছর ধরে পৃথিবীতে আছে, তাহলে সাত হাজার বছর কীভাবে?”
এটি সবচেয়ে বড় ভুল বোঝাবুঝি, আর এর উত্তর হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই দিয়ে গেছেন। ১৯০৮ সালের মে মাসে লাহোরে অস্ট্রেলিয়া থেকে আসা আবহাওয়াবিদ অধ্যাপক র্যাগ তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, আমেরিকা-অস্ট্রেলিয়ার মানুষও কি সেই একই আদমের সন্তান?
তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, আমরা বাইবেলের মতো মনে করি না যে ছয়-সাত হাজার বছর আগে আদমের জন্মের সাথে পৃথিবী শুরু হয়েছে আর তার আগে আল্লাহ যেন কর্মহীন বসে ছিলেন। এই আদম প্রথম মানুষ ছিলেন না; তাঁর আগেও মানুষ ছিল। কুরআনই এর ইঙ্গিত দেয়, কারণ আল্লাহ বলেছেন:
খলীফা মানে উত্তরসূরি, অর্থাৎ আগে কেউ ছিল। তাই “আদম থেকে শেষ পর্যন্ত সাত হাজার বছর” কথাটি পৃথিবী বা মানবজাতির মোট বয়স নয়; এটি বর্তমান আদমের যুগ থেকে শুরু হওয়া ধর্মীয় চক্রের হিসাব। এই অর্থে কথাটি বিজ্ঞানের সাথে কোনো সংঘাতে যায় না।
“তাহলে কি সাত হাজার বছর পর কিয়ামত নিশ্চিত?”
কিয়ামতের নির্দিষ্ট সময়ের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। সাত সহস্রাব্দের কথা এসেছে আধ্যাত্মিক যুগ-বিভাগের প্রসঙ্গে: কোন যুগে হেদায়াত প্রবল, কোন যুগে পথভ্রষ্টতা, আর শেষ সহস্রাব্দের সংস্কারক কে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর মূল বক্তব্য ছিল, আমরা শেষ সহস্রাব্দের শুরুতে আছি, তাই এই যুগের প্রতিশ্রুত সংস্কারকের আসার সময় হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আপত্তিটি একটি বাক্যকে তার প্রসঙ্গ আর তার টীকা থেকে আলাদা করে তোলা হয়েছে। প্রসঙ্গসহ পড়লে উৎসও পাওয়া যায়, অর্থও পরিষ্কার হয়।
সংক্ষেপে
- যে পৃষ্ঠা থেকে আপত্তি তোলা হয়, সেখানেই নাওয়াদিরুল উসূল ও তারীখে ইবনে আসাকিরের বর্ণনার উল্লেখ আছে।
- কুরআন ধর্মের উত্থান-পতনের “দিন”-কে এক হাজার বছরের সমান বলেছে (৩২:৬)।
- সাত হাজার বছর বর্তমান আদমের যুগের ধর্মীয় চক্রের হিসাব; হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই বলেছেন, এই আদমের আগেও মানুষ ছিল।
- তাঁর মূল কথা: আমরা শেষ সহস্রাব্দের শুরুতে আছি, আর এটিই প্রতিশ্রুত সংস্কারকের সময়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Nubuwwat and Mujaddidiyyat · alislam.org
- Man Lived on Earth Even Before the Advent of Adam · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.