হিজরী নবম বছর। মহানবী (সা.) বিশাল বাহিনী নিয়ে তাবুকের দিকে রওনা হচ্ছেন। প্রায় সব অভিযানে যিনি পাশে থাকতেন, সেই বীর হযরত আলী (রা.)-কে এবার তিনি মদীনার দায়িত্ব দিয়ে রেখে যাচ্ছেন।
আলী (রা.)-এর মন ভারী। জিহাদের সুযোগ হারানোর কষ্ট, আর লোকে কী ভাববে সেই চিন্তা। তিনি আরজ করলেন, “হে আল্লাহর রসূল, আপনি কি আমাকে নারী আর শিশুদের মাঝে রেখে যাচ্ছেন?”
মহানবী (সা.) পরম স্নেহে উত্তর দিলেন:
সহীহ বুখারীর বর্ণনায় স্পষ্ট বলা আছে, ঘটনাটি তাবুক অভিযানের সময়ের, আর সেখানে শব্দ হলো ইল্লা আন্নাহু লাইসা নাবিয়্যুন বা’দী, “শুধু এটুকু ছাড়া যে, আমার পরে কোনো নবী নেই” (সহীহ বুখারী, কিতাবুল মাগাযী, হাদীস ৪৪১৬)।
উপমাটি বুঝুন
মূসা (আ.) যখন তূর পাহাড়ে আল্লাহর ডাকে গিয়েছিলেন, তখন তিনি তাঁর জাতির দায়িত্ব দিয়ে গিয়েছিলেন ভাই হারুন (আ.)-কে। হারুন (আ.) ছিলেন মূসা (আ.)-এর ভাই, প্রতিনিধি, আবার নিজেও একজন নবী।
মহানবী (সা.) আলী (রা.)-কে বলছেন: আমার অনুপস্থিতিতে মদীনায় তুমি ঠিক তেমনই, যেমন মূসার অনুপস্থিতিতে হারুন ছিলেন। তুমি আমার আত্মীয়, আমার প্রতিনিধি। কিন্তু একটি পার্থক্য আছে: হারুন নবী ছিলেন, তুমি নবী নও। আমি পেছনে কোনো নবী রেখে যাচ্ছি না।
আলইসলাম ডট অর্গে উল্লেখ আছে, এই হাদীসের অন্য বর্ণনায় শব্দগুলো আরও সরাসরি: “শুধু এটুকু ছাড়া যে, তুমি নবী নও” (তাবাকাতে কাবীর, খণ্ড ৫, পৃষ্ঠা ১৫)। অর্থাৎ পার্থক্যটি আলী (রা.) আর হারুন (আ.)-এর মধ্যে, আর কথাটি বলা হয়েছিল সেই নির্দিষ্ট মুহূর্তে।
শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.)-এর সূক্ষ্ম যুক্তি
দ্বাদশ হিজরী শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত শাহ ওলীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহ.) এই হাদীস নিয়ে লিখেছেন: এর উদ্দেশ্য হলো তাবুক অভিযানে মহানবী (সা.)-এর অনুপস্থিতিতে আলী (রা.)-কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত করা, আর মূসা (আ.) পাহাড়ে যাওয়ার সময় হারুন (আ.)-এর সঙ্গে তাঁর সাদৃশ্য দেখানো। এখানে বা’দী শব্দের অর্থ গাইরী, “আমি ছাড়া”; সময়ের দিক থেকে “আমার পরে” নয়, যেমন কুরআনে “বা’দাল্লাহ” মানে “আল্লাহ ছাড়া” (কুররাতুল আইনাইন, পৃষ্ঠা ২০৬)।
তিনি আরও একটি চমৎকার যুক্তি দিয়েছেন: হারুন (আ.) মূসা (আ.)-এর পরে বেঁচে ছিলেন না, তাঁর আগেই মারা গিয়েছিলেন। তাই উপমার মধ্যে “পরে” কথাটিকে সময়ের অর্থে নেওয়া মানায় না (কুররাতুল আইনাইন, পৃষ্ঠা ২০৬)।
এই হাদীসের যে শব্দ কুরআনের ভাষার সঙ্গে মেলে, আর প্রসঙ্গের সঙ্গেও মেলে, সেটাই এর সঠিক অর্থ।
এবার ভাবুন, এই কথোপকথনটি আলী (রা.)-এর জন্য কতটা সান্ত্বনার ছিল। তিনি দুঃখ পাচ্ছিলেন যে পিছনে পড়ে থাকছেন। মহানবী (সা.) তাঁকে জানালেন, এই দায়িত্ব কোনো অবহেলা নয়, এক বিরাট সম্মান: তুমি আমার কাছে হারুনের মতো। আর ভুল বোঝাবুঝি এড়াতে সঙ্গে যোগ করলেন একটি সীমারেখা: তবে তুমি নবী নও। কথাটি বলা হয়েছিল একজন মানুষকে, একটি নির্দিষ্ট মুহূর্তে, একটি নির্দিষ্ট তুলনা স্পষ্ট করতে। সেই বাক্যকে পরে এমন এক ঘোষণা বানানো হয়েছে, যা দিয়ে মহানবী (সা.)-এর নিজের দেওয়া ভবিষ্যদ্বাণীকেই অস্বীকার করার চেষ্টা হয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
প্রসঙ্গ যাই হোক, “আমার পরে কোনো নবুয়্যত নেই” কথাটি তো সাধারণ ঘোষণা?
ধরা যাক, কথাটিকে সাধারণ ঘোষণা হিসেবেই নিলাম। তখনো প্রশ্ন থাকে, কোন নবুয়্যত? মহানবী (সা.) নিজেই অন্য হাদীসে ব্যাখ্যা দিয়েছেন: “নবুয়্যতের মধ্য থেকে মুবাশশিরাত ছাড়া আর কিছু বাকি থাকেনি” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৯০)। আর জামে তিরমিযীতে (হাদীস ২২৭২) তিনি বলেছেন, মুসলমানের স্বপ্ন “নবুয়্যতের অংশগুলোর একটি অংশ”। অর্থাৎ নবুয়্যতের একটি অংশ তাঁর পরেও আছে। তাই “কোনো নবুয়্যত নেই” কথাটি শরীয়তবাহী ও স্বাধীন নবুয়্যতের সমাপ্তির কথা, সব রূপের নয়। ইমাম শারানী (রহ.)-ও এই অর্থই লিখেছেন (আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল জাওয়াহির, খণ্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৫)।
আলী (রা.)-এর মতো মানুষ নবী হননি; তাহলে আর কে হবেন?
নবুয়্যত কারো ব্যক্তিগত যোগ্যতায় আপনা-আপনি আসে না, আসে আল্লাহর নির্বাচনে, যুগের প্রয়োজনে। আলী (রা.)-এর যুগে মহানবী (সা.)-এর পরে খেলাফত ছিল, নতুন নবীর প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু শেষ যুগের জন্য মহানবী (সা.) নিজেই আগমনকারী মসীহকে চারবার “আল্লাহর নবী” বলেছেন (সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ফিতান), আর বলেছেন, “আমার ও তাঁর মাঝে কোনো নবী নেই” (সুনান আবু দাউদ, হাদীস ৪৩২৪)। আলী (রা.)-কে বলা কথা সেই ভবিষ্যদ্বাণী বাতিল করে না।
বিরোধী আলেমদের বিশ্বাস কি এই হাদীসের সঙ্গে মেলে?
তাঁরা বিশ্বাস করেন, ঈসা (আ.) নবী হিসেবেই ফিরে আসবেন। “আমার পরে কোনো নবুয়্যত নেই” কথাটিকে সব রকম নবুয়্যতের সমাপ্তি ধরলে তাঁদের এই বিশ্বাসও টেকে না। দুই পক্ষকেই কোনো না কোনো ব্যাখ্যা মানতে হয়। আহমদী মুসলমানদের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গ, ভাষা আর উম্মতের বুযুর্গদের বক্তব্যের সঙ্গে মেলে: শরীয়তবাহী ও স্বাধীন নবুয়্যত শেষ; মহানবী (সা.)-এর অনুসারী হয়ে আসা উম্মতী নবুয়্যত তাঁর মোহরেরই সাক্ষ্য।
সংক্ষেপে
- “আমার পরে কোনো নবুয়্যত নেই” কথাটি তাবুক অভিযানে আলী (রা.)-কে মদীনায় রেখে যাওয়ার সময় বলা, হারুন (আ.)-এর উপমার সঙ্গে।
- অর্থ: আলী (রা.) হারুন (আ.)-এর মতো প্রতিনিধি, কিন্তু নবী নন; অন্য বর্ণনায় সরাসরি “তুমি নবী নও”।
- শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.) বলেছেন, এখানে “বা’দী” মানে “আমি ছাড়া”; হারুন (আ.) মূসা (আ.)-এর পরে বেঁচে ছিলেন না।
- মহানবী (সা.) নিজেই বলেছেন, নবুয়্যতের অংশ মুবাশশিরাত তাঁর পরেও থাকবে; শেষ হয়েছে শরীয়তবাহী ও স্বাধীন নবুয়্যত।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Meaning of Khatamiyyat According to Ahadith · alislam.org
- Ahmadis believe in Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.