আগে বললেন ‘অস্বীকারকারী কাফের নয়’, পরে বললেন ‘কাফের’: কেন?

ঠিক এই প্রশ্নটিই তাঁর জীবদ্দশায় তাঁকে লিখে পাঠানো হয়েছিল। তিনি যে উত্তর দিয়েছিলেন, তাতে ‘কুফর’ শব্দের দুটি স্তরের কথা আছে, যা না বুঝলে পুরো বিষয়টি ভুল বোঝা হয়।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

একজন মানুষ হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর কাছে একটি প্রশ্ন লিখে পাঠালেন। প্রশ্নটি ছিল ধারালো: “হুযুর, আপনি বহু জায়গায় লিখেছেন, কালেমা পাঠকারী ও কিবলামুখীদের কাফের বলা ঠিক নয়। তিরিয়াকুল কুলূব-এ লিখেছেন, আপনাকে না মানলে কেউ কাফের হয় না। অথচ আব্দুল হাকীম খানকে লিখেছেন, যে আপনার দাবি শুনেও মানেনি, সে মুসলমান নয়। দুটি কথা কি পরস্পরবিরোধী নয়?”

আজও ঠিক এই প্রশ্নটিই আপত্তি হিসেবে তোলা হয়। সুবিধার কথা হলো, উত্তরটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেই দিয়ে গেছেন।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা বলেন, শুরুতে তিনি তাঁকে অস্বীকারকারীদের কাফের বলতে অস্বীকার করেছিলেন। যেমন তিনি লিখেছেন: “শুরু থেকেই আমার বিশ্বাস, আমার দাবি অস্বীকার করলে কেউ কাফের বা দাজ্জাল হয় না; তবে সে বিভ্রান্ত এবং সঠিক পথ থেকে সরে গেছে।” (তিরিয়াকুল কুলূব, রূহানী খাযায়েন, ১৫শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩২) কিন্তু পরে তিনি ও তাঁর জামাত অস্বীকারকারীদের কাফের মনে করতে শুরু করেন।

তাঁর নিজের উত্তর

হাকীকাতুল ওহী-তে প্রশ্নটি উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, আপনারা কাফের ফতোয়াদাতা আর অস্বীকারকারীকে দুই ধরনের মানুষ ভাবছেন, অথচ আল্লাহর কাছে তারা একই। কারণ যে তাঁকে মানে না, সে মানে না এই জন্যই যে সে তাঁকে মিথ্যাবাদী মনে করে, অর্থাৎ মনে করে তিনি আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করেছেন। আর কুরআন বলে:

وَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰہِ کَذِبًا اَوۡ کَذَّبَ بِاٰیٰتِہٖ ؕ اِنَّہٗ لَا یُفۡلِحُ الظّٰلِمُوۡنَ
“এবং ঐ ব্যক্তি অপেক্ষা বড় যালেম কে, যে আল্লাহ্‌র উপর মিথ্যা আরোপ করে অথবা তাঁহার নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলিয়া প্রত্যাখ্যান করে? নিশ্চয় যালেমরা কখনও সফলকাম হয় না।”
সূরা আল-আনআম ৬:২২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬:২১।

তাঁর যুক্তি সহজ। এই আয়াতে দুই ধরনের মানুষকে সবচেয়ে বড় অপরাধী বলা হয়েছে: যে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনা করে, আর যে আল্লাহর নিদর্শনকে মিথ্যা বলে। তিনি যদি সত্যিই মিথ্যা রচনাকারী হন, তাহলে তিনিই সবচেয়ে বড় অপরাধী। আর যদি তা না হন, তাহলে আয়াতের দ্বিতীয় অংশটি তাঁর অস্বীকারকারীর ওপর বর্তায়। মাঝামাঝি কোনো জায়গা নেই। (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৬৩, টীকা)

একই সঙ্গে তিনি লিখেছেন: “আমি এখনও কিবলামুখীদের কাফের বলি না; কিন্তু যাদের মধ্যে নিজেদের হাতেই কুফরের কারণ সৃষ্টি হয়েছে, তাদের আমি মুমিন বলি কীভাবে?” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৬৫, টীকা)

✦

“কুফর” শব্দের দুটি স্তর

জট খোলার আসল চাবি এখানে। ইসলামে “কুফর” শব্দটি সব সময় একই অর্থে আসে না। মহানবী (সা.) বলেছেন:

إِنَّ بَيْنَ الرَّجُلِ وَبَيْنَ الشِّرْكِ وَالْكُفْرِ تَرْكَ الصَّلاَةِ
“মানুষ আর শিরক ও কুফরের মাঝখানে (পার্থক্য) হলো নামায ছেড়ে দেওয়া।”
সহীহ মুসলিম, কিতাবুল ঈমান

তাহলে কি নামাযে অবহেলাকারী প্রত্যেক মুসলমান ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে? কোনো আলেমই তা বলেন না। এর অর্থ, সে একটি গুরুতর কুফরী কাজ করেছে, কিন্তু মুসলিম উম্মাহর বাইরে যায়নি। ইমাম ইবনে তাইমিয়া (রহ.) লিখেছেন, জুলুম ও ফিসকের মতো কুফরও দুই প্রকার: এক প্রকার মানুষকে মিল্লাত (মুসলিম সম্প্রদায়) থেকে বের করে দেয়, আরেক প্রকার করে না। (মাজমূউল ফাতাওয়া, ৭ম খণ্ড, কিতাবুল ঈমান, পৃষ্ঠা ৩২৮–৩২৯)

আলইসলাম ডট অর্গ ঠিক এই কথাই বলে: আহমদীয়া সাহিত্যে যেখানে অ-আহমদী মুসলমানদের “কাফের” বলা হয়েছে, তা শুধু প্রতিশ্রুত মসীহকে অস্বীকারের প্রসঙ্গে; এর অর্থ এই নয় যে তারা মুসলিম উম্মাহ থেকে বের হয়ে গেছে। কালেমা পাঠকারী কোনো ব্যক্তিকে আহমদীয়া সাহিত্যে কোথাও ইসলামের গণ্ডি থেকে বহিষ্কৃত ঘোষণা করা হয়নি।

তাহলে দুটি বক্তব্য পাশাপাশি রাখুন। তিরিয়াকুল কুলূব-এ যে কুফর অস্বীকার করা হয়েছে, তা মিল্লাত থেকে বের করে দেওয়ার কুফর। আর হাকীকাতুল ওহী-তে যে কুফরের কথা, তা আল্লাহর প্রেরিতকে অস্বীকারের কুফর, যা মানুষকে উম্মাহর বাইরে নেয় না। দুটি আলাদা স্তর; বিরোধ নেই।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

যে কখনো তাঁর নামই শোনেনি, সে-ও কি কাফের?

না। আপত্তিকারীর প্রশ্নেই শর্তটি ছিল: “যে আমার দাবি শুনেছে এবং মানেনি।” যে শোনেনি, যার কাছে বার্তা পৌঁছায়নি, তার ওপর এই হুকুম নেই। প্রশ্নটি দ্বিতীয় খলীফা হযরত মির্যা বশীরউদ্দীন মাহমুদ আহমদ (রা.)-কে ১৯৫৩ সালের তদন্ত আদালতেও করা হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, উদ্ধৃতিটিতেই তিনি তাদের মুসলমান বলে ধরছেন; “কাফের” বলতে তিনি সেই দ্বিতীয় প্রকারকেই বুঝিয়েছেন, যারা মিল্লাতের বাইরে নয়।

তাহলে কি আহমদী মুসলমানরা অন্য মুসলমানদের অমুসলিম মনে করে?

হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ভাষায়: “আমি কোনো কালেমা পাঠকারীকে কাফের বলি না।” (তিরিয়াকুল কুলূব, রূহানী খাযায়েন, ১৫শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪৩৩) জীবনের শেষ দিকে স্যার ফযলে হোসেন যখন বললেন, সব অ-আহমদীকে কাফের বললে ইসলামের কিছুই থাকবে না, তিনি উত্তর দিলেন: “আমরা কোনো কালেমা পাঠকারীকে ইসলামের বাইরে মনে করি না, যদি না সে আমাদের কাফের বলে নিজেই কাফের হয়।” (মলফূযাত, ৫ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৬৩৫, ১৯৮৮ সংস্করণ)

কুরআনে কি এমন স্তরভেদ আছে?

আছে। কুরআন মরুবাসী আরবদের সম্পর্কে বলেছে:

قَالَتِ الۡاَعۡرَابُ اٰمَنَّا ؕ قُلۡ لَّمۡ تُؤۡمِنُوۡا وَلٰکِنۡ قُوۡلُوۡۤا اَسۡلَمۡنَا وَلَمَّا یَدۡخُلِ الۡاِیۡمَانُ فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ
“মরুবাসীগণ বলে, ‘আমরা ঈমান আনিয়াছি।’ তুমি বল, ‘তোমরা (এখনও প্রকৃত) ঈমান আন নাই, বরং তোমরা বল, ‘আমরা ইসলাম গ্রহণ করিয়াছি, কারণ এখনও ঈমান তোমাদের অন্তরে প্রবেশ করে নাই;’…”
সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:১৫

তারা মুসলমান, অথচ প্রকৃত ঈমানের স্তরে পৌঁছায়নি। ঈমানের যেমন স্তর আছে, কুফরেরও তেমন স্তর আছে। এই সহজ সত্যটি মনে রাখলে আপত্তিটির আর কিছু বাকি থাকে না।

সংক্ষেপে

  1. এই প্রশ্ন তাঁর জীবদ্দশাতেই তোলা হয়েছিল, আর তিনি হাকীকাতুল ওহী-তে নিজেই উত্তর দিয়েছেন।
  2. অস্বীকারকারী তাঁকে আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনাকারী মনে করে; কুরআন অনুযায়ী এখানে দুই পক্ষের একজন অবশ্যই অপরাধী।
  3. ইসলামে কুফর দুই প্রকার: একটি মিল্লাত থেকে বের করে, অন্যটি করে না। আহমদীয়া সাহিত্যে অস্বীকারকে দ্বিতীয় প্রকার বলা হয়েছে।
  4. কালেমা পাঠকারীকে ইসলাম থেকে বহিষ্কার তিনি কখনো করেননি; তাই আগে-পরের কথায় কোনো বিরোধ নেই।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.