মদিনার সবচেয়ে কঠিন দিনে একটি আয়াত কী শিখিয়েছিল?

মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের দিন হযরত উমর (রা.) তলোয়ার হাতে দাঁড়িয়ে। তারপর হযরত আবু বকর (রা.) একটি আয়াত পড়লেন, আর সব সাহাবী একমত হলেন। সেই একমত্যের মধ্যেই আছে ঈসা (আ.)-এর প্রশ্নের উত্তর।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla · Read in English →

হিজরি এগারো সাল। মদিনার আকাশ ভারী। খবর ছড়িয়ে পড়েছে, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) আর নেই। সাহাবীরা (রা.) স্তব্ধ। কেউ কাঁদছেন, কেউ কথা বলতে পারছেন না।

মসজিদে নববীতে দাঁড়িয়ে আছেন হযরত উমর (রা.)। শোকে তিনি এতটাই বিহ্বল যে বলে চলেছেন, “আল্লাহর কসম, আল্লাহর রসূল (সা.) মারা যাননি!” তাঁর বিশ্বাস, মহানবী (সা.) আবার ফিরে আসবেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৬৬৮)। হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.) তাঁর “দাওয়াতুল আমীর” গ্রন্থে এই ঘটনা বর্ণনা করে লিখেছেন, হযরত উমর (রা.) তখন মূসা (আ.)-এর দৃষ্টান্ত দিচ্ছিলেন, যিনি আল্লাহর ডাকে চল্লিশ দিনের জন্য জাতি থেকে দূরে ছিলেন।

হযরত আবু বকর (রা.) এলেন

হযরত আবু বকর (রা.) তখন মদিনার বাইরে, সুনহ নামক জায়গায়। খবর পেয়ে তিনি ঘোড়ায় চড়ে ছুটে এলেন। কারও সঙ্গে কথা না বলে সোজা হযরত আয়েশা (রা.)-এর ঘরে গেলেন। মহানবী (সা.)-এর মুখ থেকে চাদর সরালেন, ঝুঁকে চুমু খেলেন, কাঁদলেন। বললেন, “আমার পিতা-মাতা আপনার জন্য কুরবান! আল্লাহ আপনাকে দুইবার মৃত্যু দেবেন না। যে মৃত্যু আপনার জন্য লেখা ছিল, তা আপনি পেয়ে গেছেন।”

তারপর তিনি বাইরে এলেন। মানুষ উমর (রা.)-কে ছেড়ে তাঁর দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তিনি বললেন:

مَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ مُحَمَّدًا صلى الله عليه وسلم فَإِنَّ مُحَمَّدًا قَدْ مَاتَ، وَمَنْ كَانَ مِنْكُمْ يَعْبُدُ اللَّهَ فَإِنَّ اللَّهَ حَىٌّ لاَ يَمُوتُ
“তোমাদের মধ্যে যে মুহাম্মদ (সা.)-এর ইবাদত করত, সে জেনে রাখুক, মুহাম্মদ (সা.) মারা গেছেন। আর তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহর ইবাদত করে, সে জেনে রাখুক, আল্লাহ চিরঞ্জীব, তিনি কখনো মরেন না।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, মহানবী (সা.)-এর অসুস্থতা ও ইন্তেকাল অধ্যায়, হাদীস ৪৪৫৪

এরপর তিনি প্রমাণ হিসেবে কুরআনের এই আয়াতটি তিলাওয়াত করলেন:

وَمَا مُحَمَّدٌ اِلَّا رَسُوۡلٌ ۚ قَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِہِ الرُّسُلُ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مَّاتَ اَوۡ قُتِلَ انۡقَلَبۡتُمۡ عَلٰۤی اَعۡقَابِکُمۡ
“এবং মুহাম্মদ কেবল একজন রসূল। তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে। অতএব, সে যদি মৃত্যু বরণ করে অথবা নিহত হয়, তাহা হইলে তোমরা কি তোমাদের গোড়ালির উপর (তৎক্ষণাৎ পশ্চাতে) ফিরিয়া যাইবে?…”
সূরা আলে ইমরান ৩:১৪৫
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩:১৪৪।

হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, আল্লাহর কসম, মনে হচ্ছিল যেন মানুষ জানতই না যে আল্লাহ এই আয়াত নাযিল করেছেন, যতক্ষণ না আবু বকর (রা.) তা পাঠ করলেন। এরপর সবাই আয়াতটি তাঁর কাছ থেকে শিখে নিল, আর যাকেই শুনতাম, সে এটিই পড়ছিল। হযরত উমর (রা.) নিজে বলেছেন, আবু বকর (রা.)-কে আয়াতটি পড়তে শুনে তাঁর পা আর ভার বইতে পারল না, তিনি মাটিতে বসে পড়লেন। তিনি বুঝে গেলেন, মহানবী (সা.) সত্যিই ইন্তেকাল করেছেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৪৫৪)।

✦

যুক্তিটি কী ছিল?

হযরত আবু বকর (রা.)-এর যুক্তি ছিল খুব সরল। মহানবী (সা.)-এর আগে যত রসূল এসেছেন, সবাই মারা গেছেন। এটিই আল্লাহর নিয়ম। তাহলে মহানবী (সা.) কেন এই নিয়মের বাইরে থাকবেন?

এখন ভাবুন, সেদিন যদি কোনো সাহাবীর মনে এই বিশ্বাস থাকত যে ঈসা (আ.) ছয়শো বছর ধরে আকাশে জীবিত আছেন, তাহলে কী হতো? তিনি সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে বলতেন, “আবু বকর, আপনার যুক্তি তো ঠিক নয়! সব রসূল মারা যাননি, ঈসা (আ.) তো জীবিত। তিনি যদি জীবিত থাকতে পারেন, আমাদের প্রিয় নবী (সা.) কেন পারবেন না?”

কিন্তু কেউ এ কথা বলেননি। বরং সবাই আয়াতটি মেনে নিলেন, শোকের মধ্যেও শান্ত হলেন, আর মদিনার পথে পথে আয়াতটি পড়তে লাগলেন। আলইসলাম.অর্গে উদ্ধৃত “দাওয়াতুল আমীর” গ্রন্থের ভাষায়, মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর সাহাবীদের প্রথম সম্মিলিত সিদ্ধান্ত, অর্থাৎ প্রথম ইজমা, ছিল এটিই: মহানবী (সা.)-এর আগের সব নবী মারা গেছেন, কোনো ব্যতিক্রম নেই।

এখানে আরেকটি সূক্ষ্ম বিষয় আছে। আয়াতে “গত হওয়া”র মাত্র দুটি পথ বলা হয়েছে: মাতা, স্বাভাবিক মৃত্যু, অথবা কুতিলা, নিহত হওয়া। জীবিত অবস্থায় আকাশে চলে যাওয়ার মতো তৃতীয় কোনো পথ যদি থাকত, আল্লাহ তা উল্লেখ করতেন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“আর-রুসুল” মানে কি “সকল রসূল”, নাকি শুধু “অনেক রসূল”?

এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতের অর্থ “তাঁর আগে অনেক রসূল গত হয়েছেন”, সবাই নয়; তাই কেউ কেউ জীবিত থাকতে পারেন। চলুন দেখি। আরবিতে “আল” যুক্ত বহুবচন আর-রুসুল এখানে পুরো রসূল-জাতিকে বোঝায়। আর আহমদীয়া অনুবাদে তাই লেখা “তাহার পূর্বেকার সকল রসূল অবশ্যই মারা গিয়াছে।”

তা ছাড়া একটু ভাবুন। “অনেকে মারা গেছেন” বললে মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর পক্ষে যুক্তিই দাঁড়ায় না। কারণ তখন বলা যেত, “তাহলে তিনিও হয়তো সেই জীবিতদের দলে।” আবু বকর (রা.)-এর যুক্তি কাজ করেছিল ঠিক এ কারণেই যে আয়াতটি সবাইকে নিয়ে কথা বলছে। কেউ যদি বলেন কিছু রসূল এখনো জীবিত, তাঁকে কুরআন থেকে সেই তালিকা দেখাতে হবে। একই শব্দবন্ধ আল্লাহ ঈসা (আ.)-এর জন্যও ব্যবহার করেছেন: “মরিয়মের পুত্র মসীহ্‌ ছিল কেবল এক রসূল, তাহার পূর্বে সকল রসূল মারা গিয়াছে” (সূরা আল-মায়েদা ৫:৭৬)।

“খালাত” মানে তো শুধু “অতিক্রান্ত হয়েছেন”, মৃত্যু নয়?

আয়াতটি নিজেই এর জবাব দিয়েছে। “গত হওয়া”র কথা বলার পরপরই আল্লাহ বলছেন, “সে যদি মৃত্যু বরণ করে অথবা নিহত হয়।” অর্থাৎ এখানে গত হওয়ার ধরন বলে দেওয়া হয়েছে: মৃত্যু বা নিহত হওয়া। আর সাহাবীরাও আয়াতটি থেকে ঠিক এটিই বুঝেছিলেন। নইলে মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর প্রমাণ হিসেবে এই আয়াত পড়ার কোনো মানে হতো না। কুরআনে এই শব্দের ব্যবহার নিয়ে আমাদের আলাদা একটি লেখা আছে।

সাহাবীরা হয়তো সেদিন ঈসা (আ.)-এর কথা ভাবেননি?

কেউ বলেন, শোকের মধ্যে তাঁরা হয়তো ঈসা (আ.)-এর কথা মনেই আনেননি। কিন্তু খেয়াল করুন, হযরত উমর (রা.) নিজেই একটি দৃষ্টান্ত খুঁজছিলেন, যাতে প্রমাণ হয় একজন নবী কিছু সময়ের জন্য চলে গিয়ে আবার ফিরে আসতে পারেন। “দাওয়াতুল আমীর” অনুযায়ী, তিনি দৃষ্টান্ত দিলেন মূসা (আ.)-এর চল্লিশ দিনের অনুপস্থিতির। যদি সাহাবীদের মধ্যে আকাশে জীবিত ঈসা (আ.)-এর ধারণা থাকত, তাহলে এর চেয়ে শক্তিশালী দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারত? কেউ সেটি তোলেননি, কারণ এমন বিশ্বাস তাঁদের মধ্যে ছিল না।

আজ যিনি বলেন ঈসা (আ.) জীবিত, তাঁকে ভাবতে হবে: সাহাবীরা যে আয়াত শুনে মেনে নিয়েছিলেন যে কোনো রসূল জীবিত নেই, সেই আয়াতের বিপরীত বিশ্বাস কি আমরা রাখতে পারি?

সংক্ষেপে

  1. মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের দিন হযরত আবু বকর (রা.) সূরা আলে ইমরানের ১৪৫ আয়াত পড়ে প্রমাণ করেন যে তাঁর আগের সব রসূল মারা গেছেন।
  2. উপস্থিত সাহাবীদের কেউ ঈসা (আ.)-কে ব্যতিক্রম বলেননি; এটি ছিল সাহাবীদের প্রথম ইজমা।
  3. আয়াতে গত হওয়ার মাত্র দুটি পথ: স্বাভাবিক মৃত্যু অথবা নিহত হওয়া; আকাশে জীবিত থাকার কোনো তৃতীয় পথ নেই।
  4. “আর-রুসুল” মানে সকল রসূল; নইলে আবু বকর (রা.)-এর যুক্তিই অচল হয়ে যেত।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.