১৯৮৪ সালের এপ্রিলে আহমদী মুসলমানদের বিরুদ্ধে জারি করা অধ্যাদেশের সমর্থনে পাকিস্তান সরকার একটি “শ্বেতপত্র” প্রকাশ করে। তাতে দাবি করা হয়: আগের নবীরা সবাই পরের নবীর আগমনের সংবাদ দিয়ে গেছেন, কিন্তু কুরআনে ভবিষ্যৎ কোনো নবীর কথা নেই।
হযরত মির্যা তাহের আহমদ, খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) এর জবাবে বলেছিলেন, তাঁরা নিজেদের দাবির পক্ষে কুরআন থেকে একটি আয়াতও পেশ করেননি। এরপর তিনি একে একে কুরআনের আয়াতগুলো সামনে রাখেন। চলুন সেই সফরটি আমরাও করি।
প্রথম আয়াত: আনুগত্যের পুরস্কার
লক্ষ করুন, এখানে শুধু “রসূল” নয়, বলা হয়েছে “এই রসূল”, অর্থাৎ মুহাম্মদ (সা.)। আর তাঁর আনুগত্যের পুরস্কার চার স্তরের: নবী, সিদ্দীক, শহীদ ও সালেহ।
এখন একটি সহজ প্রশ্ন। মহানবী (সা.)-এর পরে কি এই উম্মতে কোনো সিদ্দীক, শহীদ বা সালেহ হননি? সবাই বলবেন, অবশ্যই হয়েছেন। তাহলে একই বাক্যের প্রথম স্তরটি, নবীর মর্যাদা, হঠাৎ কেন চিরতরে বন্ধ হবে? আয়াত চারটি পুরস্কার একই সুতোয় গেঁথেছে।
দ্বিতীয় আয়াত: আল্লাহর চলমান রীতি
আরবি ক্রিয়াপদ ইয়াসতাফী বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালের। “মনোনীত করেছিলেন” বলা হয়নি, বলা হয়েছে “মনোনীত করিয়া থাকেন”। যে কাজ চিরতরে থেমে গেছে, তার জন্য এই কাল ব্যবহৃত হয় না। শিয়া মুফাসসির তাবারসী তাঁর মাজমাউল বয়ানে (খণ্ড ৭, পৃষ্ঠা ১৭১) লিখেছেন, মানুষের মধ্য থেকে মনোনীত রসূল বলতে এখানে নবীদের বোঝানো হয়েছে।
তৃতীয় আয়াত: নবীদের কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গীকার
আল্লাহ নবীদের মাধ্যমে অঙ্গীকার নিয়েছেন: তোমাদের কাছে যা আছে, তার সত্যায়নকারী কোনো রসূল এলে তোমরা তাঁর উপর ঈমান আনবে। আর সূরা আহযাব, যেখানে খাতামান নাবিয়্যীনের আয়াত আছে, সেখানেই আল্লাহ বলেন, এই অঙ্গীকার মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকেও নেওয়া হয়েছিল:
“তোমার নিকট হইতেও” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। যদি তাঁর পরে কোনো সত্যায়নকারী রসূলের আসার সম্ভাবনাই না থাকত, তাহলে তাঁর কাছ থেকে এই অঙ্গীকার নেওয়ার কী প্রয়োজন ছিল? খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.)-এর ব্যাখ্যায়, এর অর্থ হলো তাঁর পরে নবী আসতে পারেন, তবে তাঁকে মহানবী (সা.)-এর উম্মতেরই অংশ হতে হবে।
চতুর্থ আয়াত: আরেক দল, যারা এখনো মেলেনি
আগের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ উম্মীদের মধ্যে এক রসূল পাঠিয়েছেন, যিনি আয়াত পড়ে শোনান, পবিত্র করেন, কিতাব ও হিকমত শেখান। এরপর এই আয়াত বলছে, পরবর্তী এক দলের মধ্যেও তিনি আবির্ভূত হবেন। খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) এটিকে প্রতিশ্রুত মসীহের আগমনের এক স্পষ্ট উল্লেখ বলেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“মাআ” মানে তো “সঙ্গে”; তাহলে কি আনুগত্যকারীরা শুধু নবীদের সঙ্গী হবে, নবী নয়?
এটি সবচেয়ে প্রচলিত আপত্তি। চলুন কুরআনেই এর উত্তর খুঁজি। মু’মিনদের একটি দোয়া কুরআনে শেখানো হয়েছে:
এখানেও মাআ। এর অর্থ কি এই যে, কোনো পুণ্যবান যখন মারা যাবেন, ঠিক তখন আমাদেরও মৃত্যু দাও? কেউ তা বলেন না। অর্থ হলো, আমাদের পুণ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত করে মৃত্যু দাও। তাছাড়া ৪:৭০ আয়াতে পরে মিনান নাবিয়্যীন, “নবীগণের মধ্য হইতে”, বলে বিষয়টি পরিষ্কার করে দেওয়া হয়েছে। আর ভাবুন: আল্লাহ ও এই রসূলের আনুগত্যের এত বড় ঘোষণার পুরস্কার যদি হয় শুধু উঁচু মানুষদের পাশে বসা, নিজে কিছু না হওয়া, তাহলে কি তা এই মহান ঘোষণার মর্যাদার সঙ্গে মানায়?
অঙ্গীকারের আয়াতে আসা রসূল তো মহানবী (সা.) নিজেই?
আগের নবীদের ক্ষেত্রে হ্যাঁ, সেই রসূল তিনি। কিন্তু ৩৩:৮ আয়াত বলছে, একই অঙ্গীকার মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকেও নেওয়া হয়েছে। নিজের প্রতি নিজে ঈমান আনার অঙ্গীকার কারো কাছ থেকে নেওয়া হয় না। তাই তাঁর কাছ থেকে নেওয়া অঙ্গীকার তাঁর পরে আসা কোনো সত্যায়নকারীর দিকেই ইঙ্গিত করে।
“আখারীনা মিনহুম” মানে তো শুধু পরে ইসলাম গ্রহণকারী অনারবরা?
মহানবী (সা.) নিজেই এই আয়াতের ব্যাখ্যা দিয়েছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, সূরা জুমুআ নাযিল হলে সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, এরা কারা? সালমান ফারসী (রা.) সেখানে ছিলেন। মহানবী (সা.) তাঁর উপর হাত রেখে বললেন:
অর্থাৎ পরবর্তী দলের কথা বলতে গিয়ে মহানবী (সা.) এমন এক যুগের কথা বললেন, যখন ঈমান পৃথিবী থেকে যেন উঠে যাবে, আর পারস্য বংশের এক ব্যক্তি তা ফিরিয়ে আনবেন। এটি সাধারণ অনারব মুসলমানদের কথা নয়, শেষ যুগের এক বিশেষ সংস্কারকের কথা।
সংক্ষেপে
- ৪:৭০ আয়াতে “এই রসূলের” আনুগত্যের পুরস্কার চার স্তরের: নবী, সিদ্দীক, শহীদ, সালেহ; বাকি তিনটি খোলা থাকলে প্রথমটি বন্ধ হওয়ার কারণ নেই।
- ২২:৭৬ আয়াতে আল্লাহর রসূল মনোনয়নের রীতি বর্তমান ও ভবিষ্যৎ কালে বর্ণিত।
- ৩:৮২ ও ৩৩:৮ আয়াত দেখায়, সত্যায়নকারী রসূলের প্রতি ঈমানের অঙ্গীকার মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকেও নেওয়া হয়েছিল।
- ৬২:৪ আয়াত ও বুখারীর হাদীস শেষ যুগে এক মহান সংস্কারকের আবির্ভাবের সংবাদ দেয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Nubuwwat within the Ummah of the Holy Prophet(sa) · alislam.org
- The Concept of Revelation in Islam · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.