কারো মৃত্যুর খবর এলে আমাদের মুখ থেকে প্রথম যে কথাটি বের হয়, তা হলো: “ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন।” নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই, আর নিশ্চয় তাঁরই দিকে ফিরে যাব।
এই কথা বলার সময় কেউ কি ভাবেন, মৃত মানুষটি এখন সশরীরে আকাশের দিকে উড়ে যাচ্ছেন? না। তাঁর দেহ তো আমরা নিজ হাতে কবরে রাখি। তবুও আমরা নিঃসংকোচে বলি, তিনি আল্লাহর দিকে ফিরে গেছেন।
অথচ ঈসা (আ.) সম্পর্কে কুরআন যখন বলে, “বরং আল্লাহ্ তাহাকে তাঁহার দিকে উন্নীত করিয়াছেন” (সূরা আন-নিসা ৪:১৫৯), তখন অনেকে ধরে নেন, “আল্লাহর দিকে” মানে আকাশের দিকে। তাই প্রশ্নটা সোজা: আল্লাহ কোথায়? তাঁর “দিক” কোনটি?
কুরআন বলে: আল্লাহ সবখানে
এই প্রশ্নের উত্তর আমাদের অনুমানের ওপর ছেড়ে দেওয়া হয়নি। আল্লাহ নিজেই বলেছেন:
শুধু আকাশে নয়, পৃথিবীতেও। আরেক জায়গায় আরও স্পষ্ট করে:
আর মানুষের কতটা কাছে তিনি? “এবং আমরা (তাহার) জীবন-শিরা অপেক্ষাও তাহার অধিকতর নিকটে আছি” (সূরা কাফ ৫০:১৭)।
এই আয়াতগুলো থেকে বোঝা যায়, আল্লাহর জন্য কোনো নির্দিষ্ট আবাস নির্ধারণ করা যায় না। তাই “আল্লাহর দিকে রাফা” মানে দেহসহ আকাশে যাওয়া জরুরি নয়। এই উন্নতি এই পৃথিবীতেই অর্জিত হয়।
তফসীরে বিষয়টি আরও সুন্দর করে বলা হয়েছে: আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে উন্নীত করেছেন নিজের দিকে, অথচ তিনি তখন সেখানেও উপস্থিত ছিলেন যেখানে ঈসা (আ.) ছিলেন। আকাশ বা পৃথিবীর কোনো জায়গা আল্লাহর উপস্থিতি থেকে খালি নয়। তাই কাউকে “তাঁর দিকে” তোলার মানে শারীরিক কোনো যাত্রা হতে পারে না।
“প্রভুর দিকে যাওয়া” কুরআনের ভাষায়
কুরআনে আরও কিছু জায়গায় “আল্লাহর দিকে যাওয়া” কথাটি এসেছে। দেখা যাক সেখানে এর অর্থ কী।
হযরত ইবরাহীম (আ.) যখন নিজের জাতিকে ছেড়ে চলে যাচ্ছিলেন, তিনি বলেছিলেন:
ইবরাহীম (আ.) কি আকাশে গিয়েছিলেন? না। তিনি এক দেশ ছেড়ে আরেক দেশে হিজরত করেছিলেন, এই পৃথিবীতেই। আল্লাহর জন্য, আল্লাহর আদেশে যাওয়াকেই কুরআন বলেছে “প্রভুর দিকে যাওয়া”।
কুরআন আরও বলে, “পবিত্র বাক্যসমূহ তাঁহারই দিকে আরোহণ করে” (সূরা আল-ফাতের ৩৫:১১)। কথার তো কোনো দেহ নেই, যা আকাশে উড়বে। আল্লাহর দিকে ওঠা মানে তাঁর কাছে গৃহীত হওয়া।
এবার একজন মুমিনের মৃত্যুর মুহূর্ত। আল্লাহ তার আত্মাকে ডাক দেন:
এখানে “প্রভুর দিকে” ফিরে যায় আত্মা, দেহ থেকে যায় মাটিতে। এই আয়াত থেকে বোঝা যায়: কুরআন বলে, পবিত্র আত্মা আল্লাহর দিকে ওঠে; কোথাও বলা হয়নি যে আত্মার সাথে দেহও আকাশে যায়। ঈসা (আ.)-এর ক্ষেত্রেও তা-ই হয়েছে। স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তাঁর পবিত্র আত্মা সব নেককার বান্দার মতো আল্লাহর দিকে উন্নীত হয়েছে।
উল্টো দিকের উদাহরণও কুরআনে আছে। যারা আল্লাহর আয়াত অহংকারভরে প্রত্যাখ্যান করে, তাদের সম্পর্কে বলা হয়েছে: “না তাহাদের জন্য আকাশের দ্বারসমূহ উন্মুক্ত করা হইবে এবং না তাহারা জান্নাতে প্রবেশ করিবে” (সূরা আল-আ’রাফ ৭:৪১)। লক্ষণীয় যে, এখানে কেউ বোঝেন না যে কাফেরদের দেহ আকাশের দরজায় গিয়ে আটকে যাবে। কথাটি মৃত্যুর পর আত্মার অবস্থা নিয়ে। একইভাবে নেককারদের জন্য আকাশ খুলে যাওয়া, আল্লাহর দিকে ওঠা, এসবও আত্মার মর্যাদার কথা।
আমাদের প্রতিদিনের ভাষাও এর সাক্ষী। জীবনের কষ্টে ক্লান্ত কেউ যখন বলেন, “আল্লাহ, আমাকে তোমার কাছে তুলে নাও”, তিনি আসলে মৃত্যু কামনা করছেন, আকাশে ওড়ার নয়। “আল্লাহর কাছে চলে গেছেন” বললে আমরা সবাই বুঝি, মানুষটি ইন্তেকাল করেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কুরআনেই তো আছে, আল্লাহ আরশে অধিষ্ঠিত। আর আরশ আকাশের ওপরে। তাহলে তাঁর দিক তো ওপরের দিকেই?
এখানে কেউ কেউ এই যুক্তি দেন। চলুন সেই আয়াতটিই পুরোটা পড়ি, যেখানে আরশের কথা আছে:
একই আয়াতে আরশের কথাও আছে, আবার “তিনি তোমাদের সঙ্গে আছেন যেখানেই তোমরা থাক না কেন”-ও আছে। অর্থাৎ আরশ আল্লাহর সর্বোচ্চ ক্ষমতা ও কর্তৃত্বের প্রকাশ; তা তাঁকে কোনো এক স্থানে বেঁধে রাখে না। তাই “আল্লাহর দিকে” কথাটিকে আকাশের কোনো নির্দিষ্ট ঠিকানা বানানোর সুযোগ কুরআন দেয়নি।
তাহলে ঈসা (আ.)-এর জন্য আলাদা করে “আল্লাহর দিকে উন্নীত” বলার মানে কী?
মানে হলো সম্মান। ইহুদিরা দাবি করেছিল, ক্রুশে মরে তিনি অভিশপ্ত, আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে গেছেন। আল্লাহ জবাব দিয়েছেন: দূরে নয়, বরং আমি তাঁকে নিজের দিকে, নিজের নৈকট্যে উন্নীত করেছি। “আল্লাহর দিকে” কথাটিই প্রমাণ করে এটি নৈকট্যের কথা, দূরত্বের নয়। কারণ যিনি জীবন-শিরার চেয়েও কাছে, তাঁর কাছে পৌঁছাতে আকাশ পাড়ি দিতে হয় না।
সংক্ষেপে
- কুরআন বলে, আল্লাহ আকাশেও আছেন, পৃথিবীতেও; যেদিকে মুখ ফেরাও সেদিকেই তিনি।
- তাই “আল্লাহর দিকে” মানে কোনো স্থান নয়, আল্লাহর নৈকট্য।
- ইবরাহীম (আ.) “প্রভুর দিকে” গিয়েছিলেন পৃথিবীতেই; মুমিনের আত্মা “প্রভুর দিকে” ফেরে মৃত্যুর পর।
- ঈসা (আ.)-কে “আল্লাহর দিকে” উন্নীত করার অর্থ তাঁর সম্মান ও নৈকট্য, দেহসহ আকাশে যাওয়া নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
- Holy Quran 4:159 (with commentary) · alislam.org
- Jesus Christ died a natural death · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.