আমাদের দেশে একটি শিশুর জন্ম হলে বাবা-মা অনেক সময় তার নাম রাখেন মুহাম্মদ। কেন? কারণ তাঁরা মহানবী (সা.)-কে ভালোবাসেন, আর চান সন্তানটি সেই নামের মর্যাদা রাখুক। কেউ এতে আপত্তি করে না, বরং খুশি হয়।
এবার ভাবুন, মানুষ নয়, আল্লাহ নিজে তাঁর এক বান্দাকে এই নামে ডাকলেন, কারণ তিনি দেখলেন বান্দাটি মহানবী (সা.)-এর ভালোবাসায় নিজেকে বিলীন করে দিয়েছেন। এতে কি দোষ হতে পারে?
আপত্তিটি কী?
আপত্তিতে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর এক গলতী কা ইযালা (রূহানী খাযায়েন ১৮ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৭) থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়: “এই ওহীতে আল্লাহ আমার নাম মুহাম্মদ রেখেছেন।” এরপর বলা হয়, তিনি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর জায়গায় বসিয়েছেন।
কোন ওহী, কী প্রসঙ্গে?
পুস্তিকাটিতে তিনি জানিয়েছেন, তাঁর প্রথম দিকের বই বারাহীনে আহমদীয়ায় যে ইলহামগুলো ছাপা হয়েছিল, তার একটি হলো কুরআনের এই আয়াতটিই, যা তাঁর ওপরও ওহী হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছিল:
এই ইলহামে তাঁকে “মুহাম্মদ” ও “রাসূল” বলে সম্বোধন করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, তিনি নিজে এর অর্থ কী বলেছেন?
তাঁর নিজের ব্যাখ্যা
একই পুস্তিকায় তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর পরে নবুওয়তের সব দরজা বন্ধ, কেবল একটি দরজা খোলা: সীরাতে সিদ্দীকী, অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর মধ্যে নিজেকে সম্পূর্ণ বিলীন করে দেওয়া, যেমন করেছিলেন হযরত আবু বকর সিদ্দীক (রা.)। যে এই দরজা দিয়ে আসে, তাকে ছায়ারূপে মুহাম্মদ (সা.)-এরই চাদর পরানো হয়। সে এই মর্যাদা নিজের থেকে পায় না, পায় মহানবী (সা.)-এর ঝরনা থেকে, আর তাও নিজের গৌরবের জন্য নয়, মহানবী (সা.)-এর গৌরব ও মহিমার জন্য।
তিনি আরও লিখেছেন: আমার নবুওয়ত ও রিসালত কেবল এ কারণে যে আমি মুহাম্মদ ও আহমদ (সা.)-এর নাম পেয়েছি, নিজের অধিকারে নয়; আর এই নাম আমাকে দেওয়া হয়েছে মহানবী (সা.)-এর প্রতি পূর্ণ আত্মনিবেদনের কারণে। আর ছায়া কখনো মূল থেকে স্বাধীন হয় না।
অর্থাৎ নামটি সম্মানের চিহ্ন, দাবির প্রতিযোগিতা নয়। মনিব যখন তাঁর প্রিয় খাদেমকে নিজের নামে ডাকেন, তখন সম্মান বাড়ে মনিবেরই।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কারো নাম “মুহাম্মদ” রাখা কি মহানবী (সা.)-এর সমান হওয়ার দাবি?
তাহলে তো পৃথিবীর কোটি মুহাম্মদ নামের মানুষকেও একই অভিযোগে দোষী করতে হয়। নাম মানুষকে সমান বানায় না; নাম ভালোবাসা আর সম্পর্ক প্রকাশ করে। কোনো খ্রিষ্টান বা অন্য ধর্মের মানুষ সাধারণত সন্তানের নাম মুহাম্মদ রাখেন না; যিনি মহানবী (সা.)-কে ভালোবাসেন, তিনিই রাখেন। আল্লাহ যদি তাঁর এক বান্দার হৃদয়ে সেই ভালোবাসার পূর্ণতা দেখে তাকে এই নামে ডাকেন, তা হলো সেই ভালোবাসার স্বীকৃতি।
শেষ যুগের মাহদীর নাম কি মহানবী (সা.)-এর নামের সাথে মিলবে বলে হাদীসে আছে?
হ্যাঁ। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণিত একটি হাদীসে আছে:
মহানবী (সা.) নিজেই প্রতিশ্রুত মাহদীকে নিজের নাম দিয়েছেন। এক গলতী কা ইযালায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই হাদীসের দিকেই ইঙ্গিত করে লিখেছেন, প্রতিশ্রুত মাহদীর নাম মহানবী (সা.)-এর নামের অনুরূপ হবে, অর্থাৎ তাঁকে মুহাম্মদ ও আহমদ নাম দেওয়া হবে; আর মহানবী (সা.) যে তাঁকে নিজের নাম দিলেন, এতে বোঝা যায় তিনি তাঁকে নিজের বুরুয বা আধ্যাত্মিক প্রতিচ্ছবি হিসেবে বর্ণনা করতে চেয়েছেন, যেমন ইউশা (আ.) ছিলেন মূসা (আ.)-এর বুরুয। যে কথা মহানবী (সা.) নিজে বলেছেন, তা আল্লাহর ওহীতে পূর্ণ হলে আপত্তির কী থাকে?
তাহলে কি তিনি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর সমান মনে করতেন?
তাঁর নিজের কবিতাই উত্তর দেয়। উর্দু কবিতায় তিনি লিখেছেন: “ওহ পেশওয়া হামারা জিসসে হ্যায় নূর সারা, নাম উসকা হ্যায় মুহাম্মদ, দিলবার মেরা ইয়েহি হ্যায়।” অর্থাৎ, তিনিই আমাদের নেতা, যাঁর থেকে সব আলো; তাঁর নাম মুহাম্মদ, তিনিই আমার প্রিয়তম। তিনি মহানবী (সা.)-কে বলেছেন সূর্য, নিজেকে চাঁদ; মহানবী (সা.)-কে মূল, নিজেকে ছায়া। এই সম্পর্ক উল্টে দিয়ে কোনো উপমা দিলে তা তাঁর কথা থাকে না।
তিনি নিজেকে মহানবী (সা.)-এর তুলনায় কোথায় রেখেছেন?
তাযকিরাহতে ১৮৮৩ সালের একটি ইলহামের ব্যাখ্যায় (বারাহীনে আহমদীয়া, ৪র্থ খণ্ড) তিনি নিজের সাথে হযরত ঈসা (আ.)-এর মিল বর্ণনা করতে গিয়ে লিখেছেন: মসীহ ছিলেন এক পূর্ণ ও উচ্চমর্যাদার নবী মূসা (আ.)-এর ধর্মের অনুসারী ও সেবক, আর এই অধম সেই মহিমান্বিত নবীর এক নগণ্য সেবক, যিনি সকল রসূলের নেতা আর সকল নবীর মুকুট।
অর্থাৎ নবীদের নেতা ও মুকুট হলেন মহানবী (সা.), আর নিজেকে তিনি বলেছেন সেই নবীর “নগণ্য সেবক”। যে মানুষ নিজেকে এভাবে পরিচয় দেন, তাঁর “আমার নাম মুহাম্মদ রাখা হয়েছে” কথাটির অর্থ একটাই: সেবকের গায়ে মনিবের নামের ছাপ।
শেষ কথা
“আল্লাহ আমার নাম মুহাম্মদ রেখেছেন” কথাটির পরের লাইনগুলোই এর অর্থ বলে দেয়: নামটি ছায়ার, মূলের নয়; দাসের, মনিবের নয়; আর এর সব গৌরব মহানবী (সা.)-এর।
সংক্ষেপে
- বারাহীনে আহমদীয়ায় ছাপা এক ইলহামে (৪৮:৩০-এর বাক্য) তাঁকে “মুহাম্মদ” বলে সম্বোধন করা হয়েছে।
- এক গলতী কা ইযালায় তিনি লিখেছেন, এই নাম ছায়ারূপে, মহানবী (সা.)-এর প্রতি পূর্ণ আত্মনিবেদনের কারণে, আর তাঁরই গৌরবের জন্য।
- মহানবী (সা.) নিজেই বলেছেন, প্রতিশ্রুত ব্যক্তির নাম তাঁর নামের সাথে মিলবে (আবু দাউদ ৪২৮২)।
- তিনি মহানবী (সা.)-কে মূল ও সূর্য এবং নিজেকে ছায়া ও চাঁদ বলেছেন; তাই সমতার অভিযোগ ভিত্তিহীন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- A Misconception Removed · alislam.org
- A Misconception Removed (Eik Ghalati Ka Izala), PDF · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.