হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তখন অচেনা একজন মানুষ। ইসলামের পক্ষে প্রথম বড় বই বারাহীনে আহমদীয়া লেখা শেষ। কিন্তু ছাপানোর টাকা নেই, আর তাঁকে কেউ চেনেও না।
তিনি আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন। ইলহাম হলো: “হুযযী ইলাইকি বিজিযইন নাখলাতি তুসাকিত আলাইকি রুতাবান জানিয়্যা”, অর্থাৎ “খেজুর গাছের কাণ্ড নাড়া দাও, তোমার ওপর তাজা পাকা খেজুর ঝরে পড়বে।”
এই নির্দেশ মেনে তিনি পাতিয়ালা রাজ্যের মন্ত্রী খলীফা সৈয়দ মুহাম্মদ হাসান সাহেবকে চিঠি লিখলেন। তিনি সঙ্গে সঙ্গে আড়াইশো টাকা পাঠালেন, পরে আবার আড়াইশো। আরও কয়েকজন সাহায্য করলেন, আর বইটি ছাপা হলো। (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫০)
কিন্তু লক্ষ করুন, ইলহামের শব্দগুলো কুরআনের। ঠিক এই কথাগুলো আল্লাহ বলেছিলেন হযরত মরিয়ম (আ.)-কে:
একজন পুরুষকে কেন মরিয়মের মতো সম্বোধন করা হলো? এই প্রশ্নের উত্তরেই লুকিয়ে আছে আজকের আপত্তির জবাব।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) দাবি করেছেন কুরআনে তাঁর নাম ইবনে মরিয়ম রাখা হয়েছে। অথচ কুরআনের কোথাও তাঁর নাম নেই। কুরআনে ইবনে মরিয়ম বলতে কেবল হযরত ঈসা (আ.)-কে বোঝানো হয়েছে। তাহলে এটি কি কুরআনের নামে একটি ভিত্তিহীন দাবি নয়?
তিনি আসলে কী বলেছেন?
যে লেখাটি নিয়ে আপত্তি, সেটি হাকীকাতুল ওহী-র একটি টীকা। তিনি সেখানে দুটি আলাদা কথা বলেছেন, আর দুটিকে আলাদা রাখাই এই আলোচনার চাবি।
প্রথম কথা: বারাহীনে আহমদীয়া-য় আল্লাহ প্রথমে তাঁর নাম রেখেছেন মরিয়ম, তারপর বলেছেন, এই মরিয়মের মধ্যে সত্যের রূহ ফুঁকে দেওয়ার পর তার নাম রাখা হলো ঈসা। এভাবেই তিনি “খোদার কালামে”, অর্থাৎ তাঁর ওপর নাযিল হওয়া ওহীতে, ইবনে মরিয়ম নামে অভিহিত হলেন।
দ্বিতীয় কথা: কুরআন শরীফেও এ বিষয়ে একটি ইঙ্গিত আছে, যা তাঁর জন্য ভবিষ্যদ্বাণী। কুরআন এই উম্মতের কিছু মানুষকে মরিয়মের সাথে তুলনা করেছে, তারপর বলেছে সেই মরিয়মের মধ্যে রূহ ফুঁকে দেওয়া হলো। (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫০–৩৫১, টীকা)
অর্থাৎ তিনি কখনো বলেননি যে কুরআনে “মির্যা গোলাম আহমদ” নামটি লেখা আছে। তিনি বলেছেন, কুরআনে একটি ভবিষ্যদ্বাণী আছে, আর সেই ভবিষ্যদ্বাণীর বাস্তব রূপ তিনি।
সূরা তাহরীমের সেই আয়াত
সূরা আত-তাহরীমের শেষে আল্লাহ মুমিনদের জন্য দুটি উপমা দিয়েছেন। প্রথমটি ফেরাউনের স্ত্রী। দ্বিতীয়টি এই:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) যুক্তিটি এভাবে সাজিয়েছেন। আয়াতটি বলছে, এই উম্মতের কিছু মানুষের দৃষ্টান্ত মরিয়ম। কিন্তু উম্মতের “মরিয়ম” আগের মরিয়মের সাথে পুরোপুরি তখনই মিলবে, যখন তার মধ্যেও ঈসার রূহ ফুঁকে দেওয়া হবে; কারণ আয়াতেই রূহ ফুঁকে দেওয়ার কথা আছে। আর আল্লাহর কালাম মিথ্যা হতে পারে না; এই উম্মতে এর বাস্তব রূপ কেউ না কেউ হবেনই। (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫১, টীকা)
খুতবা ইলহামিয়া গ্রন্থে তিনি আরবীতে আরও স্পষ্ট লিখেছেন: সূরা তাহরীমে আল্লাহ মুমিনদের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন যে তাদের মধ্য থেকেই একজন ইবনে মরিয়ম সৃষ্টি করবেন। এই উম্মতের একজনের নাম রাখা হবে ইবনে মরিয়ম, আর পূর্ণ তাকওয়ার পর তার মধ্যে রূহ ফুঁকে দেওয়া হবে। (রূহানী খাযায়েন, ১৬শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৯)
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
আয়াতে তো ইমরানের কন্যা মরিয়মের কথা, অন্য কারো নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতটি একটি ঐতিহাসিক ঘটনা মাত্র। চলুন দেখি। ঠিক আগের আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে, আল্লাহ এই উপমাগুলো দিয়েছেন “যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদের জন্য” (৬৬:১২)। উপমা দেওয়া হয় এজন্য যে তার মতো কেউ হবে। শুধু অতীতের গল্প হলে “মুমিনদের জন্য উপমা” বলার প্রয়োজন হতো না।
আর ঐতিহাসিক মরিয়ম (আ.)-কে কেউ অস্বীকার করছে না। প্রশ্ন হলো, মুমিনদের মধ্যে “মরিয়মের মতো” কে হবেন, আর তাঁর মধ্যে কী ফুঁকে দেওয়া হবে। আয়াতের ভাষাই একে ভবিষ্যতের মুমিনদের সাথে যুক্ত করেছে।
ইবনে মরিয়ম তো বনী ইসরাঈলের ঈসা (আ.), যিনি ফিরে আসবেন?
মহানবী (সা.)-এর একটি হাদীস এ প্রশ্নে আলো ফেলে:
“তোমাদেরই মধ্য থেকে” কথাটি বলছে, প্রতিশ্রুত ইবনে মরিয়ম আসবেন এই উম্মতের ভেতর থেকে। খুতবা ইলহামিয়া-য় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সূরা নূরের প্রতিশ্রুতির “মিনকুম” (তোমাদের মধ্য থেকে) শব্দটিকেও এর প্রমাণ হিসেবে দেখিয়েছেন। আর কুরআন সাক্ষ্য দেয়, ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১৮)। তাই যে ইবনে মরিয়মের অপেক্ষা, তিনি উম্মতের ভেতর থেকেই আসার কথা।
এটা কি পরে বানানো ব্যাখ্যা নয়?
এর উত্তর তিনি নিজেই দিয়েছেন, আর সেটি বেশ শক্ত। বারাহীনে আহমদীয়া-য় যখন “মরিয়ম” আর “ঈসা” নামের ইলহামগুলো ছাপা হয়, তখন তিনি নিজেই এর অর্থ জানতেন না। সেই বইয়েই তিনি প্রচলিত বিশ্বাস লিখেছিলেন যে ঈসা (আ.) আকাশ থেকে ফিরবেন। তাঁর ভাষায়, এই বিশ্বাস লিখে রাখাই সাক্ষী যে তিনি কিছু বানাননি; আল্লাহ বুঝিয়ে দেওয়ার আগে তিনি নিজেও বোঝেননি। (রূহানী খাযায়েন, ২২শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫১, টীকা)
তিনি একটি চ্যালেঞ্জও রেখেছেন: তেরোশো বছরে আর কেউ কি দাবি করেছেন যে আল্লাহ প্রথমে তাঁর নাম মরিয়ম রেখেছেন, তারপর সেই মরিয়মে রূহ ফুঁকে তাঁকে ঈসা বানিয়েছেন? পৃথিবী খুঁজে দেখার আহ্বান তিনি দিয়েছিলেন; এমন দ্বিতীয় দাবিদার কেউ দেখাতে পারেননি।
সংক্ষেপে
- তিনি বলেননি যে কুরআনে তাঁর ব্যক্তিগত নাম লেখা আছে; বলেছেন সূরা তাহরীমে একটি ইঙ্গিত ও ভবিষ্যদ্বাণী আছে।
- সূরা তাহরীম মরিয়ম (আ.)-কে “মুমিনদের জন্য উপমা” বানিয়েছে, আর সেই উপমায় রূহ ফুঁকে দেওয়ার কথাও আছে।
- বারাহীনে আহমদীয়া-র ইলহামে তাঁকে প্রথমে মরিয়ম, পরে ঈসা বলা হয়েছে, যখন তিনি নিজেও এর অর্থ জানতেন না।
- “তোমাদের ইমাম তোমাদের মধ্য থেকে” হাদীসটিও বলে, প্রতিশ্রুত ইবনে মরিয়ম এই উম্মত থেকেই আসবেন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.