উনিশ শতকের শেষভাগের ভারতবর্ষ। খ্রিষ্টান পাদ্রীরা বাজারে-মেলায় দাঁড়িয়ে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কুৎসিত কথা বলছেন, বই ছাপছেন। অন্যদিকে কিছু বিত্তশালী মুসলমানও মদে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছিলেন।
এই দুই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে আজকের আপত্তিটি পড়তে হবে। নইলে একটি বাক্য তার জায়গা থেকে সরে গিয়ে সম্পূর্ণ অন্য অর্থ দেবে।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর কিশতিয়ে নূহ (রূহানী খাযায়েন ১৯ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৭১) থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়: ইউরোপের লোকদের মদ এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করার কারণ হলো, হযরত ঈসা (আ.) মদ পান করতেন, হয়তো কোনো রোগের কারণে বা পুরোনো অভ্যাসের কারণে। এ থেকে বলা হয়, তিনি একজন নবীর অবমাননা করেছেন।
পাদটীকাটি কাদের উদ্দেশ্যে?
কিশতিয়ে নূহ-এর মূল লেখায় তিনি ধনী মুসলমানদের সম্বোধন করে বলছেন: সব রকম নেশা থেকে দূরে থাকো; শুধু মদ নয়, আফিম, গাঁজা, ভাং সবই মানুষকে ধ্বংস করে; প্রতি বছর হাজার হাজার মানুষ এতে মারা যায়।
এই কথার সাথে পাদটীকাটি। তার পুরো মর্ম: ইউরোপের মানুষের মদের এত ক্ষতির কারণ হলো, ঈসা (আ.) নিজে পান করতেন, হয়তো কোনো রোগের কারণে বা পুরোনো অভ্যাসে। “কিন্তু হে মুসলমানগণ! তোমাদের নবী (সা.) সব রকম নেশা থেকে পবিত্র ছিলেন… তাহলে মুসলমান হয়ে তোমরা কার অনুসরণ করছ? কুরআন তো ইঞ্জিলের মতো মদকে বৈধ করেনি। তাহলে কোন কিতাবের ভিত্তিতে তোমরা মদকে হালাল মনে কর?”
এবার ছবিটি পরিষ্কার। পাদটীকার উদ্দেশ্য একজন নবীকে ছোট করা নয়; উদ্দেশ্য মদপায়ী মুসলমানদের বলা: ইউরোপীয়রা মদ খায় কারণ তাদের প্রচলিত ইঞ্জিল একে বৈধ রেখেছে; তোমাদের কুরআন তা হারাম করেছে, তাহলে তোমরা কেন তাদের পথে?
কথাটির উৎস: খ্রিষ্টানদের নিজেদের বই
যিশুর মদপানের কথা হযরত মির্যা সাহেব নিজে বানাননি। এটি খ্রিষ্টানদের প্রচলিত বাইবেলেই আছে। যোহনের সুসমাচারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে বলা হয়েছে, যিশুর প্রথম অলৌকিক কাজ ছিল এক বিয়েবাড়িতে পানিকে মদে পরিণত করা। মথি (১১:১৯) ও লূক (৭:৩৪)-এ যিশু নিজেই বলছেন, লোকে তাঁকে “পেটুক ও মদ্যপ” বলে।
খ্রিষ্টান পাদ্রীরা যখন মহানবী (সা.)-এর চরিত্রে আঘাত করে নিজেদের যিশুকে নিষ্পাপ ঈশ্বর বলে দাবি করতেন, তখন তিনি তাঁদেরই বই থেকে দেখাতেন: তোমাদের কিতাব তোমাদের যিশুর যে ছবি এঁকেছে, তা তোমাদের দাবির সাথে মেলে না।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
উদ্দেশ্য যা-ই হোক, একজন নবীর নামে এমন কথা বলা কি অবমাননা নয়?
এই প্রশ্নের উত্তর তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন। নূরুল কুরআন দ্বিতীয় সংখ্যায় তিনি লিখেছেন: “পাঠকদের স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, হযরত মসীহ (আ.)-এর প্রতি আমার বিশ্বাস খুবই উত্তম… কিন্তু খ্রিষ্টানরা যে যিশুকে উপস্থাপন করে, যে খোদা হওয়ার দাবি করেছে… কুরআন এমন যিশুর কোনো উল্লেখ করেনি… আমাদের লেখায় আমরা খ্রিষ্টানদের এই কল্পিত যিশুকেই বুঝিয়েছি। আল্লাহর বিনয়ী বান্দা ঈসা ইবনে মরিয়ম, যিনি নবী ছিলেন এবং যাঁর কথা কুরআনে আছে, তিনি আমাদের কঠোর কথার লক্ষ্য নন। চল্লিশ বছর ধরে পাদ্রীদের মুখে মহানবী (সা.)-এর প্রতি গালি সহ্য করার পর আমাদের এই পদ্ধতি নিতে হয়েছে।”
অর্থাৎ দুটি চরিত্র আলাদা: কুরআনের ঈসা (আ.), যিনি আল্লাহর সম্মানিত নবী; আর প্রচলিত গসপেলের “ঈশ্বরপুত্র যিশু”, যাঁকে খ্রিষ্টানরা খোদা বানিয়েছে। কঠোর কথাগুলো দ্বিতীয়টির ব্যাপারে, তাদেরই বইয়ের ভিত্তিতে।
বাইবেল তো বিকৃত; তার কথা দিয়ে যুক্তি দেওয়া কেন?
ঠিক এ কারণেই। যুক্তিটা হলো: “তোমরা যে বইকে নির্ভুল বলো, সেই বই-ই তোমাদের যিশুর এমন ছবি দেয়। তাহলে সেই যিশুকে খোদা বলো কীভাবে?” প্রতিপক্ষের স্বীকৃত বই থেকে প্রতিপক্ষকে উত্তর দেওয়া তর্কের পুরোনো ও স্বীকৃত পদ্ধতি। এতে বইটির সব কথাকে সত্য মেনে নেওয়া হয় না।
তাহলে কুরআনের ঈসা (আ.) সম্পর্কে তাঁর বিশ্বাস কী?
কুরআন যা বলেছে, ঠিক তাই:
তিনি আল্লাহর সত্য রসূল, তাঁর মাতা সত্যবাদিনী। খোদা নন, খোদার পুত্রও নন। এই ঈসা (আ.)-কে হযরত মির্যা সাহেব আজীবন সম্মান করেছেন, আর তাঁকে খোদা বানানোর বিশ্বাসের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। উৎস প্রবন্ধে উদ্ধৃত তাঁর আরেকটি কথা: “সমস্ত নবীর প্রতি ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শনকে আমি আমার ঈমানের অঙ্গ মনে করি।” (মলফুযাত, ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২০)
একই বইয়ে ঈসা (আ.) সম্পর্কে তিনি আর কী লিখেছেন?
যে কিশতিয়ে নূহ থেকে আপত্তির পাদটীকা নেওয়া হয়েছে, সেই বইয়েই তিনি লিখেছেন: আমি ঈসা (আ.)-এর মহত্ত্ব অস্বীকার করি না। মসীহ ইবনে মরিয়ম ছিলেন মূসায়ী সিলসিলার প্রতিশ্রুত মসীহ, আর আমি মুহাম্মদী সিলসিলার প্রতিশ্রুত মসীহ; তাই যাঁর নাম আমি বহন করি, তাঁকে আমি গভীরভাবে সম্মান করি। আর যে বলে আমি মসীহ ইবনে মরিয়মকে সম্মান করি না, সে সত্য বলে না।
একই বই, একই লেখক। একদিকে খ্রিষ্টানদের বই থেকে তাদের যিশুর ছবি দেখানো, অন্যদিকে কুরআনের ঈসা (আ.)-এর প্রতি গভীর শ্রদ্ধার স্পষ্ট ঘোষণা। দুটিকে আলাদা রাখলেই আপত্তির জট খুলে যায়।
শেষ কথা
পাদটীকাটি তার জায়গায় রেখে পড়লে দেখা যায়, এটি মুসলমানদের মদ থেকে ফেরানোর এক তীব্র আহ্বান, আর খ্রিষ্টানদের নিজেদের বই দিয়ে তাদের ভুল বিশ্বাসের জবাব। কুরআনের সম্মানিত নবী ঈসা (আ.) এখানে লক্ষ্য নন, তিনি নিজেই তা লিখে গেছেন।
সংক্ষেপে
- পাদটীকাটি মদপায়ী মুসলমানদের উদ্দেশ্যে: কুরআন মদ হারাম করেছে (৫:৯১), তাহলে তোমরা কার অনুসরণ করছ?
- যিশুর মদপানের কথা খ্রিষ্টানদের নিজেদের গসপেলে আছে (যোহন ২; মথি ১১:১৯; লূক ৭:৩৪)।
- নূরুল কুরআন-এ তিনি স্পষ্ট করেছেন: কঠোর কথাগুলো খ্রিষ্টানদের কল্পিত যিশুর ব্যাপারে, কুরআনের নবী ঈসা (আ.)-এর ব্যাপারে নয়।
- কুরআনের ঈসা (আ.)-কে তিনি আল্লাহর সত্য রসূল হিসেবে সম্মান করেছেন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Jesus of the Gospels · alislam.org
- Noah’s Ark (Kashti-e-Nuh), English PDF · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.